শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিই ‘অরক্ষিত’
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৪ এএম, ১৬ মে ২০২৬
ঢাকা জেলা অফিসসহ ১১টি জেলায় ডিআইএফইর নিজস্ব ভবন নেই। ভাড়া আবাসিক ভবনে চলছে অফিস। অপ্রতুল জায়গায় কোনো রকমে চলছে দৈনন্দিন কাজ। নিজস্ব ভবন না থাকায় প্রতিনিয়ত অফিসের স্থান বদলাতে হয়। অধিদপ্তরের কাজের গতি এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি এর ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শ্রমিকের সুরক্ষাও।
ডিআইএফইর উপ-মহাপরিদর্শক মো. আরিফুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকাসহ ১১টি জেলায় আমাদের নিজস্ব ভবন নেই। ফলে আমাদের নানা ধরনের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হেড অফিসও নেই। এমনকি শ্রম আদালতও ভাড়া ভবনে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি পরবর্তীসময়ে ডিআইএফইর দায়িত্ব ও কর্মপরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও পর্যাপ্ত সুবিধাসম্পন্ন সদর দপ্তর ও জেলা অফিস নির্মাণ শুধু কার্যকারিতা বাড়াবে না, বরং শ্রম আইন প্রয়োগে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে।
আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবন নেই। শুধু তাই নয়, রাজশাহীতে একমাত্র স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। দূরবর্তী জায়গা হওয়ায় শ্রমঘন এলাকা ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এ প্রতিষ্ঠানের সেবা পাচ্ছে না। শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সব প্রতিষ্ঠান এক ছাদের নিচে থাকাটা জরুরি।-ডিআইএফইর (ঢাকা) উপ-মহাপরিদর্শক মো. আতিকুর রহমান
স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া বাবদ সরকারের বিপুল পরিমাণে অর্থ অপচয় হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফেনী, রাঙ্গামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নওগাঁ, জামালপুর, খুলনা, সিলেট জেলায় ডিআইএফইর কোনো ভবন নেই।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে অসংখ্য আউটসোর্সিং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক সরবরাহ করে। এগুলো লাইসেন্সিং ফি দিতে বাধ্য করা হলেও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থার অভাবে সরকার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
অস্তিত্বহীন স্কুলে চাকরির প্রলোভনে টাকা খোয়াচ্ছেন হাজারও বেকার
শ্রম আদালতে মামলার জট, নিষ্পত্তির চেয়ে বাড়ছে চাপ
শ্রমিকদের ভাগ্য কি বদলাচ্ছে?
এছাড়া এই ফার্মগুলোর মাধ্যমে নিয়োগ করা অনেক শ্রমিক বাংলাদেশের শ্রম আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এতে শোষণ, অসম মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। রাজশাহীতে অবস্থিত একমাত্র স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। অথচ অন্য প্রধান শিল্পাঞ্চল যেমন ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেট এ ইনস্টিটিউটের সুবিধা পাচ্ছে না দূরবর্তী হওয়ার কারণে।
দূরত্ব, সময় ও ভ্রমণব্যয়ের কারণে কারখানা মালিক ও শ্রমিকরা প্রশিক্ষণে অংশ নিতে উৎসাহী হচ্ছেন না। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ছয়টি শিল্পঘন এলাকায় দূরবর্তী বা ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন না করা হলে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে না।
জাতীয় পর্যায়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার কার্যক্রমও এতে বাধাগ্রস্ত হবে। শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে আধুনিক প্রশিক্ষণ উপকরণ, ডিজিটাল ল্যাব ও যুগোপযোগী কারিকুলামে সমৃদ্ধও জরুরি হয়ে পড়েছে।
ডিআইএফই সূত্র জানায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নিজস্ব কোনো স্বীকৃত কারখানা কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেশন সিস্টেম নেই। ফলে স্থানীয় কারখানাগুলো লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইনের (লিড) মতো আন্তর্জাতিক ব্যয়বহুল সনদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা দেশ থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশাপাশি ডিআইএফইর ব্যবহারে থাকা লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশনের (লিমা) মতো আলাদা আলাদা সফটওয়্যার সিস্টেমগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ফলে একই তথ্য বারবার ইনপুট দিতে হয়, রিপোর্টে অমিল দেখা যায় এবং ডাটার নির্ভরযোগ্যতা কমে যায়। শ্রমিকও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এজন্য একটি সমন্বিত, কেন্দ্রীয় ডাটাবেসভিত্তিক আইসিটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি। এ প্ল্যাটফর্ম বিদ্যমান সব সিস্টেমকে একীভূত করবে, স্বয়ংক্রিয় কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেশন মডিউল যুক্ত করবে এবং দোকান ও আউটসোর্সিং ফার্ম মনিটরিংয়ের সুবিধা এনে দেবে। এতে একটি স্বনির্ভর সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, বিদেশনির্ভরতা কমবে। বাংলাদেশের শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তা মান নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ডিআইএফইর (ঢাকা) উপ-মহাপরিদর্শক মো. আতিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবন নেই। শুধু তাই নয়, রাজশাহীতে একমাত্র স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। দূরবর্তী জায়গা হওয়ায় শ্রমঘন এলাকা ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এ প্রতিষ্ঠানের সেবা পাচ্ছে না। শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সব প্রতিষ্ঠান এক ছাদের নিচে থাকাটা জরুরি।’
ডিআইএফইর বর্তমান মনোযোগ কারখানাগুলোর প্রতি। অথচ দেশে বিপুল সংখ্যক দোকান, মার্কেট, রেস্তোরাঁসহ অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক আছেন, যাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়মিত তদারকির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সংস্থার অর্গানোগ্রামে দোকান ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা সহকারী মহাপরিদর্শক ও শ্রম পরিদর্শক থাকলেও প্রয়োজনীয় মানসম্মত কর্মপদ্ধতি, চেকলিস্টের অভাবে তাদের কার্যক্রম ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাস্থ্য ও শ্রম অধিকার থেকেও বঞ্চিত।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পখাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর সরকারি তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
এমওএস/এএসএ/এমএফএ