কৃষি সমৃদ্ধিতে ক্রপ জোনিং : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম
কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম , কৃষিবিদ ও লেখক
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ এএম, ০৬ মে ২০১৯

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে দ্রুতহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ায় গবেষণার সাথে মাঠ পর্যায়ে ফলনের পার্থক্য কৃষি সম্পদ তথ্য উপকরণ ব্যবহারে কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো নানা চ্যালেঞ্জের সন্মুখীন হচ্ছে আমাদের শতাব্দীর কৃষি। কৃষির উৎপাদনশীলতা মুনাফা উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অধিকতর দক্ষ ও টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা উদ্ভাবন অতি জরুরি। এটি কৃষিসম্পৃক্ত জাতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যা সঠিক পরিকল্পনায় প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং যথাযথ প্রযুক্তি অনুসরণের মাধ্যমে কৃষি জমির যৌক্তিক লাভজনক ব্যবহার নিশ্চিত করে মোকাবেলা করা সম্ভব। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কৃষি জমির যৌক্তিক ও লাভজনক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে প্রথম ও প্রধানতম পদক্ষেপ হলো বিভিন্ন ফসলের সর্বাধিক উৎপাদনক্ষম এলাকা শনাক্তকরণ। অর্থাৎ এসব এলাকা যেখানে মাটিও জলবায়ু কোন বিশেষ নিদিষ্ট ফসল আবাদের জন্য অতি উপযোগী।

জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম। এ দেশ পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর একটি। ২০৩০ সনে ১৯ কোটি জনসংখ্যার জন্য শুধু দানাদার ৪ কোটির বেশি টন খাদ্য প্রয়োজন হবে। তাই বর্তমান দানাদার ফসলের হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ২.৮ টন হতে ৪ টনে নিয়ে যেতে হবে। বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে ২০১৫ সনের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যতা অর্ধেকে নামানোর কথা। কিন্তু খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি, দারিদ্র্যতা, অসম খাদ্য বণ্টনের কারণে এটি ২১৫০ সনের আগে অর্জিত হবে না বলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান জানান। এ রকম চিত্রে বাংলাদেশেও সংশ্লিষ্ট।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের কয়েক বছর আগের উপাত্ত যদিও এখন সে অবস্থা নেই। তাদের মতে দেশের ৫০% লোক বছরে কোনো না কোনো সময় খাদ্য ঘাটতিতে পড়ে এবং ২৫% লোক নিয়মিত খাদ্য ঘাটতিতে পড়ে এবং ৭% লোক তিন বেলা খেতে পায় না। আমাদের দেশে মাত্র ৪ ভাগের ১ ভাগ লোক শরীরে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য শক্তি পায়। সত্য হলো এদেশে শতকরা মাত্র এক ভাগ লোক ভিটামিন বি এবং ২৩ ভাগ লোক ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৫ হতে ২০০৮ এর মধ্যে দারিদ্র্যতার সংখ্যা ১.৩ কোটি বেড়েছে।

কৃষি জমি ১৯৭১ সনে ১ কোটি হেক্টর থেতে কমে বর্তমানে প্রায় ৬৫ লাখ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। অতএব সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাকে। খাদ্য নিরাপত্তা সহজভাবে বললে, কোনো দেশের সব জনসংখ্যার সহজভাবে খাদ্য শস্য ও পুষ্টি লভ্যতাকে বুঝানো হয়। তবে অনেকেই মনে করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজার বিশৃঙ্খলার কারণে হঠাৎ আসা আপদের সময় উদ্ভদ খাদ্য সঙ্কটের মোকাবেলায় খাদ্য শস্য মজুদ থাকাকে খাদ্য নিরাপত্তা বলে। এফএও (১৯৯৬) এর মতে, ‘খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে যা মানুষের জন্য সব সময়ের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের লভ্যতা, যার ফলে তারা তাদের পথ্যের অভাব এবং খাদ্যের অভিন্নরুচি ও অগ্রাধিকার মিটিয়ে একটি কর্মঠ ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে পারে।’

মাটির ধরন, অনুকূল আবহাওয়া, কৃষকের চাষাবাদ জ্ঞান ও আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে লাভজনকভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট ফসল চাষাবাদ করার বিষয়টি হচ্ছে ক্রপ (শস্য) জোনিং। ধরি ‘ক’ এলাকায় বা কৃষিব্লকে টমেটো চাষ লাভজনক এবং টমেটোর চাষাবাদ করতে কৃষকরা আগ্রহী। তবে এই এলাকা বা কৃষিব্লকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি দিয়ে যদি শুধুই টমেটো চাষ করা হয় তবে এটাই হলো ক্রপ জোনিং।

যদি পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব সৃষ্টিকর্তা প্রাকৃতিক ক্রপ জোনিং অনেক এলাকায় সৃষ্টি করেছেন। যা এখন আমাদের সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে বেশকিছু জায়গায় কিছু কিছু পণ্য ভালো হয় যেমন- রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আম; সিলেট, মৌলভীবাজার ও পঞ্চগড়ে চা; বগুড়াতে মসলা; নওগাঁ ও দিনাজপুরে সুগন্ধি চাল; রংপুর, বগুড়া, মুন্সীগঞ্জ ও রাজশাহীতে আলু; ময়শনসিংহ নরসিংদীতে কলা এসব।

আবার বিভিন্ন উপজেলা প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের গোদাগাড়িতে টমেটো ও ডাল; বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে মরিচ; নাটোরের গুরুদাসপুরে রসুন; জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলায় আলু; চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় উন্নত আম এসব। সব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, মাটি, আবহাওয়া, কৃষকের চাষ করার পদ্ধতির কারণে নির্দিষ্ট জায়গাতে নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদন করলে লাভবান হওয়া যায় এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করা যায়। যা ক্রপ জোনিং ধারণাকে উৎসাহিত করে।

ক্রপ জোনিং জেলাভিত্তিক, উপজেলাভিত্তিক, ব্লকভিত্তিক বা একটি বড় এলাকাভিত্তিক নানাভাবে হতে পারে। বর্তমানে আমাদের দেশে আইপিএম, আইসিএম, আইএফএমসি নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে তবে এ পদ্ধতিগুলোর ফলাফল তখনই কাঙ্খিত হবে যখন একটি বড় এলাকার কৃষকরা সবাই অনুমোদিত প্রযুক্তি গ্রহণ করবে। এটিও ক্রপ জোনিংকেই উৎসাহিত করে।

ক্রপজোনিং এর সুবিধা

* কৃষি সম্প্রসারণে কাজে সহায়ক হবে, গতি আসবে কৃষক প্রশিক্ষণ দিতে সুবিধা হয় ফলে কৃষক নতুন প্রযুক্তি তাড়াতাড়ি গ্রহণ করতে পারে;
* কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি ক্ষেত্রে বীজ, সার, বালাইনাশক ডিলারদের দৌরাত্ম্য কমে। কারণ কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির সুযোগ কম এবং কৃষক কারিগরি জ্ঞানে এগিয়ে থাকার জন্য সহজে অন্য পণ্য ডিলাররা বিক্রয় করতে পারে না;
* ফসলে রোগ, পোকামাকড় কম হয়। কারণ এক ধরনের পোকা দমন বিভিন্ন পোকা দমন অপেক্ষা সহজ। এছাড়া এক জমির পোকা অন্য জমিতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে না;
* এখন সময়ের দাবি দেশে কৃষি চিকিৎসালয় গড়ে তোলা। ক্রপ জোনিং করলে এটি করা সহজ হবে;
* উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহায়ক, কাঁচামাল প্রাপ্তিতে সমস্যা হয় না সময় মতো পাওয়া যায়। এতে শিল্পউদ্যোক্তা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারে;
* বীজ ও সার সঙ্কট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হয় না। কারণ আগথেকে পরিসংখ্যান থাকবে কখন কোন জায়গায় কতটুকু বীজ সার প্রয়োজন হবে;
* সেচ ও নিকাশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হবে; # শিল্পের বিকাশ ঘটে কারণ কাঁচামাল পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে;
* পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। কারণ বিভিন্ন কৃষি পণ্যের পরিবহন ব্যবস্থা বিভিন্ন ধরনের;
* শস্য বহুমুখিতা, শিল্পের বিকাশ এসব কারণে বেকার সমস্যায় ভ‚মিকা রাখতে পারবে;
* কৃষকদের কিছু ফসলের সঠিক উৎপাদন কৌশল জানা সহজ। যেহেতু এ ধরনের কৃষি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কয়েকটি ফসল সম্পর্কে কৃষক ধারণা লাভ করবে তাই পণ্যের মান উন্নয়নে সহায়ক হয়। কারণ মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করতে বিভিন্ন কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন হয়;
* কাজের মনিটরিং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে; # ফসলের মান ভালো হবে;
* দালাল-ফড়িয়ার দৌরাত্ম্য কৃষি বাজারে কম হয় কারণ ক্রেতা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে;
* পণ্য গ্রেডিং পদ্ধতির উন্নয়ন হবে # আমদানি কমবে ও রফতানি বাড়বে;
* উদ্যোক্তার জমি সমস্যার সমাধান হয় এবং উৎপাদনকারীর মূলধনের অভাব দূর হবে;
* সারাবছর শ্রমিকের কাজ থাকে সাথে সাথে শহরমুখিতা রোধ হবে;
* বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে কারণ বিদেশ হতে মসলা, শাকসবজি কিনে আনতে হবে না;
* কৃষকের তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞানের উন্নয়ন ঘটবে কারণ অল্প তথ্য সঠিক সময়ে দেয়া সম্ভব হবে;
* বহুপাক্ষিক চুক্তি হয় বলে টেকসই কৃষি গড়ে ওঠে। কারণ কৃষি লাভজনক হবে এবং বড় বড় কোম্পানি কৃষির সাথেযুক্ত হবে;
* শস্য বহুমুখিতা দেখা দেবে। কারণ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হবে;
* পণ্যের বাজার নিশ্চিত করে বলে কৃষকের ফসল উৎপাদনের পর ঝুঁকি কমে যাবে;
* পণ্যের মান উন্নয়নে সহায়ক হবে; # কৃষি যান্ত্রিকীকরণ করা সহজ হবে;
* বিভিন্ন কৃষিপ্রকল্প নেয়া সহজ হবে। কারণ দেশের নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট প্রকল্পের প্রয়োজন হবে;
* সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বা প্রকল্প গ্রহণ করা সহজ হবে;
* সংরক্ষাণাগারের উন্নয়ন সম্ভব হবে; # প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে;
* দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য সহায়ক কারণ ফলমূল, শাকসবজি, দানাদার ফসল, তেল ফসল, ডাল

ফসলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নির্ধারণ করে উন্নত প্রযুক্তির দ্বারা চাষাবাদ করা যাবে; # পরিশেষে, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায় এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটে।

ক্রপজোনিং এর অসুবিধা

* কৃষক সংঘবদ্ধ না হলে অনেক সময় কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ যদি ক্রেতা অধিক উৎপাদন দেখে কৃষকের জিম্মি করতে চায়। এ জন্য শক্তিশালী নীতিমালা প্রয়োজন হবে; * ক্রেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা কম হলে কৃষক পণ্যের দাম কম পেতে পারে। কারণ কম সংখ্যক ক্রেতা বাজারে থাকলে বিক্রেতারা তার কাছে পণ্য বিক্রয় করতে বাধ্য থাকে; * কৃষকের এক ফসল হতে অন্য ফসলে যাওয়ার উপায় না থাকলে বাজারে ক্রেতার কাছে বিক্রেতা জিম্মি হতে পারে। কারণ কৃষক যদি অন্য লাভজনক ফসলে যেতে না পারে তখন ক্রেতা পণ্যের সঠিক দাম নাও দিতে পারে; * মাঠে মড়ক অর্থাৎ রোগ, পোকামাকড় দেখা দিলে তা দ্রুত ছড়াতে পারে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার প্রেক্ষাপটে কৃষি ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ভূমি সম্পদের যৌক্তিক লাভজনক ব্যবহারের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার কাউন্সিল (বিএআরসি) ডেওভলপমেন্ট অব উপজেলা ল্যান্ড সুইটাবিলিটি এসেসমেন্ট এন্ড ক্রপস জোনিং সিস্টেম অব বাংলাদেশ শীর্ষক প্রকল্পটি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তা বাস্তবায়ন করছে।

এছাড়াও সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ফসল উপখাতের নীতি ও কৌশলের সাথে এর প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে ক্রপস জোনিং এবং ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসডিজির একটি লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভূমি ও পানি সম্পদের বিচক্ষণ যৌক্তিক বব্যহারের মাধ্যমে ফসলের সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিতকরণ ক্রপ জোনিং এর মূল প্রতিপাদ্য।

এ চলমান প্রকল্পে উপজেলাভিত্তিক ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদ তথ্য উপাত্ত ভূমির উপযোগিতা নিরুপণ ও ক্রপ জোনিং নির্ধারণের কাজে ব্যবহৃত হবে যা স্থানীয় পর্যায় কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ প্রকল্পের আওতায় শস্য/শস্যবিন্যাসের বায়োফিজিক্যাল সীমাবদ্ধতা যাচাই ও উৎপাদন সম্ভাব্যবতা অনুসন্ধান নিরুপণ করা হবে। পাশাপাশি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচেনায় স্থানিক ও সমন্বিত পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ টেকসই কৃষি উন্নয়ন সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

এ গবেষণার উদ্দেশ্য হলো উপজেলা পর্যায় ফসল উৎপাদনের লক্ষে জিওগ্রফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম জিআইএসভিত্তিক একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা যা ক্রমহ্রাসমান ভূমি ও পানি সম্পদের সর্বোত্তম ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে। জিআইএসভিত্তিক ভূমি ব্যবহারের উপযোগিতা নির্ধারণ ও ক্রপ জোনিং প্রযুক্তি অধিকতর কৃষি উৎপাদনে সক্ষম। ভূমি শনাক্তকরণ ও নির্বাচিত ফসলসমূহের সম্প্রসারণে সহায়তা করবে। উপজেলা পর্যায়ে ভূমির উপযোগিতা নিরুপণ ও ক্রপ জোনিং তথ্য কৃষি উন্নয়নে জ্ঞান বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। ফলে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। ও কৃষি সর্বার্ধিক আয় নিশ্চিতে সাহায্য করবে।

ক্রপ জোনিং গবেষণার প্রত্যাশিত ফলাফল

- টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য ওয়েব জিআইএসভিত্তিক অনলাইন ফসল উপযোগিতা নির্নয়ক সফট ওয়ার স্থাপন ও ব্যবহার;

- অনলাই কৃষি পোর্টাল কৃষি বিষয়ক উপদেশ মূলক সেবা ভূমি ও মৃত্তিকা সংক্রান্ত তথ্য শস্য উৎপাদন প্রযুক্তি মৃত্তিকা পুষ্টি ও উর্বরতা আর্থসামাজিক অবস্থান গ্রোথ সেন্টার হাটবাজার যোগাযোগ ব্যবস্থা কৃষি উপকরণ সংক্রান্ত তথ্য এসব;

- ক্রপস জোনিংভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন; - উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে নির্দিষ্ট কিছু ফসল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন;

- কৃষির উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির পরে কৃষকের আর্থিক লাভ এবং জীবন জীবিকার উন্নয়ন।
গবেষণার উদ্দেশ্য

খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের সর্বাধিক আয় নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে স্থানভিত্তিক উপযোগী ফসল ও ফসলবিন্যাস বিষয়ক তথ্য উপাত্ত কৃষক ও উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের নিকট সরবরাহ করা। এবং ক. কৃষকের টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নে উপযুক্ত কৃষি অনুশীলন বাছাইয়ে লক্ষে ভূমি ও শস্য উপযোগিতা বিষয়ক তথ্য উপাত্ত সৃজন হালনাগাদকরণ এবং কার্যকারিতা যাচাইকরণ; খ. স্থানভিত্তিক ফসল উপযোগিতা নিরুপণের জন্য একটি ওয়েব জিআইএসভিত্তিক অনলাইন সফটওয়ার প্রস্তুতকরণ;

গবেষণার কার্যপদ্ধতি ও কৌশল

বিএআরসি প্রকল্পে মূখ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাবির্ক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধন করবে। আরো নির্দিষ্টিভাবে বিএআরসির মূল কাজ হলো ক্রপ জোনিং এর জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ সংকলন ও সম্পাদনা কৃষি পোর্টাল নির্মাণ ক্রপ রুলস প্রণয়ন ফসলের বায়োফিজিক্যাল উপযোগিতা নির্ধারণে মৃত্তিকা জলাবায়ু ও পানির চাহিদা মাঠ পর্যায় ক্রপজোনিং প্রকল্পর আউটপুটের যথার্থতা যাচাইকরণ প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা।

সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা প্রকল্পের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এসআরডিআই ভূমি ও মৃত্তিকার ভৌত এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের হালনাগাদকৃত তথ্য সরবরাহ করবে। এসআরডিআই উপজেলা পর্যায় মৃত্তিকা জরিপ পরিচালনা মৃত্তিকা নমুনা সংগ্রহ গবেষণাগারে নমুনা বিশ্লেষণ জরিপলব্ধ তথ্য উপাত্তের ব্যাখ্যাকরণের মাধ্যমে ভূমি ও মৃত্তিকা বৈশিষ্ট্যের তথ্য উপাত্ত হালনাগাদ করবে। এছাড়াও এসআরডিআই প্রধান প্রধান মৃত্তিকা সিরিজের প্রোফাইল বর্ণনাকরণের লক্ষে যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ বিভিন্ন শস্য ও শস্যবিন্যাসে সারের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক তথ্য সংকলনের কাজ পরিচালনা করবে।

ইন্সস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ট্রাস্ট এ প্রকল্পর সহযোগী প্রতিষ্ঠিান হিসেবে স্থানিক ও অস্থানিক ডাটাবেস প্রকল্পে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। ভূমির উপযোগিতা এবং ক্রপজোনিং এর জন্য অনলাইন ওয়েব জিআইএসভিত্তিক সফটওয়ার কৃষি বিষয়ক পরামর্শক পোর্টাল প্রস্তুত সম্পর্কিত কাজ পরিচালনা করবে। জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের নার্সভুক্ত ইন্সস্টিটিউটসমূহ ফসলের ফলন খামার ব্যবস্থাপনা অনুশীলন বিভিন্ন ফসলের জন্য সারের প্রয়োজনীয় মাত্রা সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহ করবে।

ডিএই একটি সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপজেলাভিত্তিক উপযোগী শস্য ও শস্যবিন্যাস সম্পর্কিত তথ্য প্রচারে সহায়তা করবে। এ প্রতিষ্ঠান উপজেলা পর্যায় বিদ্যমান ফসল ও ফসলবিন্যাস সর্ম্পকিত তথ্য এবং নির্দিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় ফসল উৎপাদন গ্রহণকৃত প্রযুক্তির ফলাফল সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহ করবে। বিএআরসির আইসিটি ইউনিট ভূমি সম্পদ ডাটাবেস ফসল উপযোগিতা নির্ধারণ এবং জিআইস টুলসএর ওপর পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রকল্পের কর্মরত প্রফেসনালগণের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।

যেহেতু সফটওয়্যারটি দেশের কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেহেতু এ ব্যবস্থা ভূমি সম্পদ তথ্য ভাণ্ডারের হালনাগাদকরণ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ টেকসই সিস্টেম ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন জিআইএসভিত্তিক শস্য উপযোগিতা নির্ধারন করবে। ক্রপ জোনিং সফটওয়্যারের কার্যকরি মডিউলের সমন্বয়ে গঠিত একটি পদ্ধতিগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হবে। এটি ভূমি ও মৃত্তিকার বিভিন্ন ভৌত রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য কৃষি জলবায়ুর ভূমির জলমগ্নতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করার জন্য বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ ধারণা সম্বলিত হবে।

পরিশেষে ক্রপ জোনিং করা তখনই সম্ভব হবে যখন সুচিন্ততভাবে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলকে বিভিন্ন ফসলের আওতায় ভাগ করা হবে। তবে ধান যেহেতু বাংলাদেশের প্রধান ফসল তাই একে বাদ দিয়ে অন্য ফসলের উন্নয়ন কখনই কাঙ্খিত হবে না। সিলেট এবং দক্ষিণাঞ্চলে জমিকে ধানের আওতায় নিয়ে আসা যায় ও উত্তরাঞ্চলের তুলনাম‚লক উর্বর জমির কিছুটা অংশ ধান হতে বিভিন্ন উচ্চ ম‚ল্য ফসল- ফলমূল, শাকসবজি, চা, আলু এসবের আওতায় আনা সম্ভব হবে তবে ধানের উৎপাদন যেমন ঠিক থাকবে তেমনি বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে খাদ্য এবং পুষ্টির নিরাপত্তা অর্জিত হবে। আর ক্রপ বা শস্য জোনিং করলে জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থেকে দেশকে খাদ্য নিরাপত্তার দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।

বিবর্তনের পথপরিক্রমায় মানুষ বেড়েই চলেছে; নগরায়ণ ও শিল্পায়নের সাথে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। অল্প জমিতে অধিক ফলন ফলাতে লাগসই ও টেকসই কৃষির অপরিহার্যতা আবশ্যকীয়তা প্রশ্নাতীত। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৈশ্বিকউষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতির উপযোগী কৃষির উন্নয়ন করাটা সবিশেষ জরুরি। মানুষের খাদ্যের সংস্থান করতে হলে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। ক্রপ জোনিং করে ফসল উৎপাদন করাটা এখন সময়ের জ্বলন্ত দাবি মাত্র।

মানুষ যতদিন থাকবে, যতদিন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবারের দরকার হবে ততদিন স্বমহিমায় বেঁচে থাকবে কৃষি ও কৃষক। সব সেক্টরের সব উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে যদি কৃষি ও কৃষক প্রতিটি মানুষের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান দিতে সক্ষম না হয়। কৃষি উৎপাদনকে আনুভূমিক নয়, উলম্ব পদ্ধতিতে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সময়, অবস্থা ও অবস্থানের প্রেক্ষিতে জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজির সমন্বিত ব্যবহারে কৃষি হবে সমৃদ্ধ। জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুডই হবে আমাদের প্রধান খাদ্য। কৃষি আজো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জিডিপিতে এখনো কৃষির অবদান ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ।

কৃষি হচ্ছে ফসল ও অন্যান্য কৃষিজ সম্পদ উৎপাদনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। কৃষিক্ষেত্রের অন্য উপশাখাগুলো হচ্ছে গবাদিপশু, মৎস্য ও বন প্রভৃতি। আজকের কৃষি, কৃষক ডিপ্লোমা কৃষিবিদ এবং কৃষিবিদ এখন অনেক আধুনিক এবং হালনাগাদ। দেশের ৮০ ভাগ মানুষ একসময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত ছিল, সে সংখ্যা এখন কিছুটা কমলেও জাতীয় উন্নয়নে এখনো কৃষির বিশেষ অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের হৃদ্দিক ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় কৃষি অনেকদূর এগিয়ে যাবে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে. . .।

এইচআর/এমকেএইচ

মানুষ যতদিন থাকবে, যতদিন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবারের দরকার হবে ততদিন স্বমহিমায় বেঁচে থাকবে কৃষি ও কৃষক। সব সেক্টরের সব উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে যদি কৃষি ও কৃষক প্রতিটি মানুষের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান দিতে সক্ষম না হয়।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]