ডিজিটাল ভূমিসেবা: জমি নিয়ে মামলা নয়, চাই স্বচ্ছতা

ড. হারুন রশীদ
ড. হারুন রশীদ ড. হারুন রশীদ , ডেপুটি এডিটর (জাগো নিউজ)
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ২০ মে ২০২৬

গাজীপুরের এক বৃদ্ধ কৃষক কয়েক বছর ধরে একটি নামজারি সনদের জন্য ভূমি অফিসে ঘুরছেন। জমিটি তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। ছেলেরা বিদেশে, মেয়েরা বিবাহিত। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি প্রতিবারই নতুন কোনো কাগজের তালিকা হাতে পান। কখনো বলা হয় খতিয়ানের কপি ঠিক নেই, কখনো দাগ নম্বরে অসঙ্গতি। এসব নিয়ে তার আক্ষেপ, ‘জমি আমার, কিন্তু প্রমাণ করতে গিয়েই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সংকট, ভোগান্তি ও নাগরিক অসহায়ত্বের ইতিহাস যেন ধরা পড়ে।

বাংলাদেশে জমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, ভবিষ্যৎ এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি পরিবারে জমি নিয়ে বিরোধ মানেই শুধু আইনি জটিলতা নয়, অনেক সময় সম্পর্কের অবনতি, সহিংসতা, এমনকি খুনোখুনিও। তাই ভূমি প্রশাসনের আধুনিকায়ন কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নাগরিক আস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই বাস্তবতার মধ্যেই গতকাল ১৯ মে তিন দিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলা ২০২৬ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জমি বা ভূমি শুধু এক টুকরো সম্পদই নয়, বরং মানুষের জীবনে এটি একধরনের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি।’ এই উপলব্ধি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র যখন ভূমিকে কেবল রাজস্ব আদায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে, তখনই প্রকৃত সংস্কারের পথ তৈরি হয়।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘আগে এসব বিষয়ে মানুষকে ভূমি অফিসে যেতে হতো। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে অধিকাংশ ভূমিসেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।’ সত্যিই, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অনলাইনে খাজনা পরিশোধ, ই-নামজারি, খতিয়ান সংগ্রহ, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং ‘ভূমি’ মোবাইল অ্যাপ চালুর ফলে নাগরিক সেবার পরিধি বেড়েছে। দেশের ৬১ জেলায় ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালুর ঘোষণাও ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কি সত্যিই মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পেরেছে? নাকি পুরোনো সমস্যাগুলোই নতুন ডিজিটাল কাঠামোর ভেতরে রয়ে গেছে?

বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত সমস্যার শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি ভূমি জরিপ, পরবর্তী পাকিস্তান আমলের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের চাপ—সব মিলিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা এক জটিল কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। একই জমির একাধিক খতিয়ান, ভুল জরিপ, অসম্পূর্ণ রেকর্ড, জাল দলিল, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি আজও বড় সমস্যা।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিচারাধীন মামলার বড় একটি অংশই জমিজমা সংক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘আদালতে বিচারাধীন ৪৭ লাখের বেশি মামলার মধ্যে অধিকাংশই জমিজমা সংক্রান্ত।’ এই পরিসংখ্যান কেবল বিচারব্যবস্থার চাপই নির্দেশ করে না; এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। কারণ একটি কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকলে এত বিপুলসংখ্যক মামলা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।

ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দালালচক্রও একটি বড় সমস্যা। সাধারণ মানুষ আইনের জটিল ভাষা বোঝেন না। খতিয়ান, পর্চা, সি-এস, এস-এ, আর-এস, বিএস—এসব শব্দ অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য। এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে একজন কৃষক বা সাধারণ নাগরিককে প্রকৃত সরকারি ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ডিজিটাল সেবা চালু হলেও অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র এখন অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

‘আদালতে বিচারাধীন ৪৭ লাখের বেশি মামলার মধ্যে অধিকাংশই জমিজমা সংক্রান্ত।’ এই পরিসংখ্যান কেবল বিচারব্যবস্থার চাপই নির্দেশ করে না; এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। কারণ একটি কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকলে এত বিপুলসংখ্যক মামলা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অসামঞ্জস্য। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস এবং জরিপ বিভাগের তথ্য অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডে যে জমির মালিক একজন, অন্য প্রতিষ্ঠানের নথিতে সেখানে অন্যের নাম দেখা যায়। এই বিচ্ছিন্নতা দুর্নীতি ও জালিয়াতির সুযোগ বাড়ায়।

তবে সমস্যার গভীরতা যতই হোক, সমাধানের পথও আছে। পৃথিবীর অনেক দেশ প্রযুক্তিনির্ভর ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এস্তোনিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো ভূমি রেকর্ডকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সমন্বিত ডেটাবেজে নিয়ে এসেছে। ফলে জমি কেনাবেচা, কর প্রদান কিংবা মালিকানা যাচাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্ভব হচ্ছে। দুর্নীতিও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত ভূমি তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে যে তথ্য বিচ্ছিন্নতা রয়েছে, তা দূর করতে হবে। ভূমি মন্ত্রণালয়, রেজিস্ট্রেশন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যকে একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। নাগরিক যেন একটি ইউনিক আইডির মাধ্যমে জমির সব তথ্য দেখতে পারেন, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল ভূমিসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা। অনলাইন সেবার প্রতিটি ধাপ ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। আবেদন কোথায় আটকে আছে, কোন কর্মকর্তা কত সময় নিচ্ছেন—এসব তথ্য নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকলে হয়রানি কমবে। একইসঙ্গে কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ‘সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয়, বরং জনগণের অধিকার।’ এই দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়া উচিত ভূমি প্রশাসনের মূলনীতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এখনো নাগরিককে অনেক সময় ‘সেবাগ্রহীতা’ নয়, বরং ‘অনুগ্রহপ্রার্থী’ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তি একা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

ডিজিটাল বিভাজনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শহরের শিক্ষিত মানুষ অনলাইন সেবা তুলনামূলক সহজে ব্যবহার করতে পারলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এখনো প্রযুক্তিতে দক্ষ নয়। ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, স্মার্টফোনের অভাব কিংবা ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। তবে এই কেন্দ্রগুলো যেন নতুন কোনো দালাল ব্যবস্থায় পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিকল্প পদ্ধতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী আলবার্ট আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘শক্তি প্রয়োগ করে শান্তি বজায় রাখা যায় না; কেবল পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’ জমিজমা নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ অনেক সময় আদালতের বাইরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। গ্রাম আদালত, মেডিয়েশন, আরবিট্রেশন ও কনসিলিয়েশন কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে আদালতের ওপর চাপ কমবে।

একইসঙ্গে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদ কার্যক্রমকে আরও নির্ভুল করতে হবে। আধুনিক জিআইএস প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ম্যাপিং এবং ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল সিস্টেম ব্যবহার করে একটি নির্ভুল ভূমি মানচিত্র তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। এতে ভূমি দখল, সীমানা বিরোধ এবং জালিয়াতি অনেকাংশে কমবে।

ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্কও অস্বীকার করার উপায় নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় ভূমি খাতকে দুর্নীতিপ্রবণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাও অপরিহার্য।

সবচেয়ে বড় কথা, ভূমি সংস্কারকে কেবল প্রযুক্তিগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি মানবিক ও সামাজিক সংস্কার। কারণ জমি নিয়ে মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও অস্তিত্ব জড়িয়ে থাকে। একজন কৃষকের কাছে তাঁর জমি মানে শুধু ফসল ফলানোর ক্ষেত নয়; সেটি তাঁর পরিচয়, ইতিহাস এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন।

বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল রূপান্তরের এক নতুন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। এই যাত্রায় ভূমি খাতের আধুনিকায়ন সফল হলে শুধু হয়রানি কমবে না; বিনিয়োগ বাড়বে, অর্থনীতি গতিশীল হবে, সামাজিক বিরোধ কমবে এবং নাগরিক আস্থা শক্তিশালী হবে। কিন্তু যদি ডিজিটাল ব্যবস্থাও পুরোনো দুর্নীতি, জটিলতা ও অদক্ষতার শিকার হয়, তবে প্রযুক্তি কেবল নতুন মোড়কে পুরোনো সংকটই বহন করবে।

সুতরাং প্রয়োজন একটি সমন্বিত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক ভূমি প্রশাসন। এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষকে নিজের জমির অধিকার প্রমাণ করতে বছরের পর বছর অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। যেখানে জমির কাগজ নয়, নাগরিকের মর্যাদাই হবে রাষ্ট্রের প্রধান বিবেচনা। তখনই হয়তো সেই বৃদ্ধ কৃষক একদিন বলতে পারবেন—‘জমি আমার, আর রাষ্ট্রও সত্যিই আমার পাশে আছে।’

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।