শ্রম আদালতে মামলার জট, নিষ্পত্তির চেয়ে বাড়ছে চাপ
দেশের শ্রম আদালতগুলোতে মামলার জট ক্রমেই বাড়ছে, অথচ নিষ্পত্তির হার রয়ে গেছে অত্যন্ত কম। আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে ন্যায়বিচারের জন্য।
২০১৮ সালের ৫ মার্চ ঢাকার আশুলিয়ার আল-গাউছিয়া টেক্সটাইল লিমিটেডে ‘অপারেটর’ হিসেবে যোগ দেন মো. সামিউল বাসার। স্বপ্ন ছিল কারখানার চাকরি দিয়ে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু পরের বছরই তার জীবনে নেমে আসে কালো মেঘ। শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি কোনো নোটিশ ছাড়াই তাকে কর্মস্থলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে তাকে কার্যত চাকরিচ্যুত করা হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ২০১৯ সালে ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে মামলা করেন সামিউল। মালিকপক্ষ তার বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তোলে এবং ফৌজদারি মামলাও দায়ের করে। তবে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে এসব অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে পারেননি তারা।
আরও পড়ুন
ঢাকার শ্রম আদালতে ঝুলছে সাড়ে ১০ হাজার মামলা
সরকারি আইনি সহায়তায় আস্থা কম, সেবাগ্রহীতা এক শতাংশেরও নিচে
শ্রমিক সুরক্ষায় আইন আছে, কিন্তু কতটা কার্যকর?
প্রায় পাঁচ বছর পর, ২০২৪ সালের ৬ মে আদালত রায়ে বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে চাকরি থেকে বিরত রাখা বেআইনি। পাশাপাশি সামিউল ফৌজদারি মামলা থেকে খালাস পাওয়ায় তাকে ৬০ দিনের মধ্যে বকেয়া মজুরিসহ পূর্ব পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আইনের খাতা বনাম বাস্তবতা
সামিউল এই লড়াইয়ে জয়ী হলেও পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে এক বড় অসঙ্গতি। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর বিধান অনুযায়ী, শ্রম আদালতে কোনো মামলার ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা। অন্যদিকে, আপিল ট্রাইব্যুনালকে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সামিউলের এই মামলাটি নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছে ১ হাজার ৯০০ দিনেরও বেশি (৫ বছরের বেশি সময়)। আইনের পাতায় দ্রুত বিচারের যে নিশ্চয়তা দেওয়া আছে, বিচারক স্বল্পতা আর মামলার পাহাড়ের চাপে বাস্তবে তার চিত্র যে কতটা করুণ, সামিউলের পাঁচ বছরের দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসই তার উদাহরণ তৈরি করেছে।

শ্রম (সংশোধন) বিল পাস
শ্রম আইন সংশোধন করে ২০২৫ সালে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যেখানে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে। এই আইন আগে কার্যকর হলে সামিউলের মতো শ্রমিকরা দ্রুত বিচার ও বাড়তি ক্ষতিপূরণের সুযোগ পেতেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত ৯ এপ্রিল সংশোধিত শ্রম আইন জাতীয় সংসদে পাস করে সরকার।
নতুন আইন অনুযায়ী, সামিউলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে যে একতরফা তদন্ত করা হয়েছিল, তার জন্য মালিকপক্ষকে বড় অঙ্কের জরিমানা এবং শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। এছাড়া দীর্ঘ পাঁচ বছরের মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির বিপরীতে তিনি শুধু বকেয়া মজুরি নয়, আরও বড় অঙ্কের বিশেষ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার রাখতেন।
বর্তমান অবস্থা কী
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল ও শ্রম আদালতগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাকরিচ্যুতি, বকেয়া মজুরি আদায় কিংবা চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে প্রতিনিয়ত শ্রম আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন শ্রমিক ও পেশাজীবীরা। কিন্তু বিচার পেতে গিয়ে তাদেরই পড়তে হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারাদেশে শ্রম আদালতগুলোতে মামলার জট কমার বদলে ক্রমেই বাড়ছে, আর নিষ্পত্তির হার রয়ে গেছে খুবই কম।

শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, দেশে মোট ১৩টি শ্রম আদালত রয়েছে, যেখানে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আইনি লড়াইয়ের সুযোগ পান। পাশাপাশি একটি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শ্রম-সংক্রান্ত বিশেষ বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও বিদ্যমান।
২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাসের শুরুতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৪১৬টি। ওই মাসে নতুন করে ৪৬০টি মামলা হওয়ায় মোট মামলা দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৮৭৬টি। এর বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩৩১টি মামলা, যা মোট মামলার প্রায় ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। ফলে মাস শেষে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫৪৫টি। অর্থাৎ নতুন মামলার তুলনায় নিষ্পত্তি কম হওয়ায় জট আরও বেড়েছে।
অনিষ্পন্ন মামলার সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট মামলার প্রায় অর্ধেকই দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। ১৩ হাজার ৮৩৩টি মামলা, অর্থাৎ প্রায় ৫০ দশমিক ২ শতাংশ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। এছাড়া ২৪ শতাংশ মামলা ৩ থেকে ৬ মাস এবং ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ মামলা ১ থেকে ৩ মাস ধরে চলমান। এই চিত্র শ্রম আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ঢাকার শ্রম আদালতগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। রাজধানীর তিনটি শ্রম আদালতেই প্রায় ১৪ হাজার মামলা বিচারাধীন, যা সারাদেশের মোট পেন্ডিং মামলার অর্ধেকেরও বেশি। এর মধ্যে প্রথম শ্রম আদালতে ৪ হাজার ৪৪০টি, দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৬ হাজার ৩২৮টি এবং তৃতীয় শ্রম আদালতে ৩ হাজার ১৯৯টি মামলা রয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৪ হাজার ৫৭১টি মামলা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা দীর্ঘসূত্রতার চরম উদাহরণ।
শিল্পাঞ্চলগুলোতেও মামলার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। গাজীপুর শ্রম আদালতে ৬ হাজার ২৩৩টি এবং নারায়ণগঞ্জে ২ হাজার ৮৯৫টি মামলা বিচারাধীন। চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে ২ হাজার ৫৩৯টি মামলা ঝুলে আছে। অন্যদিকে রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে মামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সামগ্রিকভাবে সারাদেশেই নিষ্পত্তির গতি ধীর।
শুধু নিম্ন আদালতেই নয়, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে মোট ১ হাজার ১১৩টি মামলার বিপরীতে মার্চ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২০টি, যা প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ। উপরন্তু ৭০টি মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় কার্যত অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন
‘দেশের ৬ কোটি শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা ও মজুরির মানদণ্ড নেই’
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বড় অংশ নির্ভরশীল ‘শ্রম আইন বাস্তবায়নের ওপর’
শিল্পাঞ্চল খ্যাত নারায়ণগঞ্জে শ্রম আদালতের কার্যক্রম শুরু
আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতের মামলা ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা, প্রয়োজনে আরও ৯০ দিন সময় নেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগছে, আর আপিল করলে তা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৫ থেকে ৬ বছরে। ফলে দ্রুত বিচার পাওয়ার যে উদ্দেশ্যে শ্রম আদালত গঠিত হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই জটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ঢাকায় মাত্র তিনটি শ্রম আদালত থাকায় বিচারকের ওপর মামলার চাপ অত্যধিক। অনেক ক্ষেত্রে শুনানির তারিখ পড়ে দুই মাস পরপর, ফলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। এছাড়া মালিকপক্ষের কাছে সময়মতো নোটিশ না পৌঁছানো, শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বিচার বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে।
সব মিলিয়ে শ্রম আদালতের বর্তমান পরিস্থিতি শ্রমিকদের জন্য এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে দ্রুত বিচার পাওয়ার কথা, সেখানে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিচারক নিয়োগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই জট নিরসন সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন
শ্রম আদালতে মামলার জট নিরসনে কর্মশালা
ঝুলে আছে ২৬ হাজার মামলা, হচ্ছে আরও ৭ শ্রম আদালত
ছয় কোটি শ্রমিকের জন্য ৭ আদালত
আইনজীবী নেতা যা বলছেন
লেবার কোর্ট ল’ইয়ারস সোসাইটির (বার অ্যাসোসিয়েশন) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ এস এম আনিছুজ্জামান তুহিন জাগো নিউজকে বলেন, শ্রম আদালতের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম বড় কারণ হলো আপিল পর্যায়ের মামলাগুলো হাইকোর্ট পর্যন্ত চলে যাওয়া, যদিও লেবার আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়ই চূড়ান্ত হওয়ার কথা। এতে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত আবার উচ্চ আদালতে পুনর্বিবেচিত হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়ে। পাশাপাশি শ্রম আইনের ২১৩ ও ৩৩ নম্বর ধারায় মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের কোর্টে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় এককভাবে বিচারককে মামলার নিষ্পত্তি করতে সমস্যা পোহাতে হয়, ফলে বারবার তারিখ পড়ে এবং মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে আদালতে জমা না দেওয়ায় এবং শ্রমিকপক্ষের নথিপত্রেও ঘাটতি থাকায় বিচার কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়। বর্তমানে দেশের শ্রম আদালতগুলোতে ২৭ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন, যার বড় অংশ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে কেন্দ্রীভূত। মামলার সংখ্যা বাড়লেও সঠিক ডকুমেন্টেশন, আইন বাস্তবায়ন ও প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এই জট কমানো সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এমডিএএ/এমএমএআর/এমএফএ