সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বড় বাধা উচ্চ শুল্কহার
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও উচ্চ শুল্ক ও করহার সৌরবিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, ডিসি ক্যাবলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে বর্তমানে ২৫ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত মোট কর বা টোটাল ট্যাক্স ইনসিডেন্স (টিটিআই) আরোপ রয়েছে।
এতে নবায়নযোগ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এসব পণ্যে কর অব্যাহতি বা শুল্কহার কমানো জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তবে উচ্চ কর ও শুল্কের কারণে এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিসি ক্যাবল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি সেল ও অ্যালুমিনিয়াম মাউন্টিং স্ট্রাকচারের মতো পণ্যে ৫৮ দশমিক ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কর রয়েছে।

এছাড়া হাইব্রিড কন্ট্রোলারের ওপর করের হার ৮৯ দশমিক ৮ শতাংশ হওয়ায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ আরও বাড়ছে। এতে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে শুল্কহার কমানোর দাবি এখন যৌক্তিক বলেও মনে করেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের ট্যারিফ অনুযায়ী, আমদানির ক্ষেত্রে সোলার পিভি মডিউলে ২৬ দশমিক ৯০ শতাংশ, ফটোভোলটাইক সেলে ২৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ, সোলার ইনভার্টারে ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ডিসি ক্যাবলে ৫৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, মনিটরিং ইউনিটে (ডাটা লগার) ৩৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, অ্যালুমিনিয়াম মাউন্টিং স্ট্রাকচারে ৫৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, ব্যাটারি প্যাকে (রেডিমেড) ৫৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, ব্যাটারি সেলে ৫৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, সার্কিট বোর্ডে (বিএমএস) ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ, অন্যান্য প্যাক ম্যাটেরিয়ালসে ৩৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, পিভি ডিজি কন্ট্রোলারে (হাইব্রিড কন্ট্রোলার) ৮৯ দশমিক ০৮ শতাংশ, সোলার প্ল্যান্ট সেফটি অ্যালুমিনিয়াম ওয়াকওয়ে মেশ আমদানির ক্ষেত্রে ৩৭ দশমিক ২৫ শতাংশ কর দিতে হয়।
আরও পড়ুন
কৃষি সেচ শতভাগ সোলারের আওতায় আনা হচ্ছে: কৃষিমন্ত্রী
জুনের মধ্যে সোলার নীতি, কমবে কর: বিদ্যুৎমন্ত্রী
১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জনে সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ চান বিশেষজ্ঞরা
‘এত লোডশেডিং শেষ কবে হয়েছে ভুলে গিয়েছি’
সৌরখাতের সম্প্রসারণে কাস্টমস ডিউটি যৌক্তিকীকরণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং কর অবকাশ প্রদানের প্রস্তাব নিয়ে গত ১২ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। চিঠিতে সোলার পণ্য আমদানিতে মোট করহার শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
এছাড়া বর্তমানে ওয়েট বেজড অ্যাসেসমেন্ট বা কেজিভিত্তিক শুল্কায়ন প্রত্যাহার করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রান্সজেকশন ভ্যালুভিত্তিক (প্রোফার্মা/কমার্শিয়াল ইনভয়েস) প্রকৃত লেনদেনমূল্য অনুযায়ী মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তারা। তাছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কর অবকাশের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

ইউটিলিটি স্কেল নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুরূপ সুবিধা নিশ্চিত করে, সৌরখাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বা প্রকল্প কোম্পানির জন্য প্রথম ১০ বছর ১০০ শতাংশ কর অবকাশ, পরবর্তী তিন বছর ৫০ শতাংশ কর অবকাশ এবং পরবর্তী দুই বছর ২৫ শতাংশ কর অবকাশের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি বলছে, এসব নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে স্বল্প সময়ে রুফটপ সৌর প্যানেল স্থাপনের সংখ্যা বাড়বে। জাতীয় গ্রিডের ওপর পিক-লোড চাপ কমবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে।
আরও পড়ুন
ব্যাটারি আমদানির বিধিনিষেধ ও কাস্টমস জটিলতা সমাধানের দাবি বিকেএমইএ’র
জ্বালানি সংকটের মধ্যে সোলার পণ্যের বিক্রি চাঙা
গরম পড়তেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আইপিএস
৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার
এছাড়া প্রস্তাবিত কর ও শুল্ক সুবিধাগুলো আংশিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিতে প্রদত্ত ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সমন্বয় করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি অধিক টেকসই জ্বালানি অর্থনীতি গঠনে সহায়ক হবে। শিল্পখাতে বিদ্যুৎ ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জাতীয়ভাবে নির্ধারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গতি সঞ্চার সম্ভব হবে।
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ একটি বাস্তবসম্মত, বাজারভিত্তিক এবং
বিনিয়োগবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।

বিএসআরইএর সেক্রেটারি এ এস এম মুনির বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার সম্প্রসারণের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কয়েকটি ফ্যাক্টর কাজ করছে। এর মধ্যে উচ্চ শুল্কহার অন্যতম। সারাদেশেই রুফটপ সোলার বা সৌর বিদ্যুৎ বসাতে কোনো ফাইন্যান্সিয়াল মেকানিজম নেই। কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক এক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায় না। টার্ম লোন দিলেও এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা সুইটেবল নয়। এটার জন্য স্পেশাল স্কিম লোন দরকার।
এ এস এম মুনির বলেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা হয়েছে। সরকারও নবায়নযোগ্য পণ্য আমদানিতে শূন্য ডিউটি করার কথা ভাবছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে অধিক শুল্ক আদায় একটি সমস্যা। এটি নিয়ে এখন সব মহলে আলোচনা হচ্ছে। মন্ত্রীদের কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে আসছে বাজেটে শুল্কহার বড় অঙ্কে কমিয়ে আনা হতে পারে। এটি করতেই হবে। শুল্ক না কমালে এটি উৎসাহ পাবে না। যেহেতু নতুন সরকার, আমার মনে হয় তারা এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
এনএস/এমএমএআর/এমএফএ/এমএফএ