দাহকাল


প্রকাশিত: ০৯:১৪ এএম, ২৭ মার্চ ২০১৬

taslimaআটটা বেজে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে দরোজা খুলে একটি মুখ উঁকি দেবে। কিউবিকলের সামনে ত্রিশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করবে, আজ কেমন আছেন চারুলতা। চারুলতা কখনো ছোট্ট করে উত্তর দেবে, “ভালো”। কখনো শুধু একটু হাসবে। তিন বছর ধরে এটাই প্রতিদিনের অভ্যাস। চারুলতা ল্যাপটপে নিমগ্ন হবে। ওঘর থেকে টুকটাক কিছু শব্দ আসবে। রুমে ঢুকেই তিনি ড্রয়ার টেনে ল্যাপটপ বের করবেন। কাঁচের বোতল থেকে মগে পানি ঢালবেন। উঠে এসে কফি কর্নারে যাবেন। অর্ধেক মগ গরম পানিতে দু’চামচ নেসক্যাফে, ব্যস আর কিচ্ছু না। এর মধ্যে ঢেলে দেয়া হবে অর্ধেক মগ নরমাল পানি। কুৎসিত এই জিনিসটা ইনবক্স ফ্রি করতে করতে গলায় ঢালবেন তিনি। ফাঁকে ফাঁকে কাজের আপডেটগুলো জেনে নেবেন চারুলতার কাছ থেকে। জরুরি মিটিংয়ের লিস্টটা আগেরদিন শেষ বিকালে পাঠিয়ে রাখে চারুলতা। অফিসের বাইরে কোথাও মিটিং থাকলে হাতের কাজ গুছিয়ে বের হয়ে যাবেন। যাবার আগে চারুলতার কিউবিকলের সামনে ত্রিশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলবেন, ভালো থাকবেন চারুলতা।

চারুলতা ভালো থাকে শুধু তার ফিরে আসার অপেক্ষায়। সে এই অফিসে জয়েন করেছে তিন বছর প্রায়। দশ ফিট বাই দশ ফিটের একটি কক্ষ। সাইডিং গ্লাসের পার্টিশন দেয়া। পার্টিশনের এপাশে বসে চারুলতা আর ওপাশে মেহেদী হাসান। মেহেদী হাসান সাহেবের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। তিনি বিপত্নীক। সংসারে তাঁর কোনো সন্তানও নেই। একা একজন মানুষ। চারুলতার প্রথম জয়েনিংয়ের দিন মেহেদী হাসান বলেছিলেন, চারুলতা শুধু আমার কাজগুলোয় একটু সাহায্য করবেন। আমি ভুলোমনা মানুষ, মনে করিয়ে দেয়ার দায়িত্বটুকু আপনাকে দিলাম। আর বাকি সময়টুকু নিজের মত করে কাটাবেন। আপনি ছোট মানুষ চাইলে কিছু পড়াশুনা করতে পারেন, গান শুনতে পারেন। আর আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই।

মানুষটার সাথে দুদিন কাজ করেই চারুলতা বুজতে পেরেছিল, তাঁকে ভয় পাবার আসলেই কিছু নেই। শিক্ষকের মত কিছু আচরণ করেন অনেক সময়। মেহেদী হাসান তাঁর কাজের আটঘন্টায় বড় একটা অবসর সময় পাননা। যদি কিছুটা সময় মেলে তো চারুলতার সাথে একটু আধটু কথা বলেন।

-আপনার পুরো নাম কি যেন বলেছিলেন
-চারুলতা রয়। আপনি আমাকে চারু কিংবা লতা বলে ডাকতে পারেন
-না না, কারো নাম ভেংগে বলা ঠিক না। আপনার বাড়িতে যেন আর কে আছে
-জি, আমার মা বাবা আর প্রমিত মানে ছোট ভাই
-ওহো। কাল শুনলাম আপনি লালনের কি যেন একটা গান শুনছিলেন
-ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
-মধুমতী নদীর পাড়ে, ছেউড়িয়ায় লালনের আখড়া। আমি অনেকবার গিয়েছি। যদি কখনো সুযোগ হয়, আপনি অবশ্যই যাবেন। কত কি যে জানার আছে, বুজলেন চারুলতা। ভক্তদের মুখের গান সামনে বসে শুনতে পারবেন। শুদ্ধতম সংগীত। আপনার বিয়ের পর স্বামীকে সংগে করে যাবেন।

চারুলতার মন তখনি ছুটে যায় ছেউড়িয়ায় পথে। ড্রাইভিং সিটে বসা মানুষটা গম্ভীর হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। খুব লো ভল্যুমে বাজছে বেদ বিধীর পর শাস্ত্র কানা। চারুলতার হাতে কাহলীল জিব্রানের একটা কবিতার বই। শেষ বসন্তে এখন বৃষ্টি হবার কথা না। কিন্তু আকাশ কালো করে আসছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তেও শুরু করে দিয়েছে। রাস্তার দুপাশে গাছগুলো এসে মাথার উপর একের সাথে অন্যে মিলেমিশে গেছে। ঝড়ো বাতাসে গাছের ডালগুলো নুয়ে নুয়ে পড়ছে। চারুলতার একটু ভয় ভয় করছে। আবার ভালোও লাগছে। অদ্ভুতরকম ভালোলাগা। মনে হয় স্বপ্নের ভেতর দিয়ে জল কেটে এগুচ্ছে তাদের সেডান গাড়ি। ড্রাইভিং সিটে যে মানুষটি নিমগ্ন হয়ে বসে আছে শুধু তার পাশে বসে থাকতে পারলেই চারুলতার এই জীবনে আর কিছু চাইনা। বিরক্তিতে মানুষটির ভ্রু কুঁচকে আছে। গজগজ করছে, কী যে অসময়ে ছাতার মাথা বৃষ্টি শুরু হলো।

অডিও প্লেয়ার অফ করে চারুলতা রিনরিনে গলায় গুনগুন করে, আজি ঝরঝর মুখর ভাদর দিনে। পায়ের কাছে দুটো ফ্লাস্ক। একটাতে চারুলতার চা। আর একটাতে গরম পানি। মগে দু’চামচ নেসক্যাফে নিয়ে আধমগ গরম পানির সাথে আধমগ নরমাল পানি মেশায় চারুলতা। তারপর নীল চুড়ি পড়া হাতে কফির মগ বাড়িয়ে দেয় সে তার স্বপ্ন মানবের দিকে। বিরক্তিতে তখনো মেহেদী হাসানের ভ্রু সামান্য কুঁচকানো।

রবিবারগুলো চারুলতার সবচে ভালোলাগার দিন। মনে মনে সে একটি স্বপ্নের ডালপালা বর্ধিত করে। শুক্র শনি দুটো দিনকে চারুলতা ধরে নেয় বিরহের দিন। যে সময়গুলো তাকে ছাড়া সেই সময়গুলো চারুলতার দহনের সময়। এই দুদিনের একদিন সে ঘরকন্নার কাজে ব্যস্ত থাকে। এক সপ্তাহে একগাদা কাপড় জমা হয়। সেগুলো ধুয়ে ইস্ত্রি করে ঠিকঠাক করা। নেক্সট সপ্তাহের গোছগাছটাও করে রাখে। শনিবার দিনটা বাহিরের কাজ। কোথাও বেড়াতে যাওয়া কিংবা কেনাকাটাটা সেরে রাখা এইসব। রবিবার সকালটা প্রতি সপ্তাহেই নতুন। আটটা বাজার পর থেকেই ভেতর ভেতর কেমন একটা ছটফটানি। একটা একটা মিনিট গুনে গুনে কাটে। অফিসের অন্যান্যরা হাই হ্যালো জানাতে আসে। চারুলতার কিছু ভাল্লাগেনা। মিনিটের কাঁটা আটের ঘরে পৌঁছানোর পর চারুলতার বুকের হৃদ স্পন্দনগুলো নিজেই শুনতে পায়।

সে এসে সামনে দাঁড়াবে। তাঁর চোখে চারুলতা খুঁজে পাবে মধুমতী নদী। নদীর পানিতে সূর্যটা টুপ করে ডুব দেয়ার পায়তারা করছে। সারাদিন রোদের পর আকাশটা এখন লালচে। বাতাসে শীতের গন্ধ পাওয়া যায়। শরীরের চামড়ায় একটু একটু টান পড়ে। শক্ত মাটিতে ঘাসের উপর মুখোমুখি বসে আছে চারুলতা আর সে। সবকিছু নির্বাক। বাতাসে চারুলতার খোলা চুল উড়ছে। কপালের উপর কিছু চুল পড়ে চোখ ঢেকে দিচ্ছে। সে ঠোঁটের রেখা বক্র করে বলল,
-আহ, কপাল থেকে চুল সরাওতো চারুলতা, আমি তোমার চোখ দেখতে পাচ্ছিনা। কি যে যন্ত্রণা করে তোমার এই চুলগুলো। চারুলতা খুঁটে খুঁটে ঘাস তুলে আর প্রিয় চোখে যন্ত্রণা খোঁজার চেষ্টা করে। যদিও খুঁজে পায় মুগ্ধতা।

নটা বেজেছে পঁচিশ মিনিট আগে। দশটার দিকে মনে হলো গলার নিচে কিছু একটা আটকে আছে। কোনো মিটিং থাকলে সেটা অবশ্যই চারুলতা জানবে। আর যদি সাডেন কিছু হয় তাহলে সেক্রেটারি হিসাবে চারুলতাকে ফোন কিংবা টেক্সট করে জানিয়ে দেয়া হয়। তবে আজ কি হলো। দশটায় মেহেদী হাসানের নাম্বারে ফোন ডায়াল করলো চারুলতা। ফোন বন্ধ। দুপুর সারে বারোটার দিকে চারুলতাকে ফোন করে মেহেদী হাসান। ফোন ধরার সময় মনে হচ্ছিলো নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো রকমে চারুলতা হ্যালো বলল।
-আমার শরীরটা ভালো নেই। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই খারাপ লাগছিল
-তাহলে আমাকে বলেননি কেন
-তখন আসলে তেমন কিছু মনে হয়নি। ভাবছিলাম বাড়ি ফিরে রেস্ট করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। দুদিন জ্বর। গত রাতে ঘুম হয়নি। সকাল থেকে ঘুমাচ্ছিলাম। অসুস্থ মানুষের ঘুম। তাই আপনাকে জানাতে পারিনি। আপনি কি অফিসে অন্যান্যদের একটু বলে দেবেন।
-আপনি একা বাসায়? কে দেখাশুনা করছে
-বাসায় আমি একা না। আমার দূর সম্পর্কের এক চাচা আমার সাথেই থাকে। সেই ঘরের সবসহ আমাকেও দেখে রাখে।
-আমি আপনার বাসায় আসি? দীর্ঘশ্বাস গোপন করার কোনো চেষ্টা ছাড়াই কথাগুলো বলে চারুলতা।
-নাহ। আমাকে দেখতে আসার দরকার নেই। আমার মনে হয় একটা কথা আপনাকে বলা দরকার। আপনি বাচ্চা একটা মেয়ে। সামনে সুন্দর একটা জীবন অপেক্ষা করে আছে। আমি দেখতে পাই, খুব ভালো একটা ছেলের সাথে আপনার বিয়ে হবে। চমৎকার যুবা পুরুষ। আপনাকে বলা হয়নি, অস্ট্রেলিয়াতে আমার এক ছোট বোন থাকে। আপনাকে আমি তার মতই স্নেহ করি। আপনার বিয়েতে আমি কলাপাতা রঙয়ের একটা শাড়ি উপহার দেব। শাড়ি পড়ে যখন আপনি সেই যুবকের সামনে দাড়াবেন তখন সে হয়তো আপনাকে কলাবতী অথবা কলাবউ বলে ডাকবে।

ফোন শেষ করে চারুলতা অফিসের নিচে নেমে আসে। ঢাকা শহরে যেখানে বাড়িঘর বানানোরই জায়গা নেই, চারুলতার অফিসে সেখানে একটা পুকুর আছে। প্রথম প্রথম চারুলতার কেমন অদ্ভুত লাগতো। মন খারাপ বা ভালো দুটো সময়েই সে পুকুরপাড়ে আসে। বাহিরে যে এত রোদ সেটা অফিসের ভেতর বসে বুঝা যাচ্ছিলনা। রোদটা ঝিম ধরে আছে। কোন একটা উপন্যাসে যেন পড়েছিল, দুপুরের এই রোদ মানুষের মধ্যে আত্মহননের লিপ্সা জাগায়। পুকুরের উপর নারকেল সুপারি আর বেল গাছ। গাছের ছায়ারা জলের উপর নাচঁছে। ঘাটের সিড়ি ভেংগে শেষ ধাপে পৌঁছায় চারুলতা। পানিতে নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছে। নীল শাড়ির রংটা তেমন নীল লাগছেনা। একটু ফ্যাকাশেটে। বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। এখন যদি চারুলতা একটু কেঁদেও ফেলে, কোনো অসুবিধে নেই। জলে মিশে যাবে কান্নার ফোঁটা। যাক মিশে যাক। জলতো সবই জল।

এইচআর/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।