যেভাবে বদলে গেলো দিঘীনালার সতীশের জীবন
বর্তমান সময়ে তরুণদের বেকারত্ব দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ফ্রিল্যান্সিং। একটি বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫ লাখের অধিক ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। ফ্রিল্যান্সিং কোনো সহজ কিছু নয় যে রাত জেগে বসে থাকলে ডলার আসতে শুরু করবে। এখানে প্রয়োজন পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মেন্টরের সঠিক নির্দেশনা। তেমনি একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হচ্ছেন প্রত্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালার সতীশ চাকমা।
করোনা মহামারির শুরুতে যখন গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটছিল সতীশের। পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং ভবিষ্যত ক্যারিয়ারের কথা ভেবে নতুন কিছু একটা শুরু করার চিন্তা করছিলেন। কিন্তু সুযোগ ছিল সীমিত। খাগড়াছড়ির দিঘীনালার মতো প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কোনো কিছু শেখা বা শুরু করাটা স্বাভাবিক সময়েই যতোটা কঠিন তার থেকেও বেশি দুরূহ ছিল করোনার সময়।
সতীশ বলেন, ‘সারা বিশ্বে যখন এই মহামারির কবলে বন্দি, ঘরে বসে নতুন কিছু শেখার আশায় আমি তখন ভর্তি হয়ে যাই “শিখবে সবাই” এর অনলাইন গ্রাফিক্স অ্যান্ড ইউ ডিজাইন কোর্সে। অথচ সত্যি বলতে আমার ফ্রিল্যান্সিং বা গ্রাফিক্স নিয়ে ন্যূনতম কোনো ধারণা ছিল না। আমি পুরো ব্যাপারটিকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিই। আমার পুরনো মডেল-এর ল্যাপটপ, বেশ স্লো কাজ করে। তাই দিয়েই আমার কাজ শেখা শুরু। প্রতিদিন প্রায় গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা প্রাক্টিস করতাম। কোর্স শেষ হওয়ার পর ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ২০০+ বায়ার রিকোয়েস্ট পাঠাই এবং মজার ব্যাপার হলো আমি একটাও বায়ার রিকোয়েস্ট এ কোনো রিপ্লাই পাইনি! হতাশ হয়েছি, কিন্তু হাল ছাড়িনি! দেড় মাস পর গিগ থেকে প্রথম অর্ডার পাই ১২০ ডলারের। প্রথম কাজ দিয়েই আমার পুরো কোর্সের ভর্তির টাকা উঠে আসে। সত্যি বলতে এরপর আর পিছু ফিরতে হয়নি। প্রায় তিনমাসে লেভেল ওয়ান প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে লেভেল টু ব্যাজ পাই। আমি কিন্তু এর মধ্যে থেমে থাকিনি। গ্রাফিক্সের কোর্স শেষ হওয়ার একমাস পর ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোর্সে ভর্তি হই। ৮/১৯ ঘণ্টার উপর কাজ করতে অসুস্থ হয়ে পরি একসময়৷ টিম বিল্ডিংয়ের আইডিয়াটা আসে তখন। কমিউনিটিতে পোস্ট করি আর কয়েকজনের কথা বলে একটা ছোট টিম বিল্ড করি গ্রাফিক্সের কাজের জন্য। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি আমি। ফ্রিল্যান্সিং করে এখন অবদি ফাইভার মার্কেটপ্লেস থেকে ৮৩২৮ ডলার, আপওয়ার্ক থেকে ৯০০ ডলার, রিমোট জব (ইউএসএ ক্লায়েন্ট) থেকে ১৩০০০ ডলার এবং লোকাল ক্লায়েন্টের কাজ করে প্রায় ৬০০ ডলার, মোট আয় (২২,৮২৮ মার্কিন ডলার বা ২৩ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি) করতে সক্ষম হয়েছি।
সতীশ আরও বলেন, শেখার কোনো শেষ নাই। তবে নতুন কিছু শেখার জন্য সঠিক নির্দেশনা এবং অধ্যাবসায় অনস্বীকার্য। শিখবে সবাই আমায় স্কিল ডেভেলপমেন্ট এ যেভাবে সহায়তা করেছে এবং এখন অবধি করে যাচ্ছে তার জন্য আমি চির কৃতজ্ঞ। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই যুগে টিকে থাকার জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্টের বিকল্প নেই। একটি ডেভেলপড স্কিল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা দেয়। আমার ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম কারণ টাইম ফ্লেক্সিবিলিটি। এতে করে আমি আমার অন্য শখ এবং স্বপ্নগুলোকে সত্যি করতে পারছি। সাইকেল রাইডিং আমার অন্যতম শখের মধ্যে একটি। সাইকেলে দেশের প্রায় ৪০টি জেলায় পা দেওয়া হয়েছে আমার, ইচ্ছা আছে পুরো পৃথিবী সাইকেলে ভ্রমণের৷
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমনি অনেক সফল ফ্রিল্যান্সার গড়তে অবদান রেখে চলেছে শিখবে সবাই। এখন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজারের মতো শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, পিএইচপি এবং লারাভেল, মোশন গ্রাফিক্স, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো আরও বেশ কিছু কোর্স করিয়ে থাকে শিখবে সবাই।
এছাড়াও বেশ কিছু সামাজিক উন্নয়ন প্রজেক্ট নিয়েও কাজ করে চলেছে শিখবে সবাই। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য- দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ, সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের গ্রাফিক্স ডিজাইন প্রশিক্ষণ।
অফলাইন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অনলাইন প্রশিক্ষণকে সমান অগ্রাধিকার এবং কোর্স পরবর্তী নিরবচ্ছিন্ন সাপোর্ট সেবা সারা দেশে প্রদান করে চলেছে শিখবে সবাই। যা শিখবে সবাই এর স্লোগান “বাদ যাবে না কেউ, শিখবে সবাই” এর স্বার্থকতা বহন করে।
জেএইচ/এএসএম