ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম: সমস্যা নয়, এক ব্যবস্থাগত বিপর্যয়
(গতকালের পর)
ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মূল কারণসমূহ
১১। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে পারাপার:
অনেক স্থানে ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও মানুষ তা ব্যবহার না করে সরাসরি রাস্তা দিয়েই পারাপার হয়। অনেকের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অনীহা থাকে, আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্রিজ কিছুটা দূরে হওয়ায় পথচারীরা সেখানে পর্যন্ত হাঁটতে চান না। অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ নোংরা, অপরিষ্কার ও নিরাপত্তাহীন হওয়ায় মানুষ কষ্ট এড়িয়ে এবং সময় বাঁচাতে সড়ক ব্যবহার করে। ফলে গাড়িগুলোকে হঠাৎ ব্রেক করতে হয়, গতি কমে যায়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং পেছনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি তৈরি হয়ে যানজট সৃষ্টি হয়।
১২। ফুটপাত দখলের ফলে পথচারীর চলাচলে বাধা:
ফুটপাত পথচারীর জন্য হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় তা দখল হয়ে যায়। হকার, দোকানের মালামাল, নির্মাণসামগ্রী, মোটরসাইকেল পার্কিং, চায়ের দোকান ইত্যাদি ফুটপাত দখল করে রাখে, যা এখন এক ধরনের সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে হাঁটে এবং যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
১৩। একই রাস্তায় গাড়ি, পথচারী, রিকশা ও অটোরিকশার চলাচল:
ঢাকার সড়কে Mixed Traffic একটি বড় সমস্যা। বিশ্বের উন্নত রাজধানীগুলোতে এ ধরনের বিশৃঙ্খল মিশ্র যানব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। একই রাস্তায় দ্রুতগতির, মধ্যম গতির ও ধীরগতির যানবাহনের পাশাপাশি পথচারীর চলাচল শৃঙ্খলা নষ্ট করে। এতে দুর্ঘটনা ও যানজট—উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
১৪। ঘন ঘন ইউ-টার্ন:
অনেক স্থানে সিগন্যাল বা নির্ধারিত মোড় ব্যবহার না করে ঘন ঘন ইউ-টার্ন নেওয়া হয়। এতে দ্রুতগতির লেন বাধাগ্রস্ত হয়, পেছনের গাড়িগুলো থেমে যায়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
১৫। উল্টো পথে গাড়ি চলাচল:
উল্টো পথে গাড়ি চালানো এখন অনেক ক্ষেত্রে যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে, মূল রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যায় এবং অনেক সময় পুরো সড়ক অচল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মহাসড়কে উল্টো পথে যান চলাচল এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। তবুও এ অনিয়ম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সার্বিক পর্যালোচনা
মহাসড়ক ও ঢাকা শহরের যানজটের সম্পর্ক
ঢাকা শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য কার্যত একই প্রধান সড়ক ব্যবহার করতে হয়। রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রধান মহাসড়কগুলো—যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক—অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়ে। বিভিন্ন টোল প্লাজা bottleneck সৃষ্টি করে। একই সড়কে লোকাল ও দূরপাল্লার যান চলাচলের কারণে মহাসড়কের যানজট শহরের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে বহু “congestion-prone point” রয়েছে, যেখানে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হয়। শহরের ভেতর দিয়ে আন্তঃজেলা ট্রাফিক চলাচল, ট্রাকের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ এবং কার্যকর বাইপাস সড়কের অভাব এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
ম্যানুয়াল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
ঢাকায় প্রায় ৬৫০টি প্রধান চৌরাস্তা রয়েছে, যেখানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এখনো অনেকাংশে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ফলে ট্রাফিক পুলিশকে দড়ি, শঙ্কু ও বাঁশের বেড়া ব্যবহার করে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়, যা একটি আধুনিক রাজধানীর সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা না থাকায় চালকেরা প্রায়ই সিগন্যাল মানে না। ফলে মোড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানবাহনের সারি এবং মানবিক ইচ্ছানির্ভর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কারণে যানজট আরও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের জন্য বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার মামলা ও জরিমানা আরোপ করেও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা
একটি আধুনিক শহরে মোট আয়তনের ২০–২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন। সেখানে ঢাকায় রাস্তার পরিমাণ মাত্র ৭–৮ শতাংশ। এর মধ্যে অনেক রাস্তা সরু, অপরিকল্পিত এবং খানাখন্দে ভরা। নিয়মিত খোঁড়াখুঁড়ি, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং রাস্তা দখলের কারণে কার্যকর সড়কের পরিমাণ আরও কমে যায়। ফলে বিদ্যমান সড়কের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে মোট রাস্তা প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রধান সড়ক মাত্র ২১০ কিলোমিটার। অথচ প্রয়োজন অন্তত ৬,০০০ কিলোমিটার সড়ক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ঢাকায় মাত্র ৫–৬ শতাংশ যাত্রী ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলেও তারা প্রায় ৭০ শতাংশ সড়ক দখল করে রাখে। অন্যদিকে অপ্রতুল সড়কের মধ্যে গণপরিবহনের দখলে থাকে মাত্র ৬–৮ শতাংশ জায়গা। এটি একটি চরম অসম ও অদক্ষ পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিফলন।
নগর পরিবহন পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি আধুনিক রাজধানী শহরে মোট পরিবহনের মধ্যে গণপরিবহনের (বাস, মেট্রোরেল, রেল ও বিআরটি) অংশ হওয়া উচিত ৫০–৭০ শতাংশ। কারণ একটি বাস ৪০–৮০ জন যাত্রী বহন করতে পারে এবং একটি মেট্রোরেল হাজার হাজার যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম। বিপরীতে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে সাধারণত ১–৩ জন যাত্রী চলাচল করে। অর্থাৎ গণপরিবহন কম জায়গা ব্যবহার করে বেশি মানুষ পরিবহন করতে পারে।
BRTA ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকায় মোট নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে বাসের অংশ মাত্র ১.৫–৩ শতাংশ। অথচ যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে গণপরিবহন ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৪০–৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ গণপরিবহনের সংখ্যা কম হলেও এর ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি।
যানবাহনের সংখ্যা ও গুণগত অবস্থা
যানবাহনের সংখ্যা ও গুণগত অবস্থাও ট্রাফিক সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। BRTA বাংলাদেশে প্রায় ২৪ ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন দেয়। ২০২৫ সালের BRTA তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৫.৪ লাখ, যার মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ২৩.২ লাখ—অর্থাৎ দেশের মোট যানবাহনের ৩৫.৫ শতাংশ।
ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালের BRTA তথ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল ৩,৪৪,৬৭৯টি, যেখানে ২০১০ সালে ছিল ১,৬০,১৭০টি। অর্থাৎ ১৪ বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একটি শহর যত বেশি ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর হয়, তত বেশি যানজট, দূষণ, জ্বালানি খরচ, রাস্তার চাপ এবং সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধিত যানবাহন হলো মোটরসাইকেল। শুধু ঢাকা শহরেই ২০১৫–২০২৪ সময়ে ৮.৫ লাখের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে, যা ঢাকার মোট যানবাহনের প্রায় ৩৬.৫ শতাংশ। রাইড শেয়ারিং, গণপরিবহনের সংকট, সময় ও খরচ সাশ্রয় এবং দ্রুত চলাচলের সুবিধার কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ফলে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত মোটরসাইকেলনির্ভর মেগাসিটিতে পরিণত হচ্ছে।
ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহন
বিপুল সংখ্যক ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহন সড়কে চলাচল করছে। এসব যানবাহন শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট করে এবং যানজট সৃষ্টি করে।
যানবাহনের বৈচিত্র্য—রিকশা, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা—একই সড়কে একসঙ্গে চলাচল করার ফলে একটি “heterogeneous traffic system” তৈরি হয়েছে, যা গতি কমিয়ে দেয় এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
শুধু ঢাকায় নয়, দেশের কোথাও কার্যকর পার্কিং নীতিমালা নেই। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ নগরীর অন্তত ৫০টি স্থানে রাস্তায় পার্কিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়িত হয়নি।
(ধারাবাহিক চলবে)
লেখক: আরবান ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, রেজিস্ট্রার ও খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি, BAIUST।
এইচআর/জেআইএম