আগুনে ব্যবসা নয়, পুড়েছে জীবিকা
জুয়েলারি ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন ও তার ভাইয়ের ছয়টি দোকান ছিল মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে। সব দোকানই আগুনে পুড়ে শেষ। এতে ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। এখন নিঃস্ব তারা। কি করবে কূলকিনারা করে উঠতে পারছেন না।
মোবারক হোসেনের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে তার কথায়। তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নিয়েছে আগুন। সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া আবার নতুন করে সবকিছু যেন করে দেয়। নয়তো পথে বসে যাবো, আমরা এখন অসহায়।
শুধু মোবারক হোসেনই নয়, তার মতো এমন কয়েকশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতের ভয়াবহ আগুনে উপার্জনের পথ হারিয়েছেন। ফলে এখন তাদের পরিবার নিয়ে চলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, মার্কেটটিতে ১৮টি সোনার দোকানসহ মেশিনারিজ, কাপড়, জুতা, নিত্যপণ্য ও সবজির দোকানও ছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগুনে অধিকাংশ দোকানই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

তেমনই একজন মো. সাদেকুল ইসলাম সাগর। ‘সাগর ফ্যাশন’ নামে একটি দোকানের মালিক তিনি। অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঘটনাস্থলে আহাজারি করছিলেন।
আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ১৮ সোনার দোকান পুড়ে ছাই
তিনি বলেন, ‘কি কইরা বাঁচবো, কেমনে বাঁচবো এত চিন্তা কইরা লাভ হইবো না এখন আর। এখন যদি আমি গড়াগড়ি করে কান্দি আমারে কেউ দিবো না। আমার মাল তো আর ফেরত দিবো না কেউ। এই যে সবাই নানা আলাপ করতেছে, কি দিবো আমাদের জানা আছে। একবেলা বাজারের টাকাও দিবো না। এই করবো, সেই করবো। এ পর্যন্ত ৫০০ ফোন রিসিভ করেছি। সবাই সান্ত্বনা দেয়, আর কি দিবো কন? কেউ কইবো না যে আমার কাছে টাকা আছে ২০ লাখ তুমি নিয়ে চলো। কেউ কইবো না, থাকলেও টাকা দিবো না। কারণ দেখবো আমি পরে এই টাকা কোথা থেকে দিবো।’
আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কিচ্ছু নাই, সব পুইড়া ছাই হইয়া গেছে। ৩৫-৪০ লাখ টাকার মাল ছিল আমার।’
বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ৪টার দিকে মোহাম্মদপুরে কৃষি মার্কেটে আগুন লাগে। খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে একে একে ১৭টি ইউনিট যুক্ত হয়। প্রায় সোয়া পাঁচ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন। এসময় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীও ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করে।

বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ৮০০টির বেশি দোকান ছিল
কৃষি মার্কেটে ৩১৭টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কিন্তু মার্কেটটিতে বৈধ-অবৈধ মিলে প্রায় ৮০০টির বেশি দোকান ছিল। বৈধ দোকানের প্রায় সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে গড়ে তোলা দোকান ও ফুটপাতের অনেক দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, আগুনে প্রায় পাঁচ শতাধিক দোকান পুড়েছে।
আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে কোনো ফায়ার সেফটি ছিল না
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, অবৈধ দোকানগুলো ছিল ফুটপাতে। এরমধ্যে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেখানে ২১৭ দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কেটের ভেতরে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল। কিন্তু মার্কেট সমিতি কাজগুলো না করায় এখন আমরা ভয়াবহতা দেখতে পাচ্ছি।
রাতে মার্কেটে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকে, আগুন লাগা নিয়ে প্রশ্ন
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাত ১০টায় কৃষি মার্কেটের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সকালে দোকান খোলার আগ পর্যন্ত বন্ধ থাকে বিদ্যুতের লাইন। কিন্তু মার্কেটটিতে রাত পৌনে ৪টায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ব্যবসায়ীদের দাবি, বিদ্যুতের লাইন বন্ধ থাকার সময় শর্ট সার্কিট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে রয়েছে তাদের সন্দেহ।

আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে আগুন লাগে হক বেকারি থেকে
‘আমাদের ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাকের দোকানের মালিক শহীদুল ইসলাম মানিক জাগো নিউজকে বলেন, বিদ্যুতের মেইন লাইন বন্ধ থাকে। তবে ভেতরে আলোর জন্য সিকিউরিটি লাইন থাকে। যদি শর্ট সার্কিটও হয়, তাহলে সামান্য আগুনে এত বড় আগুন হওয়ার কথা না। প্রত্যেকটা আগুনই লাগে রাতে, যখন মার্কেট বন্ধ থাকে। অথচ আগুন লাগার কথা মার্কেট চলাকালীন অবস্থায়। তখন মানুষের অ্যাক্টিভিটি থাকে, বিদ্যুতের লাইন থাকে। রাতে তো বিদ্যুতের লাইন সব বিচ্ছিন্ন, তখন আগুন লাগার বিষয় আসলে কী।
ফায়ার সার্ভিসের কাজ নিয়ে প্রশ্ন ব্যবসায়ীদের
কৃষি মার্কেটে কসমেটিকসের দোকান ছিল আফসানার। আগুনে ২০-২২ লাখ টাকার জিনিসপত্র পুড়েছে তার। পুড়ে যাওয়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আফসানা জাগো নিউজকে বলেন, রাত সাড়ে ৩টায় আগুনের খবর পেয়ে আসি। ফায়ার সার্ভিস দুটা গাড়ি, সামান্য পানি নিয়ে আসছে। তখন শুধু মুদির দোকানের দিকেই জ্বলছিল আগুন। সাধারণ মানুষ কাজ করেছে। কৃষি মার্কেটে তো এতক্ষণ আগুন ধরার কথা না। রাস্তা ফাঁকা, গাড়ি আসতে পারে। তারপরও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসেনি।
আরও পড়ুন: মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ থাকলে ভেঙে দেওয়া হলো না কেন
মার্কেটটির আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, যখন পুড়ছিল তখন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসে মাত্র দুটি। তারা শুরুতেই যদি বেশি পানি নিয়ে আসতো, তাহলে আগুন তখনই নেভানো যেত। সকালে পুড়ে যখন প্রায় শেষ, তখন ফায়ারের বাকি সব গাড়ি আসে। আর আগুনে সব পুড়ে যাওয়ার পর বলছে ফায়ার সেফটি ছিল না।
কৃষি মার্কেটে ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা
আগুন নিয়ন্ত্রণের পর ক্ষতিগ্রস্ত মার্কেটের সামনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, কৃষি মার্কেটে কোনো ফায়ার সেফটি ছিল না। প্রাথমিক ফায়ার ফাইটিংয়ের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না এখানে। ফুটপাত ও সড়কে দোকান থাকায় এবং উৎসুক মানুষের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়েছে। পানিরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। তাদের বারবার নোটিশ দেওয়া হয়। বিভিন্নভাবে গণসংযোগ করা হয়। কিন্তু তারা এতে সাড়া দেয়নি। এ মার্কেট কিছুটা বঙ্গবাজারের মতো। ভেতরে ছোট ছোট অনেক সাবওয়ে ছিল। ভেতরের যত রাস্তা এবং বাইরের ছোট ছোট রাস্তা সবগুলোতেই মালামাল রাখা ছিল। গাদাগাদি করে বন্ধ করা ছিল রাস্তা। পুরো মার্কেটটাই গেট দিয়ে আটকানো ছিল।

তিনি বলেন, আগুনের খবর পেয়ে ৯ মিনিটের মাথায় আমরা এখানে চলে আসি। রাত ৩টা ৫২ মিনিট থেকে আগুন নির্বাপণের কাজ শুরু করি আমরা।
আরও পড়ুন: সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণে
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যের বিষয়ে ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হাসান মাহমুদ বলেন, মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এমন কোনো কাগজ আমরা পাইনি। আর এ মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ থাকলে ভেঙে দেওয়া হলো না কেন?
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন-মার্কেট সিলগালা করবে ডিএনসিসি
রাজধানীতে নয়টি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের মধ্যে মোহাম্মদপুরে দুটি মার্কেট রয়েছে। মার্কেট দুটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। কৃষি মার্কেটেও ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশন আওতাধীন যে ভবন ও মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে ১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছি। কোনো বাধা, কোনো কিছুর মুখেই আমরা আর থামবো না। এ ভবনগুলোতে ব্যবসায়ী এবং বসবাসকারী যারাই থাকুক, তাদের সেখান থেকে বের করে সিলগালা করে দিতে হবে।
তালিকা করে মানবিক সহায়তা
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিক, ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সহযোগিতার জন্য বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
জেল প্রশাসনের সহকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবুবকর সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিক, ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের তালিকা করছি। তালিকার জন্য তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর যাচাই-বাছাই করে সহায়তা করা হবে।
ফায়ার সার্ভিস-ডিএনসিসির তদন্ত কমিটি
কৃষি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করা হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘দোকান থেকে যা বের করছি, সেগুলো তো অচল’
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়সহ সার্বিক বিষয় তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছে ডিএনসিসি। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে সভাপতি করে কমিটিকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, কমিটিতে মার্কেটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বা দায়িত্বশীল কাউকে রাখা হোক। আমরা আসলে জানতে চাই, এগুলো শর্ট সার্কিট থেকে হচ্ছে কি না। আমরা মার্কেট যখন বন্ধ করি, তখন মেইন সুইচ বন্ধ করি। তারপরও শর্ট সার্কিট হয় কোথা থেকে, এটা আমাদের জানার বিষয়। সব বিষয় তদন্ত কমিটিকে খুঁজে বের করতে হবে।
আরএসএম/জেডএইচ/এএসএম