শাহজালালের রাডারের আয়ু শেষ, আসছে ৭৩০ কোটির প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:১৫ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২১

বাংলাদেশে বিমান পরিবহনের প্রবেশদ্বার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ বিমানবন্দরের বর্তমান সার্ভিলেন্স সিস্টেমটি (নজরদারি ব্যবস্থা) প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি রাডারের সমন্বয়ে গঠিত। ইতোমধ্যে এই রাডার দুটির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। এই রাডার ব্যবস্থাটি আপগ্রেড করে দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয়তা থাকলেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রাডার দুটি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র আরও বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো সেকেন্ডারি রাডার আপগ্রেড করা হলেও এটি কনভেনশনাল এসএসআর হওয়ায় তা দিয়ে আইকাওয়ের মান বজায় রাখা সম্ভব নয়। পুরোনো এল-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডারকে এস-ব্র্যান্ডে উন্নয়ন এবং কনভেনশনাল সেকেন্ডারি রাডারকে মোড এস-এ রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আকাশসীমায় নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বিমান চলাচলের সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিএনএস-এটিএম (কমিউনিকেশন, নেভিগেশন ও সার্ভিলেন্স-এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) সিস্টেমসহ রাডার স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় (বেবিচক)। প্রাথমিকভাবে এর খরচ ধরা হয়েছে ৭৩০ কোটি ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বেবিচক। ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নথিপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিকল্পনা) লুবনা ইয়াসমীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ রকম কোনো প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়নি। এটা এখনো প্রক্রিয়াকরণ পর্যায়ে আছে।’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেনকে ফোন করা হলে তার দফতর থেকে জানানো হয়, তিনি মিটিংয়ে আছেন। বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমানের টিএনটিতে ফোন দেয়া হলে তা প্রবেশ করেনি। বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর মো. খালিদ হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি একটি সভায় যোগ দিতে মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছেন বলে তার দফতর থেকে জানানো হয়।

জানা গেছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের এয়ারস্পেস সিঙ্গেল মোড (রাডার) থেকে মাল্টি মোড (রাডার, এডিএস-বি ও এমল্যাট) সার্ভিলেন্সের আওতায় নিয়ে আসা, সারাদেশের এয়ারস্পেসের ওপর সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং মাল্টি মোড সার্ভিলেন্সের আওতায় এরিয়া ও অ্যাপ্রোচ কন্ট্রোল সার্ভিস প্রদান, বিমান পরিচালনায় অধিকতর সিকিউরড ও নিরাপদ সেবা প্রদান, অ্যারোনটিক্যাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপুল উন্নতিসাধন এবং নতুন প্রযুক্তি সমন্বিত এটিসি সেন্টারসহ নতুন কন্ট্রোল টাওয়ার নির্মাণ করা।

এ প্রকল্পের আওতায় প্রাইমারি সার্ভিলেন্স রাডার (পিএসআর) এবং মনোপালস সেকেন্ডারি সার্ভিলেন্স রাডার মোড এস সরবরাহ ও সংস্থাপন; অটোমোটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভিলেন্স ব্রডকাস্ট (এডিএস-বি) সরবরাহ ও সংস্থাপন; এটিএম অটোমেশন সিস্টেম, এটিএম টেলিকমিউনিকেশন, এআইডিসি ও অ্যাডভান্সড সার্ফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেমস সরবরাহ ও সংস্থাপন; আরসিএজি ভিস্যাট, ভিএইচএফ এবং ভিসিসিএস সরবরাহ ও সংস্থাপন; এয়ারট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কন্ট্রোল সেন্টার (এটিএমসিসি) ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার (এটিসিটি) এবং রাডার বিল্ডিং করা হবে।

বেবিচক প্রকল্পের পটভূমিতে বলেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ব্যবহৃত সার্ভিলেন্স সিস্টেমটি প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি রাডার সমন্বয়ে গঠিত, যা ফ্রান্স সরকারের অনুমোদনে যথাক্রমে ১৯৮৪ ও ১৯৮৬ সালে সংস্থাপন করা হয়। নিরবচ্ছিন্নভাবে রাডার কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে উভয় রাডার ১৯৯৫ ও ২০০৮ সালে মেরামত, ওভারহোলিং ও আপগ্রেড করা হয়। ইতোমধ্যে উভয় রাডারের আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে। বিদ্যমান রাডার ব্যবস্থাটি আপগ্রেড করে দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ এ রাডারটি প্রায় ৩৫ বছরের পুরোনো এবং খুচরা যন্ত্রাংশ দুষ্প্রাপ্য এমনকি কিছু কিছু আইটেম অবসোলেট হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে প্রয়োজনীয়তা থাকলেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিদ্যমান রাডার দুটি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা দুরূহ হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো সেকেন্ডারি রাডার আপগ্রেড করা হলেও এটি কনভেনশনাল এসএসআর হওয়াতে তা দিয়ে আইকাওয়ের মান বজায় রাখা সম্ভব নয়। পুরোনো এল-ব্র্যান্ড প্রাইমারি রাডারকে এস-ব্র্যান্ডে উন্নয়ন ও কনভেনশনাল সেকেন্ডারি রাডারকে মোড এস-এ রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি।

আইকাও এবং এশিয়া প্যাসিফিক এয়ার নেভিগেশন প্ল্যানিং অ্যান্ড ইমপ্লিমেনটেশন রিজিওনাল গ্রুপ (এপিএএনপিআইআরজি) এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সব দেশকে নতুন প্রযুক্তির অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভিলেন্স-ব্রডকাস্ট (এডিএস-বি) এবং মাল্টিলেটেরেশন (এমএলএটি) স্থাপনের মাধ্যমে আকাশে উড়োজাহাজের চলাচল/উড্ডয়ন নিরাপদ করার জন্য যে সুপারিশ করেছে, তা অনুসারে এডিএস-বি এবং এমএলএটি স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশকে নিরাপদ সার্ভিলেন্স সিস্টেমের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এডিএস-বি সার্ভিলেন্স সিস্টেম স্যাটেলাইটভিত্তিক হওয়ায় এটি রাডারের তুলনায় অধিকতর নির্ভরশীল। রাডার ডাটাপ্রতি ৪ বা ৮ সেকেন্ডে আপডেট হয় অথচ এডিএস-বি ডাটা প্রতি সেকেন্ডে আপডেট হয়। ফলে এয়ারক্রাফটের সেপারেশন কমে আসবে এবং আকাশপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। গ্রাউন্ড কন্ট্রোলিংয়ের জন্য এমএলএটি সংস্থাপন জরুরি। এডিএস-বি এভিয়নিক্স সমৃদ্ধ এয়ারক্রাফট পরস্পরের অবস্থান বুঝতে পারায় বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি অধিকতর সহায়ক। আবার এখনো অনেক এয়ারক্রাফট এডিএস-বি এভিয়নিক্স সমৃদ্ধ না হওয়ায় এ মুহূর্তে রাডার সার্ভিলেন্স বাদ দেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া ব্যাক-আপ সার্ভিলেন্স হিসেবেও রাডারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ৫২টি দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। দেশি-বিদেশি মোট ৩০টি এয়ারলাইন্স এ দেশ থেকে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত ফ্লাইটের প্রায় ৮০ শতাংশ হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত হয়। দেশে আকাশপথে যাত্রী চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে এ বিমানবন্দরে বিদ্যমান প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল ভবনের পর জাইকার ঋণে তৃতীয় টার্মিনাল ভবন নির্মাণের জন্য প্রকল্প কাজ চলমান রয়েছে

হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা দেশের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক ককপিট যন্ত্রাবলি ও এভিয়নিক্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এবং বাংলাদেশের আকাশসীমায় নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বিমান চলাচলের সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে আলোচ্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন আবশ্যক বলেও উল্লেখ করেছে বেবিচক।

পিডি/এমআরআর/বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]