সেট নেই, আইফোনের খালি বাক্সে ভরপুর দোকান!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১৪ পিএম, ১৯ মে ২০১৮
অবৈধ আইফোন ধরতে শুল্ক গোয়েন্দার অভিযান

অবৈধ আইফোনে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। যে হারে আইফোন বিক্রি হচ্ছে সে হারে আমদানি হচ্ছে না! তার মানে যেগুলো বিক্রি হচ্ছে সেগুলো অবৈধ উপায়ে দেশে আনা হয়েছে। অবৈধ আইফোন জব্দের অভিযানে দোকানগুলোতে শত শত আইফোনের খালি বাক্স দেখে তাদের সন্দেহ আরও তীব্র হচ্ছে।

শুল্ক গোয়েন্দাদের মতে, দেশের বন্দরগুলো দিয়ে গত দুই মাসে মোট এক হাজার ৭০০টি আইফোন হ্যান্ডসেট আমদানি করা হয়েছে। এসবের বাইরে সব সেট-ই লাগেজ পার্টির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে দেশে এনে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।

iphone

রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা এসব অবৈধ আইফোন ধরতে শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, গুলশান-মহাখালী এবং উত্তরায় একযোগে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দারা। বসুন্ধরা সিটিতে অভিযানে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া প্রায় ১০০টি আইফোন হ্যান্ডসেট জব্দ করা হয়।

সেটগুলোর বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) কাজী মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, বর্তমান বাজারে একটি আইফোন-১০ এর দাম এক থেকে দেড় লাখ টাকা। বৈধভাবে প্রতিটি আইফোন আমদানিতে সরকার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করে। কাস্টমস সূত্রে জেনেছি গত দুই মাসে বাংলাদেশে মোট ১৭০০ হ্যান্ডসেট রাজস্ব দিয়ে আমদানি করা হয়েছে। তাই রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা এসব সেটের সন্ধানে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। সেট ক্রয়ের বৈধ কাগজপত্র না দেখাতে পারলে আমরা ধরে নেবো তারা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ব্যাগেজ পার্টি থেকে সেট কিনছে। সেসব সেট জব্দ করা হবে।

iphone

বসুন্ধরা শপিং মলের লেভেল-১ এর সেল-অন, গ্যাজেট জোন, ফোন এক্সচেঞ্জ, শিকদার ইলেক্ট্রনিক্স ও নিশা টেলিকমে অভিযান চালিয়ে মোট ১০০টি আইফোন জব্দ করা হয়। এছাড়াও অভিযানে আইফোনের কয়েকশ’ খালি বাক্স উদ্ধার করা হয়।

এসব সেট বৈধ নাকি অবৈধ? জানতে চাইলে গ্যাজেট জোনের বিক্রয় কর্মকর্তা মো. ইউনুস জাগো নিউজকে বলেন, বহুজাতিক ইউনিয়ন গ্রুপ বাংলাদেশে আইফোন সরবরাহ করে। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি’র মতো আমরাও ইউনিয়ন গ্রুপের অথোরাইড ডিলার। কেন আমাদের সেট জব্দ করা হলো কিছুই বুঝলাম না।

iphone

দোকানে আইফোনের খালি বাক্স কেন?
সরেজমিন অভিযানে বসুন্ধরা শপিং মলের অধিকাংশ দোকানে আইফোনের খালি বাক্স দেখা গেছে। একটি নয়, দুটি নয় প্রতিটি দোকানে প্রায় শত শত আইফোনের খালি বাক্স! বাক্সগুলোতে রয়েছে চার্জার ও হেডফোন। কয়েকটি দোকানে দেখা গেল আইফোনের ডেমো সেট। গোয়েন্দাদের ধারণা, বাক্সগুলো অবৈধভাবে আনা। আইফোনগুলো বাক্স থেকে খুলে তারা অন্য কোথাও রাখেন, বিক্রির সময় ক্রেতাকে এগুলো সরবরাহ করেন।

দোকানে খালি বাক্স কেন? জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিশা টেলিকমের বিক্রয় কর্মকর্তা জানান, আমাদের দোকান অনেক বড়। র‌্যাকে খালি বাক্স সাজিয়ে রেখে আমরা জায়গাভর্তি করি। খালি র‌্যাক দেখতে ভালো লাগে না।

বসুন্ধরার কমবেশি প্রায় সব দোকানেই চার্জার হেডফোনসহ আইফোনবিহীন খালি বাক্স দেখা গেছে।

iphone

এ বিষয়ে এডিজি জিয়াউদ্দিন বলেন, দোকানে আইফোনের খালি বাক্স রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ। এতে শঙ্কার বিষয় থাকে যে, ওই বাক্সে অন্য কোনো নিম্নমানের হ্যান্ডসেট ঢুকিয়ে বিক্রেতারা প্রতারণা করছে কি-না।

মহাখালীতে পৃথক অপারেশন
বসুন্ধরার পাশাপাশি মহাখালীতে নিউ ডিওএইচএসের একটি বাসায় নকল আইফোন তৈরি হচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা। নিউ ডিওএইচএসের ২৭ নম্বর রোডের ৩৫৬ নম্বর বাসায় ‘টি জে ইলেকট্রনিক লিমিটেড’ নামের নকল ফোন তৈরির প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৬টি ইনট্যাক্ট আইফোন জব্দ করা হয়। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

অভিযানের নেতৃত্বদানকারী শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের উপ-পরিচালক পায়েল পাশা বলেন, ‘আমাদের কাছে গোপন তথ্য ছিল এখানে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আইফোন এনে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এসে দেখলাম বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজনের মাধ্যমে নকল আইফোন তৈরি হয়। এছাড়া কয়েকশ’ আইফোনের খালি বাক্স পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছ, এই মোড়কেই নকল আইফোন বিক্রি করা হতো। এভাবে নকল আইফোন তৈরির মাধ্যমে একদিকে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ৩৬টি আসল আইফোন পাওয়া গেলেও এগুলোর আমদানির কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তারা।’

iphone

অভিযানে টি জে ইলেকট্রনিক্সের অফিসে কর্মরত সাত কর্মচারীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাকরাইলের শুল্ক গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কেউ অফিসে আসেননি।

আটক কর্মচারীরা দাবি করেছেন, তারা নকল আইফোন তৈরি করেন না। অনলাইনের মাধ্যমে সার্ভিসিংয়ের জন্য আইফোন সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো আবার গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।

এদিকে মহাখালীর অভিযান শেষ হওয়ার পরই র‌্যাবের ওয়্যারলেসে সংবাদ আসে বসুন্ধরা শপিং মলে অভিযান চালানো শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে মলের মোবাইলের দোকানের কর্মচারীরা। এ সময় তারা পান্থপথ থেকে কারওয়ানবাজারগামী সড়ক অবরোধ করে। স্লোগানে স্লোগানে জব্দকৃত সেট ফেরত চায় তারা।

iphone

পরে মোবাইল মালিক সমিতির সঙ্গে দুই ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে বিকেলে কাগজপত্র পুনঃযাচাই করে সেট ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দেন এডিজি জিয়াউদ্দিন।

মোবাইল অপারেটরদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে আইফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। দিন দিন বাড়ছে আইফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা।

এআর/এসএইচএস/বিএ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :