জঙ্গিদের টার্গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি তৎপরতা চালানো, প্রয়োজনীয় কেমিকেল সংগ্রহ, নিজেদের লোকবল বাড়ানো থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেটে নিয়েছে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী।
এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এখন তাদের প্রধান টার্গেট হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর নেতৃত্বের অগ্রভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক শিক্ষার্থীরাই নিয়োজিত বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সাম্প্রতিককালে জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছ থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের হত্যার হুমকি, প্রয়োজনীয় কেমিকেল সংগ্রহে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ল্যাবরেটরি সহকারীদের সহযোগিতা, শিক্ষকের কক্ষ থেকে জঙ্গি নেতা আটকসহ বেশ কিছু ঘটনায় এসব তথ্য বেরিয়ে আসে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ল্যাব সহকারীরা জঙ্গিদের প্রয়োজনীয় কেমিকেল সংগ্রহে সাহায্য করছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে প্রয়োজনের অধিক সংগ্রহ করা এসব কেমিকেল হাতে যাচ্ছে জঙ্গিদের। আর এ কেমিকেল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে নানা রকম বিস্ফোরক।
ল্যাব সহকারীদের সহযোগিতায় জঙ্গি সংগঠনের বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা বিভাগের প্যাডে বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর নিয়ে গবেষণা কাজের প্রয়োজনের অধিক পরিমাণ বসিয়ে এসব কেমিকেল সংগ্রহ করে। এতে আবার সহযোগিতা করছেন বিস্ফোরক ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিনশ’ বৈধ রাসায়নিক দ্রব্যের দোকান রয়েছে। বিস্ফোরক দ্রব্য বিক্রয় আইন অনুযায়ী এসব দোকান মালিকরা যাচাই-বাছাই করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে রাসায়নিক বিক্রি করবে।
যে প্রতিষ্ঠানের জন্য কেমিকেল সংগ্রহ করা হবে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নির্ধারিত প্যাডে কেমিকেলের পরিমাণ উল্লেখপূর্বক স্বাক্ষর করে নিজস্ব প্রতিনিধি দিয়ে তা কিনতে হয়। প্যাডে বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর থাকবে। বিক্রেতাগণ সেই নম্বরে ফোন করে নিশ্চিত হয়েই কেবল রাসায়নিক উপাদান বিক্রি করবেন।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, এসবের কিছুই করছেন না দোকান মালিকরা। বরং মুনাফা লাভের আশায় জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিক্রি করছেন অধিক পরিমাণ বিস্ফোরক। বিভিন্ন সময়ে এদের আটক করা হলেও বের হয়ে যাচ্ছেন আইনের ফাঁক গলিয়ে। বের হয়ে আবার শুরু করছেন একই ব্যবসা।
এমনই অভিযোগের ভিত্তিতে শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ল্যাবরেটরি সহকারী গাজী মোহাম্মদ বাবুল, টিকাটুলির কেমিকেল বিক্রির দোকান ওয়েস্টার্ন সায়েন্টিফিক কোম্পানির ব্যবস্থাপক মহি উদ্দিন, এফএম কেমিকেলসের মালিক নাসির উদ্দিন এবং এশিয়া সায়েন্টিফিকের মালিক রিপন মোল্লাসহ চারজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরের দিন গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
শনিবার সাংবাদিকদের কাছে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, বাবুল ও বিক্রেতারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্যই জঙ্গিদের কাছে বিস্ফোরক ও রাসায়নিক দ্রব্য সরবরাহ করে থাকেন। তবে সেগুলো কী কাজে ব্যবহার হয় তা জানা ছিল না বলেও দাবি তাদের। জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের আদর্শিক কোনো মিল আছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ঢাবির আর কেউ কোনোভাবে জঙ্গিদের সহায়তা করছেন কি-না তাও তদন্তে জানা যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কেউ এমন কাজে জড়িত কি-না গোয়েন্দা পুলিশের তা খতিয়ে দেখার বিষয়ে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, আমি মনে করি এটার তদন্ত হওয়া উচিত এবং যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।
এদিকে রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের কলা ভবনের কক্ষ (৬০৩৭) থেকে জমিয়তে তালাবিয়া আরাবিয়া নামের এক মৌলবাদী সংগঠনের সভাপতি ওমর ফারুককে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। যদিও এ সময় ওই শিক্ষক কক্ষে ছিলেন না। পরে ডিবি পুলিশ ওই কক্ষ থেকে ফারুকের ব্যবহৃত কম্পিউটার জব্দ ও কক্ষটি সিলগালা করে দেয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২ মার্চ রাজধানী থেকে ব্লগার রজীব হত্যার দায়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। একই অভিযোগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী নাঈম ও মহিউদ্দিন মাসুম নামের এক মেডিকেল শিক্ষার্থীকে শাহবাগ থানা পুলিশ আটক করে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সাবেক উপাচার্যসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তিন দফা হত্যার হুমকিও জঙ্গিদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক তৎপরতার প্রমাণ দেয়।
এমএইচ/বিএ/একে/আরআইপি/এসআরজে