শতভাগ উপস্থিতি নেই একজন মন্ত্রি-এমপিরও
চলমান জাতীয় সংসদের একজন মন্ত্রি-এমপিও সবগুলো কার্যদিবসে সংসদে যোগ দেননি। দশম এই সংসদের ৫ম অধিবেশন পর্যন্ত ১২২ কার্যদিবস চললেও কেউই প্রতিটি কার্যদিবসে সংসদে হাজির হননি। এমনকি প্রতিমন্ত্রি মর্যাদার যে হুইপদের কাজই হলো সংসদে এমপিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা তারাও নিয়মিত সংসদে যান না। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আর এ বাস্তবতা নিয়েই সোমবার বিকেলে সংসদের বাজেট অধিবেশন বসছে। এটি দশম সংসদের ষষ্ঠ অধিবেশন।
এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এমপিদের প্রধান দায়িত্বই হলো সংসদীয় সব কাজে অংশ নেয়া। কিন্তু তারা যদি এ থেকে সরে যান তাহলে নৈতিকভাবে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা হারান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বর্তমান সরকারের মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি ও উপমন্ত্রির সংখ্যা ৫০ জন। কিন্তু ৫১ জন এমপি ছাড়া কেউই ১০০ কার্যদিবসের বেশি সংসদে উপস্থিত হননি। মন্ত্রিদের মধ্যে সবচেয়ে কম সংসদে গেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি মাত্র ৩০ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। আর সবচেয়ে কম দিন সংসদে গিয়ে রেকর্ড গড়েছেন খন্দকার আসাদুজ্জামান (টাঙ্গাইল-২)। তিনি মাত্র ১২ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। সর্বশেষ পঞ্চম সংসদের ৩ মার্চ সংসদে হাজির হয়েছিলেন তিনি।
তবে সংসদে সবচেয়ে বেশি উপস্থিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের ইউনুস আলী সরকার এমপি। গাইবান্ধা-৩ আসনের এ এমপি ১১৮ কার্যদিবস সংসদে হাজির হন।
একজন আইন প্রণেতা হিসেবে এমপিরা সম্মানি ছাড়াও বিভিন্ন খাতে ভাতা পেয়ে থাকেন। এসবের মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা, বাসস্থান, নির্বাচনী কার্যালয় ও এলাকার জন্য ব্যয়, যানবাহন ভাতা, নিয়ামক ভাতা, টেলিফোন বিল, ভ্রমণ ভাতা, চিকিৎসা বিল ইত্যাদি। সব মিলিয়ে মাসে তারা প্রায় ৬০ হাজার টাকা পান। এর বাইরে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে আরো ৪০ হাজার টাকা পান। প্রত্যেক এমপির পেছনে সরকারের মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়। আর মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি উপমন্ত্রি ও হুইপরা ভাতা ছাড়াও আরো সুযোগ-সুবিধা পান। কিন্তু সংসদে নিয়মিত যান না কেউই। 
মন্ত্রিদের মধ্যে সবচেয়ে কম সংসদে গেছেন যারা
মন্ত্রিদের মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও কম সংসদে গেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রি বীর বাহাদুর ঊ শৈ সিং। তিনি মাত্র ৫১ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। এছাড়াও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রি মোহাম্মদ ছায়েদুল হক ৫৬, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রি ইসমত আরা ছাদেক ৫৭, পরিবেশ ও বনমন্ত্রি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ৬০, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রি আ ক ম মোজাম্মেল হক ৬২, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় উপ-মন্ত্রি আরিফ খান জয় ৬৬, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রি আসাদুজ্জামান নূর ৬৭, পরিকল্পনা মন্ত্রি আ হ ম মুস্তাফা কামাল ৬৮ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ৬৯ কার্যদিবস সংসদে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০৫ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ গেছেন ৬২ কার্যদিবস। গত নবম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ দিন। ওই সংসদে মোট কার্যদিবস ছিল ৪১৮টি। আর জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গেছেন মাত্র ৩৩ কার্যদিবস। আর চিফ হুইপ আসম ফিরোজ গেছেন ১০৬ কার্যদিবস।
মন্ত্রিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি যাদের
রেলপথমন্ত্রি মুজিবুল হক সবচেয়ে বেশি সংসদে গেছেন। তিনি মোট ১০৫ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। এছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রি তোফায়েল আহমেদ ১০৩, কৃষিমন্ত্রি মতিয়া চৌধুরী ১০৩, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি আসাদুজ্জামান কামাল ৯৬, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রি মসিউর রহমান রাঙ্গা ৯৪, অর্থমন্ত্রি আবুল মাল আবদুল মুহিত ৯৩, খাদ্যমন্ত্রি কামরুল ইসলাম ৯১, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রি মুজিবুল হক চুন্নু ৯১, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রি রাশেদ খান মেনন ৮৮, শিক্ষামন্ত্রি নুরুল ইসলাম নাহিদ ৮৩ কার্যদিবস সংসদে গেছেন।
সংসদে সবচেয়ে কম গেছেন যেসব এমপি
খন্দকার আসাদুজ্জামান ছাড়াও এমপিদের মধ্যে সবচেয়ে কম কার্যদিবস সংসদে গেছেন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী (ঢাকা-৯)। তিনি মাত্র ২০ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। এরপর আওয়ামী লীগের ফয়জুর রহমান বাদল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫) ২৭, সিমিন হোসেন রিমি (গাজীপুর-৪) ২৯, জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন খোকা (নারায়ণগঞ্জ-৩) ৩১, আওয়ামী লীগের রনজিত কুমার রায় (যশোর-৪) ও নাজমুল হাসান (কিশোরগঞ্জ-৫)-৩২, শেখ হেলাল উদ্দিন (বাগেরহাট-১) ৩৬, দবিরুল ইসলাম (ঠাকুরগাঁও-৫) ৩৭ এবং আলী আজগর (চুয়াডাঙ্গা-২) ৪১ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। 
সংসদে সবচেয়ে বেশি গেছেন যেসব এমপি
চলমান সংসদে সবচেয়ে বেশি গেছেন ইউনুস আলী সরকার (গাইবান্ধা-৩)। তিনি ১১৮ কার্যদিবস সংসদে গেছেন। তার পরে রয়েছেন আওয়ামী লীগের ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা (ঢাকা-১৬) ১১৭ কার্যদিবস, আওয়ামী লীগের আবদুল মান্নান (বগুড়া-১) ১১৫, জাতীয় পার্টির এম এ মান্নান (ময়মনসিংহ-৭) ১১৫, আওয়ামী লীগ নেতা ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া (গাইবান্ধা-৫) ১১৩, জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম ওমর (বগুড়া-৬) ১১৩, জাতীয় পার্টির মামুনুর রশীদ (জামালপুর-৪) ১১৩, স্বতন্ত্র সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা (নরসিংদী-৩) ১১৩, আওয়ামী লীগের আলী আশরাফ (কুমিল্লা-৭) ১১১ এবং সুবিদ আলী ভূঁইয়া (কুমিল্লা-১) ১১০ কার্যদিবস সংসদে গেছেন।
সাবেক মন্ত্রি আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল-৪) সংসদে গেছেন ৩৯ কার্যদিবস। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে কারাবন্দী লতিফ গত পঞ্চম অধিবেশনে যোগ দিতে পারেননি। এর আগে চারটি অধিবেশনের ৮৩ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি ৩৯ দিন সংসদে যান।
আর পুলিশের খাতায় পলাতক আওয়ামী লীগের এমপি আমানুর রহমান রানা (টাঙ্গাইল-৩) সংসদে গেছেন ৫৯ কার্যদিবস। তিনি সংসদের পঞ্চম অধিবেশনের ৩৯ কার্যদিবসের মধ্যে একদিনও সংসদে যাননি। সর্বশেষ গত ২০ নভেম্বর তাকে সংসদে দেখা গিয়েছিল। টানা ৪৪ দিন সংসদে অনুপস্থিত তিনি। জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ফারুক আহমেদ ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি খুন হন। তার নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে এমপি আমানুরকে আটকের জন্য একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, সংবিধানে সংসদে অনুপস্থিতির বিষয়টি অনুমোদন করা হয়েছে। তারা ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকতে পারবেন। এটা সুবিধার না। এর ফলে শুধু অনুপস্থিত থেকেই অনেকে সংসদ বয়কটও করছেন। আর ক্রমাগত সংসদে অনুপস্থিতদের প্রতিহত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এই সংসদে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোও অনুপস্থিত। কার্যকর বিরোধী দল বাস্তবে সংসদে নেই বলেই মনে করি। সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই ধারণাটাই হয়তো কাজ করছে। এই সংসদ কার্যকর কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমি মনে করি এমপিদের উচিত হবে এই সত্যিকারের চ্যালেঞ্জটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
# বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকেই সংসদে যাই : ইউনুস আলী
# অধিবেশন বসছে সোমবার, বাজেট পেশ ৪ জুন
এইচএস