এবার ইফতারে মৌসুমি ফলের চাহিদা বেশি
রোজাদারদের কাছে অন্যবারের তুলনায় এবারের রমজান মাস একটু ব্যতিক্রম। এ মাসে ইফতারে সাধারণত তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। সঙ্গে থাকে দেশি-বিদেশি ফলমূলও। তবে এবারের ইফতারে ফলের তালিকায় এসেছে পরিবর্তন। বিদেশি আপেল-আঙ্গুর-কমলার পরিবর্তে ইফতারে থাকছে মৌসুমি ফল। পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে ইফতার সম্পর্কে এমনটাই জানা গেছে।
সাধারণত রমজানে পুরান ঢাকার বড় বড় রেস্তোরাঁর সামনে কিংবা রাস্তার পাশে, এমনকি অলি-গলিতেও বসে ইফতার সামগ্রির দোকানে থাকে ভীড়। রমজানের প্রথম দিন থেকেই রেজাদার মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এসব দোকানের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু এবার রমজানে পুরান ঢাকায় ছোট বড় ফলের দোকানে ভীড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা, মৌসুমি ফল কিনতে। মৌসুমি ফলের সময় শেষের দিকে হওয়ায়, চড়া দামে অনেকে কিনছেন মৌসুমি ফল।
মৌসুমি ফলের মধ্যে রয়েছে- আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, ডেউয়া, পানিফল (জামরুল) মৌসুমি আনারস, পেয়ারা, তালের শাঁস (তাল) ইত্যাদি।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর বাজারে কথা হয় আহমেদ রাজু নামে এক রোজাদারের সঙ্গে। তিনি জানান, বাঁ হাতের ব্যাগে আছে চক বাজারের ইফতার, আর ডান হাতে আছে কিছু মৌসুমি ফল। সাধারণত অন্যান্যবার আমার পরিবারের জন্য তৈলাক্ত খাবার থাকে। সঙ্গে আপেল-আঙুর। কিন্তু এবার চেষ্টা করছি ফল কিনতে।
সূত্রাপুর থানা সংলগ্ন বাজারের আসলাম নামের এক ফল বিক্রেতা জানান, এবার আপেল-আঙুর-কমলা থেকে বেশি ক্রেতা টানছে দেশি ফল আম-জাম-কাঁঠাল।
সূত্রাপুর থানা ঘেঁষা রাস্তার দুই পাশে রয়েছে ইফতারের অনেক ছোট বড় দোকান। পাশাপাশি রয়েছে মিষ্টির দোকানও। এখানে ফল আসে মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ থেকে। কথা হয় সামাদ নামের একজন ফল ব্যবসায়ির সঙ্গে। তিনিও জানান, এবার দেশি ফলে চাহিদা অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেল, বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষ ইফতার আয়োজনে ব্যস্ত। এখানে ইফতারের চিত্র ভিন্ন ধরণের। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যারা ইফতারের করেন তাদের অধিকাংশ লঞ্চের যাত্রী। দক্ষিণবঙ্গের অনেক লঞ্চ ছাড়ে রাত আটটার মধ্যে, সেক্ষেত্রে অনেকে বাধ্য হয়ে নোংরা ও পানি-পচা গন্ধের মধ্যে ইফতার করছেন। অনেক মুসল্লিকে কুলিদের নিয়ে ইফতার করতে দেখা যায়।
রমজানে ইফতারের সময় এ ঘাটের সাধারণ দৃশ্যগুলোর একটি হলো- অনেক যাত্রী একত্রে লঞ্চের ডেকের ওপর জড়ো হয়ে ইফতার করছেন। এছাড়া শত শত ঘাটশ্রমিককেও একসঙ্গে দল বেঁধে ইফতার করতে দেখা যায়। এ ধরনের নানা আয়োজনে রমজানের প্রতিটি দিনই ইফতারের সময়টুকুতে বুড়িগঙ্গার পচা পানির দুর্গন্ধময় সদরঘাট টার্মিনালও হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
এখানেও দুপুর থেকেই ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেন ইফতার বিক্রেতারা। বিকেল গড়াতেই রীতিমতো জমে ওঠে ইফতার বাজার। এখানে বিভিন্ন ইফতার ক্যাফে ছাড়াও রয়েছে ছোট বড় বিশ-পঁচিশটি ইফতার বিক্রির দোকান। এসব দোকানে শাহী হালিম, শাহী জিলাপি, নান, চিকেন ফ্রাই, চিকেন স্টিক, ভেজিটেবল রোল ইত্যাদি ছাড়াও স্থান পেয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফল।
এছাড়াও রয়েছে ছোট ছোট ফলের দোকান। ফলের দোকানগুলোতে আম আর কাঁঠাল মৌসুমি ফল বিক্রি হচ্ছে। এখানে ফলের দাম তুলনামূলক একটু কমও।
অন্যদিকে পুরান ঢাকায় সবচেয়ে পরিচিত চকবাজারের ইফতার সম্পর্কে বলতেই আসে বাহারী সব ভাজা-পোড়া পদ। দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো ইফতার সামগ্রী, ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়, মানুষের হৈ চৈ আর ধুম বেচাকেনা। এখানে পিঁয়াজু, আলুরচপ, বেগুনি, বুট ও ছোলার প্রাধান্য থাকলেও পুরান ঢাকাবাসীর নজর শাহি জিলাপি, বিরিয়ানি, হালিম, খাসির রোস্ট, ঘুগনি, মোরগ পোলাও, চিংড়ি চপ, ডিম চপ, কিমা, পাকোড়া, কিমা পরোটা, পেস্তা বাদামের শরবত, টিকা কাবাব, শাকপুলি, জালি কাবাব, সুতি কাবাবের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকারের ফল।
এখানেও এবার বিদেশি ফলের জায়গায় স্থান পেয়েছে দেশি মৌসুমি ফল। পুরান ঢাকার ইফতারের বাহারি নাম আর লোভনীয় স্বাদের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে অনেক ক্রেতা এসে ভিড় জমান চকবাজারে।
কেরানীগঞ্জ থেকে ইফতার কিনতে আশা সাথি জাহান বিলকিস নামের একজন জানান, আমি এখানে (চকবাজার) প্রতিবার ইফতার কিনতে আসি। আগে আসতাম বাবার সঙ্গে। এখন আসি আমার স্বামীর সঙ্গে।
এ বাজারে ইফতারের দরদাম সম্পর্কে জানতে চাইলে জাগো নিউজকে জানান, এবারে দাম তুলনামূকভাবে গতবারের চেয়ে বেড়েছে।
তবে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে সে তুলনায় ইফতারের দাম বেশি বাড়েনি বলে দাবির বিক্রেতাদের।
চকবাজারের লক্ষ্মীবাজারে জাপান প্রবাসী ডাক্তার সিনথিয়া জানান, আমি ছোট বেলায় এখানে এসেছিলাম। তবে এখন আর এখানকার খাবার মানসম্মত নয়। খাবারগুলো খোলা রাখা হয়েছে আর মসলার পরিমাণ বেশি। এখন যেহেতু ফল পাওয়া যায়, তাই সবার এ ধরণের তৈলাক্ত খাবার পরিত্যাগ করা ভালো।
চকবাজারে বিভিন্ন ইফতারের দাম
পিঁয়াজু, আলুর চপ ও বেগুনি সাধারণত ৩-৫ টাকা। অন্যান্য পদগুলোর দাম একেক জায়গায় একেক রকম। যেমন চকবাজারে আস্ত মুরগির রোস্ট-২৬০ টাকা হলেও অনেক জায়গায় এটা বিক্রি হয়েছে ২১০ টাকায়। ঝাল খাসির রান ৪৫০, কোয়েল ভুনা ৬০, কবুতর ভুনা ১২০, আমিত্তি ২০০, শাহি জিলাপি ১৬০, জিলাপি ১২০, খাশির সুতি কাবাব ৬৫০, গরুর সুতি কাবাব ৫৫০, বড় বাপের পোলায় খায় ৪৫০, দই বড়া ৩০০, খাশির হালিম ৩৫০, ফালুদা ১০০ থেকে ২০০, দেড় কেজি ওজনের পুডিং ৩০০, চিকেন শর্মা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এসএম/আরএস/পিআর/এসআরজে