জঙ্গল সলিমপুর: আতঙ্কের জনপদ থেকে মানবিক পুনর্জাগরণ
একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা কেবল তার সুউচ্চ অট্টালিকা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং বিচার করা যায় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল, অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিংবা পথ হারানো মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার ভিত্তিতে। যে রাষ্ট্র শুধুমাত্র শাস্তি দিতে জানে, কিন্তু সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করতে জানে না—সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে, ন্যায়বিচারের নয়। আর যে রাষ্ট্র অপরাধের অন্ধকার গলির ভেতর থেকেও পুনর্জন্মের সম্ভাবনা খুঁজে বের করতে পারে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানবিকতার প্রকৃত শক্তি।
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে নতুন আধুনিক কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা ঠিক এমনই এক প্রতীকী বাস্তবতা সামনে এনেছে। যে অঞ্চল একসময় “রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র” হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দাপটে দেড় লাখের বেশি মানুষ কার্যত জিম্মি হয়ে জীবন কাটিয়েছেন, সেই এলাকাতেই এখন গড়ে উঠতে যাচ্ছে দেশের অত্যাধুনিক একটি কারাগার। এটি নিছক কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অপরাধ সংশোধনের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
জঙ্গল সলিমপুর—চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী এবং নগরীর বায়েজিদ, পাহাড়তলী ও খুলশী এলাকার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল—দীর্ঘদিন ধরে ছিল সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ আধিপত্যের অভয়ারণ্য। বহু বছর ধরে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার বাধার মুখে পড়তে হয়েছে প্রশাসনকে। এমনকি কয়েক মাস আগেও সেখানে এক র্যাব সদস্যকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এই নির্মম বাস্তবতা প্রমাণ করেছিল, রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু অঞ্চল কার্যত অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে, যদি দীর্ঘদিন অবহেলা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো সেখানে প্রভাব বিস্তার করে।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো—অন্ধকার কখনো স্থায়ী নয়। আজ সেই জঙ্গল সলিমপুরই নতুন পরিচয়ের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এলাকাটিকে একটি আধুনিক সংশোধনাগার নির্মাণের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ৭০ একর জমির ওপর নির্মিতব্য এই কারাগারে প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে বিচারাধীন প্রায় দুই হাজার আসামিকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে বাস্তব কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার বর্তমানে ভয়াবহ বন্দি সংকটে জর্জরিত। প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো এই কারাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ২৪৯ জন হলেও বর্তমানে সেখানে বন্দি রয়েছেন ৬ হাজার ৩৩৮ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ বন্দি সেখানে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। এটি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে না; বরং বন্দিদের স্বাস্থ্য, মানসিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই বুঝেছে—কারাগার কেবল শাস্তি প্রদানের জায়গা নয়; এটি সামাজিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস কিংবা জার্মানির মতো দেশগুলোতে আধুনিক কারাগারকে “করেকশনাল সেন্টার” বা সংশোধনাগার বলা হয়। সেখানে বন্দিদের শিক্ষা, মানসিক চিকিৎসা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুনরায় সমাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। কারণ গবেষণা বলছে, অমানবিক কারাগার অপরাধ কমায় না; বরং অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারগুলোকে কেবল বন্দি আটকে রাখার স্থান হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে বন্দিদের মধ্যে অপরাধী নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে, মাদক বিস্তার ঘটেছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে ছোট অপরাধে আটক ব্যক্তি বড় অপরাধীর সংস্পর্শে এসে আরও ভয়ংকর অপরাধী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এই বাস্তবতায় জঙ্গল সলিমপুরে পরিকল্পিত নতুন কারাগারের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে শুধুমাত্র নিরাপত্তা নয়, পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়ার বক্তব্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেছেন, আধুনিক কারাগারের ধারণা অনুযায়ী বন্দিদের জন্য সীমিত শিক্ষার পরিবেশ, খেলাধুলা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ রাখা হবে, যাতে তারা সংশোধিত হয়ে পুনরায় অপরাধে না জড়ান। এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সমাজে ফিরে এসে যদি একজন সাবেক বন্দি সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ না পান, তবে তিনি আবার অপরাধচক্রে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারেন।
একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে অপরাধকে দমন করার পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক কারণগুলো মোকাবিলা করা যায়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদক, শিক্ষা সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি—এসবই অনেক সময় অপরাধের জন্ম দেয়। তাই শুধুমাত্র কঠোর আইন বা বন্দিশালা দিয়ে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সংশোধন, পুনর্বাসন এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
তবে এই প্রকল্প ঘিরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে। প্রথমত, জঙ্গল সলিমপুরের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পাহাড়ি এলাকায় বড় অবকাঠামো নির্মাণ পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে? চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো ইতোমধ্যেই অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই নতুন কারাগার নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। উন্নয়নের নামে যেন প্রকৃতিকে ধ্বংস করা না হয়।
এই জায়গায় মানবাধিকারকর্মী ও পরিবেশ সচেতন মহলের উদ্বেগ অমূলক নয়। তবে চট্টগ্রামের হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান যেভাবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণের কথা বলেছেন, তা আশাব্যঞ্জক।
প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে যদি একটি মানবিক ও আধুনিক সংশোধনাগার গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক কারাগার মানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; বরং আধুনিক চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করা। যদি পুরোনো মানসিকতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, বন্দি নির্যাতন কিংবা অব্যবস্থাপনা একইভাবে থেকে যায়, তাহলে কংক্রিটের নতুন স্থাপনা কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। তাই কারা প্রশাসনের প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাও এখানে বড় একটি বাস্তবতা। চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের বিচারাধীন হাজার হাজার আসামি বছরের পর বছর হাজতি হিসেবে কারাগারে থাকেন। অনেক সময় বিচার শেষ হওয়ার আগেই একজন মানুষের জীবনের মূল্যবান সময় হারিয়ে যায়। তাই নতুন কারাগার নির্মাণের পাশাপাশি দ্রুত বিচার, আইনি সহায়তা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জঙ্গল সলিমপুরের এই রূপান্তর আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। যে এলাকা একসময় ছিল ভয়, সন্ত্রাস এবং অরাজকতার প্রতিচ্ছবি, সেই এলাকাকে যদি সংশোধন, মানবিকতা এবং আইনের শাসনের প্রতীকে রূপান্তর করা যায়—তাহলে সেটি হবে রাষ্ট্রের নৈতিক বিজয়। এটি প্রমাণ করবে, রাষ্ট্র চাইলে হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডও পুনরুদ্ধার করতে পারে; শুধু শক্তি দিয়ে নয়, পরিকল্পনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেও।
আজকের পৃথিবীতে উন্নত রাষ্ট্রগুলো কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেয় না; তারা তাকে সমাজের জন্য নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায়। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি মানবিক, আধুনিক এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে কারাগার ব্যবস্থার সংস্কার অনিবার্য।
পরিশেষে বলা যায়,জঙ্গল সলিমপুরের এই প্রকল্প সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সে সমাজ অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলো খুঁজে নিতে জানে। আর জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি জনপদ আজ যেন সেই আলোর দিকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এভাবেই জঙ্গল সলিমপুর আতঙ্কের জনপদ থেকে মানবিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
এইচআর/এএসএম