অভিবাসীদের দুর্ভোগে উদ্বিগ্ন মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র উপকূলে ব্যাপক সংখ্যক ‘অভিবাসীর দুর্ভোগে’ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শনিবার এক বিবৃতিতে নাজিব রাজাক বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলে অভিবাসীদের দুর্ভোগে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে আমাদের উপকূলে এসে পৌঁছেছেন এবং আরো অনেকে পৌঁছার চেষ্টা করছেন।’ ‘এটিকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’ বলে মনে করছেন মালয় প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূল থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা আরো দুইশ’ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকালে অভিবাসীদের উদ্ধার করে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী। ধারণা করা হচ্ছে, ইন্দোনেশিয়ার জলসীমা থেকে নৌকা ফিরিয়ে দেয়ার ভয়ে তারা পানিতে নেমে পড়েন।
এর আগের দিন শুক্রবার একটি ডুবন্ত নৌকা থেকে, প্রায় আটশ’ জনকে উদ্ধার করে ইন্দোনেশীয় জেলেরা। এদের মধ্যে ৩৯৫ জন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। উদ্ধারকৃতদের আপাতত রাখা হয়েছে আচেহ প্রদেশের, ল্যাঙসা বন্দরের পণ্যাগারে। ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ প্রধান সুনারিয়া জানান, অভিবাসীদের নৌকাটি দুই দিন আগে ফিরিয়ে দেয় মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী।
সম্প্রতি থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের গহীন জঙ্গল থেকে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর মানবপাচার চক্রের খবরগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে শুরু হয় তোলপাড়। থাই সরকার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করায় এবং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের সমুদ্রসীমায় নজরদারি বাড়িয়ে দেয়ায় মাঝসমুদ্রে আটকা পড়ে যায় পাচারকারীদের নৌকায় থাকা যাত্রীরা।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যানুযায়ী, ছয় হাজারেরও বেশি অসুস্থ ও ক্ষুধার্ত অবৈধ অভিবাসী সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় এখনো অপেক্ষায় রয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মানবপাচার সিন্ডিকেটের সদস্যরা অল্প টাকায় এসব মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে ‘স্বপ্নের’ মালয়েশিয়ায় পাঠানো শুরু করে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কোস্টগার্ডের নাকের ডগা দিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে অসংখ্য মানুষ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়। তাদের অনেকেই সহি-সালামতে মালয়েশিয়া পৌঁছায়, আবার অনেকে সাগরে ডুবে মারা যান। তবে এ সংখ্যা কতো তার কোনো পরিসংখ্যান কারো হাতে নেই।
অভিযোগ রয়েছে, দালালদের খপ্পরে পড়ে যারা মালয়েশিয়ায় ইতোমধ্যে পৌঁছে চাকরি করছেন তাদের দেখিয়েই আদমপাচারকারী চক্র নৌকাভর্তি করে লোক পাঠাতে থাকেন। আর এসব আদমপাচারের ঘটনা হচ্ছিল অনেকটা ওপেন-সিক্রেটভাবেই।
থাইল্যান্ডে গণকবর আবিষ্কার হওয়ার পরই বাংলাদেশসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সরকারও নড়েচড়ে বসে। টেকনাফে ইতোমধ্যে ‘ক্রসফায়ারে’ মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের একাধিক সদস্য মারা গেছেন। তবে এদের গডফাদাররা এখন কোথায় এবং কারা তা এখন পর্যন্তসরকারের পক্ষ থেকে চিহ্নিত করা হয়নি, যার কারণে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত গডফাদারদের আড়াল করতেই ‘ক্রসফায়ারের’ নাটক সাজানো হয়েছে কি-না?
মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি শাহাদাত হোসেন লিটন জানান, মানবপাচারের বড় একটি সিন্ডিকেট রাজধানী কুয়ালালামপুর, সোবাং ও পেনাংয়ে অবস্থান করছে। এ চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশে থাকা সিন্ডিকেটের সদস্যদের সার্বিক তথ্য দিচ্ছে টেলিফোনে। যাদেরকে টেকনাফ দিয়ে ট্রলারে ওঠাতে পারছে তাদের বলে দিচ্ছে সঙ্গে চিড়া-মুড়ি নিলেই হবে। কোনো টাকা লাগবে না। ট্রলারে গেলে আট হাজার রিংগিত আর আকাশপথে গেলে ১২ হাজার রিংগিত লাগে। ট্রলারে মালয়েশিয়া যেতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে বলে আগেই জানিয়ে দেয় দালালরা।
এসএইচএস/বিএ/পিআর