জাতিকে কী বার্তা দিলেন সিইসি

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , স্পোর্টস এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ১০ মার্চ ২০১৯

 

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে থেকে যে যা বলেন তার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য ভিন্ন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শুধু সাংবিধানিক পদ নয়। দেশের স্বাস্থ্যকর গণতান্ত্রিক চেহারা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি-ই বড় চিকিৎসক। তিনি যা বলবেন, তাতে আস্থা রাখা উচিৎ এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো থেকে সাধারণ জনগণ সবার। এই পদে কেউ চিরদিন থাকেন না। কিন্তু চলে যাওয়া লোকটার কথাগুলো থেকে যায়। যা তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারের কাছে গুরুত্ব পায়।

ব্যক্তি অর্ন্তনিহিত হলেও তাঁর কথাগুলো ভেসে বেড়ায়। বাংলাদেশের সব প্রধান নির্বাচন কমিশনার-ই কিছু কথা উচ্চারণ করে যান। যেগুলো মানুষের মনে গেঁথে থাকে। উপজেলা নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা যা বললেন, সেটা নিছক কথার কথা ভাবা যাচ্ছে না। তিনি বলেছেন; ‘ইভিএমে ভোট হলে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার সুযোগ থাকবে না।’

এটা কী তাঁর কথার কথা! নাকি এটা তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ উচ্চারণ! সেটা পরিষ্কার করা উচিত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলো যে অভিযোগ করেছে, পরোক্ষভাবে তাঁদের কথার-ই প্রতিধ্বনি কী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কথায়? ইভিএম ব্যবহার করা হলে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার সুযোগ থাকবে না! প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই উচ্চারণ, মানে ইভিএম ব্যবহার করা না হলে সেই সুযোগটা আছে।

একই সঙ্গে প্রশ্ন, তা হলে কী কেউ কেউ সেই সুযোগের ব্যবহার করেছেন। যদি তাই হয় তাহলে হুদা সাহেবের নির্বাচনের আগের কথাটাই সঠিক ছিল। তিনি শতভাগ নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি দিতে পারবেন না। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তিনি স্বীকার করলেন; তিনি শতভাগ নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারেননি! তাহলে নৈতিকভাবে তাঁর কী আর ঐ পদে থাকার অধিকার থাকে?

যদি ধরে নেয়া হয়, তিনি বিরোধী দল যে অভিযোগ করছে, তাদের উদ্দেশে বলেছেন, ইভিএমে হলে এই সব অভিযোগ করার সুযোগ থাকবে না। ভাল কথা। তাহলে কী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে কেউ ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছিলেন? আর নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা কী সেই রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন! ভোটের আগে ঘুমিয়ে থাকা নির্বাচন কমিশনার থেকে তাহলে লাভ কী?

আপাতত লাভ একটাই। নিজেদের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অনৈক্য ঢাকতে একই সঙ্গে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে এখন তিনি এই শব্দাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। তাঁর কথা শুধু তাঁর মনের অর্ন্তনিহিত ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। মানুষ সেভাবে বিচার করবে না। সেটা তাঁর জানা। তারপরও এরকম বাক্য উচ্চারণের অন্য অর্থ আছে কী না সেটা ভাবা জরুরি।

তিনি বিরোধী দলের অভিযোগকে নতুন মাত্রা দিয়ে দিলেন। সেটা দেশে এবং দেশের বাইরের মানুষের কাছেও। যাদের মনে এতদিন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন দানা বাঁধেনি, তারাও নতুনভাবে ভাবতে শুরু করবেন। সেই ভাবনার উপাদান সরবরাহকারী হয়ে গেলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এবং সেটা বেহুদা কথা বলে।

কথা বড় মারাত্মক অস্ত্র। কথার প্রয়োগ সঠিক না হলে তার পরিণতি ভাল হয় না। পাকিস্তানিদের গোলাবারুদের সামনে আর বোমারু বিমানের নিচে দাঁড়িয়ে ’৭১ এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু কীভাবে কথা বলেছিলেন, সেটা শুনলে বোঝা যায় কথা কত বড় অস্ত্র। সেই অস্ত্র কিভাবে প্রয়োগ করতে হয়। আর তার সঠিক প্রয়োগ হলে ঐ গোলবারুদের চেয়েও বড় অস্ত্র হয়ে যায় কথা।

বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসের আগে থেকে গোটা মানব সভ্যতার ইতিহাসটাই কথায় নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। কথা যুদ্ধ লাগিয়েছে। আবার কথা গোটা একটা জাতিকে উদ্ধুদ্ধ করেছে। কথা বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। কথা মানুষের মনে ভালবাসা জাগিয়েছে। কথা যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছে। কথা বিশ্বজুড়ে বহু মানুষকে বিপ্লবের জোয়ারে ভাসিয়েছে।

আবার কথা সেই বিপ্লবের জোয়ারকে ভাটার টানের দিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু অতি কথন সব সময় অসার, ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সিইসি যা বললেন, তা কী বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে আরো বির্তকিত করার নতুন দরোজা খুলে দিল কী?

বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়নি। এটা সত্য। তার মূল কারণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকঠাক মত কাজ করেনি। তাদের কাজ করতে দেয়া হয়নি। গড়পড়তা একটা অভিযোগ করা হয় সরকার তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না।

অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগটা একেবারে অসত্য তাও নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সেই সব প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বড় চেয়ারে যারা বসেন; তারা বেশিরভাগ সময় নিজেদের দায়িত্ব আর শপথের কথা ভুলে যান। কাজের চেয়ে কথা বলতে বেশি ভালবাসেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও তাই করলেন। তাঁকে কী সরকারের কেউ বলেছেন , আপনি ইভিএম এর ব্যবহারের ভালদিক তুলে ধরতে গিয়ে বলুন, এর ব্যবহারে আগের রাতে ব্যালটবাক্স ভরে রাখার সুযোগ থাকবে না! নিশ্চয়ই না। কারণ, তিনি স্বাধীন। তিনি যা বলেছেন তা নিজের দায়িত্বেই বলেছেন।

এখন কী জাতি তাঁর কথায় আস্থা রাখবে? যদি তাই রাখতে হয়; তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বলা উচিত, কোথায় আগের রাতে ব্যালটবক্স ভরে রাখা হয়েছিল? অথবা তাঁর ব্যাখ্যা করা উচিত আগের রাতে কীভাবে ব্যালটবক্স ভরা হয়? তা নাহলে ধরে নিতে হবে একাদশ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গের উদ্দেশ্যে এই শব্দাস্ত্র প্রয়োগ করলেন!

এখন যুক্তি-পাল্টাযুক্তি, পুরনো ইতিহাসকে টেনে এনে কথার মারপ্যাঁচ যাই দেয়া হোক, মানুষের বিশ্বাসে চিড় ধরলে সেটা জোড়া লাগানো কঠিন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাহেব নিজে ক্যামেরায় ধারণকৃত তাঁর কথাগুলো একাধিকবার শুনে দেখতে পারেন। আর ভাবতে পারেন জনমানসে তার অভিঘাত কী হতে পারে।

কথায় অনেক কিছুর সমাধান হয়। আবার কথায় অনেক নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কী আগামী দিনের নির্বাচনগুলো নিয়ে নতুন সংকট তৈরির পথে হাঁটলেন?

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

‘তিনি বিরোধী দলের অভিযোগকে নতুন মাত্রা দিয়ে দিলেন। সেটা দেশে এবং দেশের বাইরের মানুষের কাছেও। যাদের মনে এতদিন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন দানা বাঁধেনি, তারাও নতুনভাবে ভাবতে শুরু করবেন। সেই ভাবনার উপাদান সরবরাহকারী হয়ে গেলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।’

আপনার মতামত লিখুন :