গণহত্যার বিচার হবে কি?

ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম
ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম , অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১০:০৪ এএম, ২৫ মার্চ ২০১৯

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার কোনো রকমের সতর্ক সংকেত না দিয়ে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর যে নিধনযজ্ঞ চালায় তার ভয়াবহতা নিরূপণ কঠিন। গণহত্যার সাথে জড়িত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদেরকে বাঙালি নিধনের দায়ে অভিযুক্ত এবং তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি।

তবে এজন্য সবার আগে প্রয়োজন দিবসটির একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছে বলে আমরা জানি তবে সে চেষ্টায় কূটনৈতিক সামর্থ কতটুকু আছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বিগত ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ এ চেষ্টা করলেও মাঝখান দিয়ে জাতিসংঘে ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে গৃহীত হয়। দুঃখজনক যে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশও ৯ ডিসেম্বরের পক্ষেই সমর্থন দিয়েছিল বলে আমরা শুনতে পাই। এ ছিল এক ধরনের কূকনৈতিক চরম অপরিপক্কতা। একবার একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে যাবার পর সে বিষয়ের পুনর্বিবেচনা কঠিন; বিশেষত জাতিসংঘের মতো ফোরামে তা আরো কঠিন বলেই আমাদের বিশ্বাস।

সে যত কঠিনই হোক না কেন আমরা গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার চাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো একটি কঠিন কাজ যখন আমরা সম্পন্ন করতে পারি তখন আমাদের স্পর্ধা বেড়ে যায়। সেই স্পর্ধা থেকেই আমরা গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকে সামনে রেখে আমাদের এ দাবি দিন দিন আরো পরিণতি অর্জন করবে সে বিশ্বাসও করি।

গণহত্যার বিচার এজন্য প্রাসঙ্গিক যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আমাদের অর্জিত বিজয়কে তথা স্বাধীনতাকেই আমরা সবচেয়ে বড় করে দেখি, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ বিসর্জন এবং আড়াই লাখ নারীর সম্ভ্রমকে সর্বোপরি বাংলাদেশে পরিচালিত পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিষয়টি আমরা বড় করে দেখি না। ফলে আমাদের এই বিবেচনার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা থেকে মুক্তির জন্য গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা সময়ের দাবিতে পরিণত। বিশেষত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় এই বিচারিক প্রক্রিয়াটি শুরু হলে শহীদের আত্মা যেমন শান্তি পেত তেমনি আমরাও পরম আনন্দ অনুভব করতে পারতাম।

১৯৭১ সাল বাঙালির জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। এ বছর ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করে। এ অর্জনের কথা যতটা সহজ করে বলা যায় ঠিক ততটা সহজে অর্জিত হয়নি। পাকিস্তানিদের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ৩০ লাখ বাঙালিকে শহীদ হতে হয়েছিল আর আড়াই লাখ নারীকে হারাতে হয়েছিল সম্ভ্রম।

অর্থাৎ অগণিত মুক্তিযোদ্ধার সশস্ত্র সংগ্রাম, ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও আড়াই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বনিময়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। কিতু এই স্বাধীনতা বাঙালির জীবনে হঠাৎ করে আসেনি। এসেছে দীর্ঘ দিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন একজন ভবিষ্যৎবাদী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।

স্বপ্ন দেখানোর পর তৃণমূল পর্যায় থেকে সকল মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন স্বাধীনতা ও মুক্তির আনন্দ-আস্বাদের কথা। গ্রাম-গঞ্জ-শহর-নগরের মানুষ বঙ্গবন্ধুর চেতনার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন বাঙালির জীবনের নানা ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়ে। তাঁর উদাত্ত আহ্বানে এদেশের মানুষ শুধু উজ্জীবিতই হয়নি- বঙ্গবন্ধুকে দেশবাসী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল এক কাণ্ডারীরূপেও গ্রহণ করেছিল, মেনে নিয়েছিল নির্ভরযোগ্য এবং অবিসংবাদী এক ও অনন্য নেতা হিসেবে। শেষে বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত আহ্বানের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীন জাতিসত্তার একটি সফল পরিণতি লাভ করে। শত শত বর্ষের শাসন, শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিপরীতে বাঙালির আশা আকাঙ্খা ও স্বপ্ন একটি বাস্তব ও সার্বভৌম ভিত্তি অর্জন করে।

বাঙালির স্বপ্ন ও আকাঙ্খা পূরণের অভিযাত্রা সহজ ছিল না। একটি কাঙ্খিত মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পথে বাঙালির অভিযাত্রা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকেরা নানা টালবাহানা শুরু করে। তা সত্ত্বেও ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম আক্রমণটি তারা বাঙালির ওপর অতর্কিতে পরিচালনা করবে এমন ধারণা অনেকেরই ছিল না।

পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার কৌশল হিসেবে রাতের অন্ধকারে নির্বিচার গণহত্যা শুরু করেছিল। গণহত্যার মানেই হলো একটি জাতি, জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করা। পাকিস্তানিরা সেই পথই বেছে নিয়েছিল।

গণহত্যার বিচারের দাবি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টির একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অনিবার্য। এখন গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের খবই জন্য জরুরি। এই স্বীকৃতি অর্জন প্রচেষ্টায় বিলম্বও ঘটে গেছে অনেক। এর পেছনকার অন্যতম কারণ ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে পাকিস্তানি ভাবধারার শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণে পাকিস্তানপন্থীদের সাঙ্গীকরণ।

অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশে পরাজিত শক্তির আদর্শিক উত্থান, রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শাসনকার্যে অংশগ্রহণ। ফলে, আগস্টোত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুষঙ্গী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ছিল দুরূহ বিষয়। উপরন্তু, এই সময়েই শুরু হয় বাঙালির ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে ব্যাপক গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের বিষয়টি সাধারণের চোখের আড়ালে পড়ে যায়।

সেনা-নিয়ন্ত্রিত বহুদলীয় গণতন্ত্র কায়েমের নামে সংবিধান ও ইতিহাস ছিন্নভিন্ন করে বিকৃত ইতিহাসের ধারা প্রবর্তনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে নিশ্চিহ্ন করা হয়। সেরকম পেক্ষাপটে গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এছাড়াও, হতাশার বিষয় হলো পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক অবহেলা ও অপরিপক্কতার কারণে ২৫ মার্চের পরিবর্তে ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘে এ বিষয়ে বাংলাদেশও ভোট প্রদান করেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে যে গণহত্যা শুরু করেছিল পাকিস্তানি শাসকেরা তার দায়ে অভিযুক্তদের সনাক্ত ও অভিযোগপত্র গঠনে এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ আমরা প্রত্যক্ষ করিনি। এটি করতে হলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের সমর্থন প্রয়োজন। এজন্য বাংলাদেশের কৌশলপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতরা সক্রিয়তা জরুরি। সকলেই স্বীকার ও অনুভব করেন যে, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য ২৫ মার্চকে গণহত্যার স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে। সমগ্র বিশ্ব জানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রির কথা। কী ভয়ংকর ও অমানবিক রাত ছিল ২৫ মার্চ! ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশ ২৫ মার্চ রাত্রিতে যে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার করেছে মানব ইতিহাসে নিকট-অতীতে সেরকম ঘটনার নজির নেই। সে রাতে ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকটি সুসজ্জিত দল ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছে ১৮ নম্বর পাঞ্জাব, ২২ নম্বর বেলুচ, ৩২ নম্বর পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ব্যাটেলিয়নের সদস্যরা। এদের অস্ত্র ছিল ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট লাঞ্চার, ভারি মর্টার, হালকা মেশিনগান প্রভৃতি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর ঢাকার সর্বত্র এক ত্রাস ও তাণ্ডবের রাজত্ব কায়েম করে। হত্যা করে নারী-পুরুষ-শিশু-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। সারি সারি লাশ আর রক্তের প্রবল ধারায় বাংলাদেশ পৃথিবীর জঘন্যতম এক গণহত্যার সাক্ষী হয়ে থাকে।

পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালির সামগ্রিক অস্তিত্ব নিমূর্লের যে পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের জন্য মধ্যরাতে ‘অপারেশন সার্চ-লাইট’ পরিচালনা করেছিল তা ছিল শাণিত চেতনাসমৃদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শপুষ্ট একটি অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার বিনাশ-প্রক্রিয়া। কিন্তু বাঙালির ন্যায্য সংগ্রামকে বিশ্ববিবেক স্বাগতই জানিয়েছিল। তাই পাকিস্তানিরা যতই ষড়যন্ত্র ও বল প্রয়োগ করেছিল ততই তারা বিশ্ববাসীর সমর্থন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাদের অন্যায্য আক্রমণ বাঙালির সৎ ও ন্যায়ের লড়াইয়ের কাছে পদানত হয়েছে। পদানত পরাজিত শত্রুদের মধ্য থেকে সেইসব অমানবিক ও নিষ্ঠুর সেনাকর্মকর্তাদের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ও বিচারের মাধ্যমে জাতির ইতিহাস থেকে কলংকমুক্তির প্রয়াস গ্রহণ করা যেতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/এমকেএইচ

পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার কৌশল হিসেবে রাতের অন্ধকারে নির্বিচার গণহত্যা শুরু করেছিল। গণহত্যার মানেই হলো একটি জাতি, জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করা। পাকিস্তানিরা সেই পথই বেছে নিয়েছিল।

আপনার মতামত লিখুন :