বিশেষ রাবারে আঙুলের ছাপ চুরি করে সিম বিক্রি

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
তৌহিদুজ্জামান তন্ময় তৌহিদুজ্জামান তন্ময় , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩

# সিম কোম্পানিতে চাকরি করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংরক্ষণ
# বিশেষ অ্যাপস তৈরি করে গ্রাহকের অজান্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে সিম অ্যাক্টিভেট
# অ্যাক্টিভ সিম দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি
# ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে অপরাধীর কাছে বিক্রি
# অবৈধভাবে ৮০০ সাধারণ মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ
# অন্যের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে সিম অ্যাক্টিভ করে অপরাধীদের কাছে ২ হাজারে বিক্রি
# এনআইডির তথ্য ও জন্ম তারিখও বিক্রি

চক্রের সদস্যরা বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী নয়। তাদের কেউ অষ্টম শ্রেণি আবার কেউ এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এই শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে তারা বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো চাকরি করতেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রযুক্তিগত বিদ্যায় পারদর্শী। নিজেরাই বিভিন্ন অ্যাপস তৈরি করতে পারেন। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তির অজান্তে প্রতারণামূলকভাবে অভিনব কৌশলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে মোবাইল ফোনের সিম অ্যাক্টিভ করেন। পরে এসব সিম বিভিন্ন অপরাধীর কাছে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।

অপরাধীরা এসব সিম কিনে নিয়ে বিভিন্ন অপরাধ ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড করছে। এছাড়া তারা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে সেগুলো অনলাইনে বিক্রিও করে। যেকোনো ব্যক্তিগত তথ্য তারা টাকার বিনিময়ে মানুষকে সরবরাহ করতো। চক্রের সদস্যরা অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার হাটও তৈরি করেছিল।

বিশেষ রাবারে আঙুলের ছাপ চুরি করে সিম বিক্রি

অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তারা ক্রেতা সংগ্রহ করতো। এভাবে গত কয়েকবছর ধরে এসব কর্মকাণ্ড করে তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছে। পরে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ এ চক্রের ৮ জনকে গ্রেফতার করে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরীসহ কুড়িগ্রাম ও রংপুর থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

গ্রেফতার আটজন হলো, মো. মাসুদ (২২), মেহেদী হাসান (২৪), আল আমিন মিয়া (২৬), আরাফাত রহমান (২৩), নুর আলম (২৪), ইমন হোসেন (২৫), সোহেল রানা (৩৬) ও মো. শাকিল (২৫)। তাদের মধ্যে সোহেল রানা ও মো. শাকিল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। বাকিরা এইচএসসি পাস। পেশায় সবাই চাকরিজীবী।

বিশেষ রাবারে আঙুলের ছাপ চুরি করে সিম বিক্রি

গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত একটি মোবাইল অ্যাপস, ৮০০টি বিশেষ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্টের অনুলিপি, বিভিন্ন ব্যক্তির বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করা ১১০টি অ্যাক্টিভ সিম, ২টি কম্পিউটার, ৫টি মোবাইল ফোন, ৩টি ফিঙ্গার স্ক্যানার, একটি গ্লুগান জিটি-১০ মেশিন ও অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন অ্যাপস।

সিম কোম্পানিতে চাকরি করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংরক্ষণ:

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেফতার মো. মাসুদ এইচএসসি পাস করে বাংলালিংকে এসআর পদে চাকরি নেন। প্রযুক্তিবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ায় বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেমন, রবি, বাংলালিংক এবং বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ আ্যপসের এপিআই সংগ্রহ করে অপর সহযোগী সফটওয়্যার ডেভেলপার মেহেদী হাসানের কাছে সরবরাহ করতেন। তাকে দিয়ে টিকটক প্রো যা ডিজিটাল প্রো সার্ভিস নামে পরিচিত একটি বিশেষ অ্যাপস তৈরি করা হয়।

এছাড়া মাসুদ তার কাছে সিম কেনা ও রিপ্লেস করতে আসা ব্যক্তিদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট তথা বায়োমেট্রিক তথ্য বিশেষ কৌশলে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে রেখে দিতেন। ওই ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে সিম অ্যাক্টিভ করে অপরাধী চক্রের কাছে প্রতিটি সিম দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি করতেন।

মাসুদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের কাজে বাংলালিংকে এসআর পদে চাকরি করা ইমন হোসেন, সোহেল রানা ও শাকিল সহযোগিতা করতেন।

ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে অপরাধীর কাছে বিক্রি:

ডিবি জানায়, গ্রেফতার মেহেদী প্রযুক্তিবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী। এসএসসি পাস করে অনলাইনের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রসেসিং শেখেন। যেকোনো অ্যাপস ও সফটওয়্যার তৈরি করতে সক্ষম মেহেদী। টিকটক প্রো নামের একটি বিশেষ অ্যাপস তৈরি করেছে। এই অ্যাপসের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন অপরাধীর কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতেন।

গ্রেফতার নুর আলম টাকার বিনিময়ে আল আমিন মিয়া ও মো. আরাফাত রহমানের কাছ থেকে জিপি বায়োমেট্রিক কিনে এনআইডি সার্ভার সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন।

বিশেষ রাবারে আঙুলের ছাপ চুরি করে সিম বিক্রি

বায়োমেট্রিক তথ্য অপরাধ চক্রের কাছে বিক্রি:

গ্রেফতার আল আমিন মিয়া ও আরাফাত রমজান দুই ভাই। তারা পীরগঞ্জে জিপি কাস্টমার কেয়ারে চাকরি করতেন। ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে তাদের কাছে জিপি নম্বরের বায়োমেট্রিক তথ্য পাওয়া যায় এবং এসব তথ্য টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন অপরাধ চক্রের কাছে বিক্রি করেন।

অবৈধভাবে ৮০০ ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ:

এছাড়া গ্রেফতার মাসুদ, ইমন হোসেন, সোহেল রানা ও শাকিল এমএন টেডার্স (বাংলালিংক হাউজ) এ এসআর পদে চাকরি করতেন। আসামিরা সিম রিপ্লেস ও কিনতে আসা ব্যক্তিদের হাত পরিষ্কার করার নামে বিশেষ একটি রাবারের সাদৃশ্য বস্তুতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে গ্লু-গানের সহায়তায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে সংরক্ষণে রাখতেন।

পরে রাবারের সংরক্ষণ করা বিভিন্ন ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ওই ব্যক্তিদের অজান্তে এনআইডির বিপরীতে সিম অ্যাক্টিভ করে বিভিন্ন অপরাধী-প্রতারকদের কাছে বেশি দামে বিক্রয় করেন। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির ৮০০ আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া গেছে।

অন্যের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে সিম অ্যাক্টিভ করে অপরাধীদের কাছে ২ হাজারে বিক্রি:

ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুনায়েদ আলম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, চক্রটি কৌশলে মানুষের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে সেগুলো দিয়ে সিম বায়োমেট্রিক করে অপরাধীদের কাছে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা দামে বিক্রি করতেন। এছাড়া টিকটক প্রো নামের একটি বিশেষ অ্যাপস তৈরি করে রবি, জিপি, টেলিটক, বাংলালিংক ও এনআইডির এপিআই সরবরাহ করেন।

বিশেষ রাবারে আঙুলের ছাপ চুরি করে সিম বিক্রি

এনআইডি ও জন্ম তারিখ সংগ্রহ করে বিক্রি:

অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুনায়েদ আলম সরকার আরও বলেন, অ্যাপের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে মানুষের সিমের বায়োমেট্রিক, এনআইডি টু মোবাইল নম্বর, নগদ, বিকাশ এনআইডি তথ্য, রবি এয়ারটেল টাওয়ার লোকেশন, সিম লোকেশন, আইডিকার্ড সার্ভার কপি, আইডিকার্ড সাইন কপি ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য দেয়। চক্রের অনেক সদস্য বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করেন। এই সুযোগে তারা বিভিন্ন জনের এনআইডি তথ্য ও জন্ম তারিখ সংগ্রহ করে এসব তথ্য বিক্রি করেন।

তথ্য ফাঁস রোধে পরামর্শ:

তথ্য ফাঁস রোধে বেশকিছু পরামর্শ দিয়ে এডিসি জুনায়েদ সরকার বলেছেন, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে এনআইডি নম্বর এবং জন্ম তারিখের বিপরীতে এনআইডিতে থাকা তথ্য যাতে সহজে পাওয়া না যায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তার স্বার্থে স্পর্শকাতর তথ্য পাওয়ার ওয়েবসাইট অ্যাপ ইত্যাদি যে সব ডিভাইসে ব্যবহৃত হয় সেসব ডিভাইস ম্যাক বাইন্ডিং করতে হবে। নির্দিষ্ট ডিভাইস ছাড়া ওই সব ওয়েবসাইট কিংবা অ্যাপে প্রবেশ করা প্রতিহত করতে হবে। মোবাইল কোম্পানিগুলো থেকে যাতে সহজেই কেউ পরিপূর্ণ এনআইডি নম্বর পেতে না পারে সে বিষয়গুলো মোবাইল কোম্পানি কর্তৃক নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো স্পর্শকাতর ওয়েবসাইট যেখান থেকে এনআইডি নম্বরের বিপরীতে এনআইডি তথ্য প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে সে সব জায়গায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখা। মোবাইল কোম্পানি তাদের বিভিন্ন কাস্টমার কেয়ার ইউনিট এবং সেলস পয়েন্টের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা এবং প্রতারণামূলকভাবে কেউ বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করছে কি না সে বিষয়টি নিশ্চিত করা।

এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড নিয়মিত পরিবর্তন করা। প্রতারণামূলকভাবে অন্যের তথ্য বিক্রি করা এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করা বাংলাদেশ প্রচলিত আইনে একটি অপরাধ। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর কথা বলেছে, ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

টিটি/এসএনআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।