বাপার সভায় ড. আতিউর
জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২৭ বছরে প্রয়োজন ২৩০ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহ-সভাপতি ড. আতিউর রহমান বলেছেন, জলবায়ু চ্যালেঞ্জের শিকার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির জীবন ও জীবিকা সংরক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ও কর্মসূচিতে আগামী ২৭ বছরে ২৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের দরকার হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাপার আয়োজিত ‘বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু খাত: বরাদ্দ বিশ্লেষণ ও আগামীর পথনকশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় একথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’, বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনাসহ অনেকগুলো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে রয়েছে। এসব পরিকল্পনার আলোকে আমরা সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ও কর্মসূচিতে বিশ্ব জলবায়ু তহবিল ও অন্যান্য অন্তর্জাতিক তহবিল থেক বাড়তি অর্থায়ন চাই। আমরা জলবায়ুর আঘাতে সবচেয়ে বিপর্যস্ত এক দেশ। আমরা যে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা করেছি তাতে আগামী ২৭ বছরের ২৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের দরকার হবে। আর তাপমাত্রা যদি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যায় তাহলে এর চেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে।
ড. আতিউর রহমান বলেন, দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের ১৭ শতাংশহই আসে ইটভাটা থেকে। তাই জল-জন-জমি-বায়ু দূষণকারী এই প্রচলিত ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লকের উৎপাদনে বিশেষ বরাদ্দ, ব্যবহারে বিশেষ প্রণোদনা (করছাড় হতে পারে) এবং ইটের ওপর ভ্যাটের পাশাপাশি বিশেষ ডিউটি আরোপ করতে হবে। তা ছাড়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্পকে নিরুৎসাহিত করে পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানিতেই সমাধান মিলবে, এ ধারণা ভুল। ম্যাক্রো অর্থনীতির বাস্তবতায় এই কৌশল ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। আমরা এখন ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছি। কিন্তু প্রাথমিক উপকরণের (গ্যাস ও তেল) অভাবে আমরা এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না। আর অমাদের এখন চাহিদাও এর চেয়ে কম, ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এই চাহিদা মেটাতেও আমরা জ্বালানি উপকরণের ব্যাপক আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছি। এ জন্য যে বিদেশি মুদ্রার প্রয়োজন হবে তার সংস্থান কতোটা সম্ভব হবে তাও ভেবে দেখতে হবে। তাহলে আমরা পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের দিকে আরও জোরালো উদ্যোগ কেন নিচ্ছি না? বাংলাদেশ ২০২০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাবার পরিকল্পনা করেছিল। বাস্তবে এখনও আমরা মোট জ্বালানির মাত্র ২ শতাংশের বেশি সবুজ জ্বালানি উৎপাদন করতে পারছি না।
সভায় আরও আলোচনা হয়, এখন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি হয়ছে। পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেশি জমির দরকারও হয় না। আর আমাদের ফ্যাক্টরি, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদসহ যতগুলো কমিউনিটি স্থাপনা আছে সে সবের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করলে ৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। গাজীপুরের কাশিমপুরে একজন উদ্যোক্তা বিশ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করে ৩৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টার বেশি সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছেন। এই ব্যবস্থায় যদি আমরা সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দিতে পারতাম তাহলে ঢাকাসহ পুরো দেশেই বাড়ির ছাদ ও খোলা জায়গায় সোলার প্যানেলে ছেয়ে যেতো। তবে উচ্চমানের প্যানেল আমদানি ও উৎপাদনের জন্য যে ধরনের বাজেট সংশ্লিষ্ট সহায়তার প্রয়াোজন ছিল তা থেকে আমরা এখনও অনেক দূরে। এখনও এসব যন্ত্রপাতির ওপর ২৬ শতাংশ থেকে ৫৮ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। কার্যত এগুলো করমুক্ত হওয়া উচিত। অথচ আমাদের মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান বলছে, ২০৪০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ৪০ শতাংশই নবায়নযোগ্য করে ফেলা হবে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে সেই লক্ষ্য পূরণের কোনো ইঙ্গিত নেই।
বেশি কিছু প্রস্তাব করা হয় আলোচনায় সভায়। সেগুলো হলো-
> গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এ বরাদ্দ থেকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞানীরা যাতে সহজে বাজেট পেতে পারে এ জন্য জুরি বোর্ড গঠন করা ও টেকসই উন্নয়নে জলবায়ু অর্থায়ন প্রকাশনাটি অব্যাহত রাখা।
> টেকসই নগরায়নের দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। নগরের বাড়ির ছাদে নির্ভরযোগ্য সোলার প্যানেল স্থাপনে নেট মিটারিং ব্যবস্থায় সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদনকাারীদের জন্য ২০থেকে ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে প্রতিটি ছাদে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যাগকে উৎ্সাহিত করা। সরকার, স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মাঝে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আরও সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ানো।
> সামগ্রিকভাবে কৃষি জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য উৎপাদন ব্যবস্থায় রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। কৃষিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে বিশেষ করে সোলার ইরিগেশন পাম্প বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।
> পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্পকে নিরুৎসাহিত করা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া। তামাক উৎপাদন ও বিপণনে নিরুৎসাহিত করার মতো বিশেষ শুল্ক-ভ্যাট, ট্যাক্স আরোপ করা।
> এবং দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের ১৭ শতাংশই আসে ইটভাটা থেকে। তাই জল-জন-জমি-বায়ু দূষণকারী প্রচলিত ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লকের উৎপাদনে বিশেষ বরাদ্দ, ব্যবহারে বিশেষ প্রণোদনা (করছাড় হতে পারে) এবং ইটের ওপর ভ্যাটের পাশাপাশি বিশেষ ডিউটি আরোপ করা। নগরে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বাঁচার তাগিদে আসা জলবায়ু শরণার্থী যে প্রান্তজন কায়ক্লেশে জীবনযাপন করছে, তাদের সন্তানদের জন্য কমিনিউটি ডে-কেয়ার সেন্টার , শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সুবিধাসহ সামাজিক সুরক্ষা কি করে বাড়ানো যায় বাজেটে তার স্পষ্ট দিক নির্দেশনা থাকা।
ইএআর/এসএনআর/এএসএম