বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ডা. পলাশ বসু
ডা. পলাশ বসু ডা. পলাশ বসু , চিকিৎসক ও শিক্ষক
প্রকাশিত: ০৩:৫৬ এএম, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭

আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা নিয়ে আমাদের গর্ব করার মতো ঐতিহাসিক অনেক বিষয় থাকলেও কেন যেন মনে হয় যথাযথ পরিকল্পনাহীনতার কারণে এর গৌরব আজ ম্লান হতে বসেছে। একটা বাসার ড্রয়িংরুম দেখেই একজন অতিথি যেমন সে বাসার গৃহকর্তার রুচিবোধ, তার আভিজাত্য, পরিমিতিবোধ সম্পর্কে সহজেই ধারণা পেতে পারে তেমনিভাবে একটা দেশের পুরোটা না ঘুরেও শুধুমাত্র সে দেশটির রাজধানীতে ঘোরাঘুরি করেই একজন ভ্রমণকারী সহজেই সে দেশ সম্বন্ধে কিছুটা হলেও ধারণা করতে পারে বলে আমার মনে হয়।

যদি তাই হয় তাহলে বলতেই হবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল না ঘুরেও শুধু আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা ঘুরেই একজন বিদেশি পরিব্রাজক পুরো দেশ সম্বন্ধেই একটা নেতিবাচক ধারণা পেয়ে যেতে পারেন। এর কারণ হচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে চলা ভয়াবহ রকমের বায়ুদূষণ। সেটাই দেম সম্বন্ধে এমন নেতিবাচক ধারনা তৈরি করে দিতে সক্ষম হবে। তার উপরে রয়েছে যানজট, বর্ষাকালে জলজট আর সবসময়ে চলমান শব্দদূষণ।

আমরা সকলেই জানি এবং মানি যে শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। একটা শিশুকে সুস্থ, সুন্দর এবং শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে দেশের যে উন্নতি হয় অন্য কোনভাবে তা কি এতটা সম্ভব? উত্তর হচ্ছে, না; সম্ভব নয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, আমাদের শিশুদের বিশেষ করে ঢাকা শহরে বসবাসরত শিশুদের জন্য আমরা একটা সুস্থ, সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারিনি। বরং বলা যায়, নানা ধরনের দখল আর দূষণের কবলে ফেলে আমরা এ শহরটাকে শিশুদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছি।

যদি প্রশ্ন করেন কিভাবে শিশুদের জন্য এ শহর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে? এর উত্তর হচ্ছে, প্রথমত বায়ুদূষণ । কারণ এ এমন এক ভয়াবহ উপাদান; যার পরিণতিতে আমরা সকলেই শারীরিক এবং মানসিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। তবে শিশুদের জন্য তা আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে।

এ বছরের শুরুতে ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিশ্বে যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে বায়ুদূষণ রয়েছে পঞ্চম স্থানে। ২০১৫ সালে প্রায় ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর কারণ এই বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। (সূত্রঃ প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)

এদিকে এ বছরের বিদায়ক্ষণ প্রায় সমাগত। সে সময়ে বায়ুদূষণ বিষয়ে এক ভয়াবহ তথ্য দিলো জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশু (যাদের বয়স এক বছরের নিচে ) এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা নির্ধারিত সীমার ছয় গুণ। তার মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখই বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়। ( সূত্রঃ সমকাল, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৭)। তাহলে বুঝুন সার্বিকভাবে আমরা কি রকম এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে বাস করছি!

আসলে ঢাকা শহরের বাতাস যে ধুলাবালি আর ধুয়ার মিশ্রণে শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে তা বুঝে নিতে কোন রকম প্রতিবেদনের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। ঢাকা এখনও বর্ধিষ্ণু এক শহর। ফলে নানা রকম উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সারা বছরব্যাপী চলতেই থাকে। ইট, খোয়া, সুড়কি, বালি এবং সিমেন্টের কাজ যেন শেষ হতেই চায় না। আর এটাকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরের আশেপাশে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। সেই সাথে নানা ধরনের কয়লাভিত্তিক কলকারখানা। এখান থেকে নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া।

সেই সাথে চলে রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি। কাজ শেষে তা ফেলে রাখা হয়। আবার অনেক সময় তা ঠিকমতো মেরামতও করা হয় না। এর ফলে দেখা যায় যে, এসব এলাকা ধুলার স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। যেমন বর্তমানে মেট্রোরেলের কাজের কারণে মিরপুরে ধুলার প্রকোপ বেড়েছে। অথচ নিয়ম কানুন মেনে কাজ করলে কিন্তু এমন হওয়ার কথা না।

দেখা যায়, শীতকালে রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ নানাবিধ কাজের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে জনসন্তোষ সৃষ্টি না করে তা অনেক সময় জনভোগান্তির সৃষ্টি করে। ফলে একটা রাস্তা খুঁড়ে আর একটা যে ভালো কাজ করা হলো সেটার সুফল জনগণ আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। দেখা যায় কাটা রাস্তার কাজ শেষে শুধু বালু ভর্তি করে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। এ রাস্তাগুলোতে গাড়িঘোড়া চলাচলের ফলে প্রচুর ধুলার সৃষ্টি হয় যা বাতাসকে দূষিত করে তোলে। এতে জনভোগান্তি চরমে ওঠে।

ধোঁয়া আর ধুলাবালির সংমিশ্রণে ঢাকার বাতাস এভাবেই ক্রমাগত দূষিত হয়ে চলেছে। এর ফলে বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ছে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন ঢাকায় থাকলে যে সব মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগেন, নিত্য হাঁচিকাশি দিতে থাকেন তারা কিছুদিনের জন্য গ্রামে গেলে এমন সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকেন। তার উপর দেখবেন অল্পবয়সে এখন হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের পরিমাণ ভয়াবহ রকমের বাড়ছে। এর পেছনে নাকি বায়ুদূষণের দায় রয়েছে বিস্তর। কি ভয়াবহ অবস্থা, তাই না? বুঝুন তাহলে বায়ুদূষণ কিভাবে আমাদের জন্য ভয়ংকর এক হুমকি হয়ে উঠছে!

বায়ুদূষণের ফলে শিশুদের ফুসফুসের রোগই সৃষ্টি হয়- বিষয়টা শুধু এমনই নয়। এর চেয়ে সাংঘাতিক ব্যাপার হচ্ছে যে, বায়ুদূষণ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে তোলে। মস্তিষ্কের বহিরাবরণকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে থাকে। নার্ভগুলোকে ধীরে ধীরে অকেজো করে ফেলতে পারে। এমন শিশু কিন্তু জাতির জন্য বোঝাস্বরূপ। অথচ শিশুটার এমন অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী কিন্তু আমরা সকলেই।

দায় থাকলে তাই দায়িত্বও নিতে হবে। শিশুদের বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য করণীয় সবকিছুই করতে হবে দ্রুততার সাথে। বায়ুদূষণের মতো এমন ভয়ংকর অবস্থা থেকে শিশুদেরকে বাঁচাতে তাই একদমই সময় নষ্ট করা চলবে না। কারণ সেটা করা না গেলে এবং এমনভাবে বায়ুদূষণ চলতে থাকলে পুরো জনস্বাস্থ্য বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারীরিক এবং মানসিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুক্ষীণ হবে। তেমনটা হোক- নিশ্চয় আমরা কেউই সেটা চাই না। বায়ুদূষণ রোধে জনসচেতনতার পাশাপশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার তাই বিকল্প নেই।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক।

এইচআর/পিআর

দেখা যায় কাটা রাস্তার কাজ শেষে শুধু বালু ভর্তি করে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। এ রাস্তাগুলোতে গাড়িঘোড়া চলাচলের ফলে প্রচুর ধুলার সৃষ্টি হয় যা বাতাসকে দূষিত করে তোলে। এতে জনভোগান্তি চরমে ওঠে

আপনার মতামত লিখুন :