বলবান নয়, চাই বিবেকবান সাংসদ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১০:১৯ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮

একটি রাষ্ট্রের সামর্থ্য শুধু তার নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং পদ্ধতির উপর নির্ভর করে না। নীতি যারা প্রণয়ন বা রূপায়ণ করেন, প্রতিষ্ঠান যারা পরিচালনা করেন এবং পদ্ধতি যারা অনুসরণ করেন, তাদের আচরণের উপরেও নির্ভর করে।

জনগণ তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে যাদের পাঠায় তাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত- সেই প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব নেই। ফেরেশতার মতো হবেন এমনটাও নিশ্চয়ই ভাবনা নয়। তবে প্রত্যাশা থাকে ভালো কিছুর, কারণ তারাতো কেবল আইন প্রণেতা নন, নিজ নিজ এলাকার অভিভাবকও তারা। এদের আচরণে সমস্যা থাকতে পারে বলেই উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ যেমন ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্স, ভারতীয় লোকসভা ও রাজ্যসভা, কানাডিয়ান পার্লামেন্ট এবং সাউথ আফ্রিকান পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি আছে।

সংসদের ভেতরে এই মাননীয়রা সদস্য হিসেবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কেমন হবে তা কার্যপ্রণালি বিধিতে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। কিন্তু সংসদের বাইরে মাননীয়দের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে বিধিবদ্ধ কোনো আইন নেই। জনগণ তাদের প্রতিনিধির কাছে দেশের উন্নয়ন ও ভালো আচরণ প্রত্যাশা করে। সারাদেশেই কোন কোন সংসদ সদস্যের আচরণ ও ক্রিয়াকলাপের পর্যালোচনায় একটি ধারণা ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে যে, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা দূরস্থান, সেসবের মর্যাদা ও কার্যকারিতা সম্পর্কেও এসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনেকেরই সম্যক কোনও ধারণা নেই।

কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে সংসদকে মল্লভূমিতে রূপান্তরিত করতে না পেরে সরকার দলীয় সংসদস্যের অনেকেই স্ব স্ব এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নিজের দলের সভা-সমাবেশ কিংবা সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি আস্ফালন ও হুমকি প্রদর্শন করার অধিকারকেই গণতন্ত্র বলে মনে করছেন।

জনগণ তাদের দ্বারা নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মুখে কুরুচিপূর্ণ, অশালীন, আক্রমণাত্মক শব্দ শুনতে চান না। কিন্তু মাননীয়দের অনেকেই এমন অশ্রাব্য শব্দ হরহামেশা ব্যবহার করেন। সংসদ সদস্য শিক্ষককে (তার নিজেরও শিক্ষক) গলা ধাক্কা দিতে পারেন, শিক্ষককে কান ধরে উঠ-বস করাতে পারেন, সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে দিনরাত অপমান করতে পারেন।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ড ইন পাবলিক লাইফ’-এ সাতটি মানদণ্ড চিহ্নিত হয়েছে সংসদ সদস্যদের জন্য। এগুলো হলো: নিঃস্বার্থতা, সত্যনিষ্ঠতা বা সাধুতা, বস্তুনিষ্ঠতা, দায়বদ্ধতা, উন্মুক্ততা বা মুক্তমনা ও নেতৃত্ব। এ ছাড়া ভারতীয় লোকসভার সদস্যদের জন্য প্রণীত আচরণবিধিতে আরও দুটি মানদণ্ড যুক্ত করা হয় : জনস্বার্থ ও দায়িত্ব। এখন বাংলাদেশেও সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি সংক্রান্ত ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ তৈরি করা দরকার।

২০১০ সালে নবম সংসদে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন, ২০১০’ শিরোনামে একটি বিল এনেছিলেন সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী। সংসদের ‘বেসরকারি সদস্যদের বিল এবং বেসরকারি সদস্য বিল প্রস্তাব কমিটি’ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পর ২০১১ সালে সংশোধিত আকারে বিলটি সংসদে পাসের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিলটি সংসদে গৃহীত হয়নি।

আমাদের সাংসদরা সংসদে আইন নিয়ে, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেন যতটা, তার চেয়ে মেঠো বক্তৃতা দেন বেশি। সংসদে উত্তেজনা, ফাইল ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি কমেছে। তবে আদবকায়দা বেড়েছে তা বলা যাবে না পুরোপুরি। আসলে তেমন প্রাঞ্জল সংসদই নেই এখন। সংসদ সদস্যরা যার যার এলাকায় একক ক্ষমতাশালী।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ মানুষতো বটেই, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকারের নানা স্তরে, যেমন উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়নের যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছেন তারাও এমপি সাহেবর করুণায় বাঁচেন। এবং এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি আইনটি জরুরি হয়ে পড়েছে মনে করা হচ্ছে। কিছু কিছু সংসদ সদস্য এমন কিছু আচরণ করছেন বা এমন ভাষা ব্যবহার করছেন যা আইন প্রণেতার নয়। কখনও কখনও তাদের আচরণ দেখে মনে হয় না তারা কোনো শিষ্টাচারেরই ধার ধারেন।

সাংসদদের সবাই নয়, কিন্তু অনেকেই যা করেন তাতে জাতীয় সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। ক্ষুণ্ন হয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি। আইনপ্রণেতা হিসেবে দেশ ও জাতি সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করে, যা উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক। বস্তুত তারা জনগণের প্রেরণার উৎসও বটে। সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ যেহেতু স্বপ্রণোদিত হয়ে উন্নত সংস্কৃতির পরিচয় দিচ্ছেন না, সেহেতু তাদের নিয়ন্ত্রণ করার স্বার্থেই এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন থাকা প্রয়োজন।

সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি সংক্রান্ত আইনে অনেক কিছুই সন্নিবেশিত হতে পারে। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদবির বা সুপারিশ, নিজ বা পরিবারের সদস্যদের আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা অথবা কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রভাব খাটানো ইত্যাদি থেকে তারা যাতে মুক্ত থাকতে পারেন, আইনে সেসবের রক্ষাকবচও থাকা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচকমণ্ডলী তথা জনগণের সঙ্গে তাদের আচরণ এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা হবে বন্ধুসুলভ। তারা মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ায় উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছেতাই আচরণ করবেন এমনটা কেউ আশা করে না।

ঝুলে থাকা সংসদ সদস্য আচরণবিধিটি যথানিয়মে অচিরেই সংসদে গৃহীত হবে এটা প্রত্যাশা। গণতন্ত্র দেশের যে নেতৃত্বের কাছে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আশা করে, তারা কি বুঝতে পারছেন যে একটা অসুখ কিন্তু গভীরে প্রবেশ করেছে। সব দল, সব রকমের দল- সকলে যদি তাদের জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কে সাবধান না হন, যাদের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব উঠে আসবে, তবে গণতন্ত্রের সমূহ বিপদ। রাজনীতিতে বলবান মানুষের ভূমিকা আছে, ধনবানের প্রয়োজন আরও বেশি। কিন্তু দেশ পরিচালনা করতে লাগে বিবেকবান মানুষ। সাংসদরা তা হবেন কি?

গণতন্ত্রকে সমাজের গভীরে নিয়ে যেতে কেবল জনসাধারণের সর্ব স্তরের প্রতিনিধিত্ব আইনসভায় থাকাই যথেষ্ট নয়। সমাজের গভীরে রাজনীতির প্রসারের ফলে সংসদে স্থান করে নেওয়া জনপ্রতিনিধিদের এই পদের অপব্যবহারের ঘটনা বেশি ঘটছে। এরাই সংসদের কার্যকারিতা ক্রমশ নষ্ট করে দিচ্ছে। দল যদি এদের বারবার আসকারা দেয় তবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ শুধু নয়, দলের আগামীও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি।

এইচআর/এমএস

`সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি সংক্রান্ত আইনে অনেক কিছুই সন্নিবেশিত হতে পারে। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদবির বা সুপারিশ, নিজ বা পরিবারের সদস্যদের আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা অথবা কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রভাব খাটানো ইত্যাদি থেকে তারা যাতে মুক্ত থাকতে পারেন, আইনে সেসবের রক্ষাকবচও থাকা দরকার।‘

আপনার মতামত লিখুন :