অস্বাভাবিক জিনিসই এখন স্বাভাবিক!

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ২০ অক্টোবর ২০১৯

ক্রিকেট থেকে রাজনীতির বলকে মাঠের বাইরে পাঠানো সম্ভব কী? একেবারে অসম্ভব তা বলবেন কীভাবে। এদেশের ক্রিকেট এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রেখেছ। তবে সেটা ওয়ানডে থেকে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া পর্যন্ত। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গেলো শতাব্দীর শেষ দিকে প্রথম দফায় ক্ষমতায় আসার পর টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ব্যাপারে যে তৎপরতা দেখিয়েছিলেন, সেটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব ছিল না। এবং তিনি যাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তারা কাজটা সফলভাবে করেছিলেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই বাঁক পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু রাজনীতি ছিল না। বরং ছিল কূটনীতি। যাকে গোটা বিশ্ব বলে- ক্রিকেট কূটনীতি। সেই কূটনীতি কোন আমলার সৌজন্যে নয়। সেটা সম্ভব হয়েছিল ক্রিকেট উত্তর জীবনে যারা ক্রিকেট সংগঠক হয়েছিলেন। কিংবা ক্রিকেটটাকে ভালবেসে ক্রিকেট সংগঠক হয়েছিলেন তাদের দক্ষতায়। হ্যাঁ, ক্রীড়া সংগঠক থেকে রাজনীতিবিদ হলে তাকে দোষ দেয়া যায় না। কিংবা বলা যায় না, তিনি ক্রিকেট প্রশাসন চালাতে পারবেন না। বা তাঁকে দিয়ে হবে না।

কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়, যারা ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বরং দেশজ ক্রিকেটের উত্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে সব চেষ্টা করেছেন, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট বিতাড়নের জন্য মাঠের মাঝখানের ধূসর রং এর বাইশ গজের উপর কোপ পড়লো, তারা গ্যালারিতে বসে হাততালি দিয়েছিলেন! মানুষের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন অসম্ভব ফুটবলপ্রেমী হিসেবে! কিন্তু সেটাও তাদের আসল চেহারা নয়। শুধু মুখোশ। সেই মুখোশের আড়ালের মুখটা দেখা যায় ইতিহাসের পাতা উল্টালে।

খুব বেশি পুরনো দিনে ফিরতে হবে না। সেই নব্বই দশকের শেষ দিকে। একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন প্রথম 'বঙ্গবন্ধু কাপ ফুটবল' করার উদ্যোগ নিলো, তখন দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং সেই সময়ের জনপ্রিয় ক্লাব যাতে অংশ নিতে না পারে, তার জন্য ক্লাবের ফুটবলারদের বকেয়া দিতে অস্বীকার করেন তিনি। ফুটবলারররা কৌশল হিসেবে খেলবো না বলে 'চাপ' তৈরি করেছিলেন। সেই কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, খেলোয়াড়রা খেলবে না, আমি কী করবো! ফুটবলাররা যুক্তি দিলেন, টাকা দিতে না পারলে ক্লাবের পদ ছেড়ে চলে যান। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন; ‘যেতে পারি। কিন্তু আমি ক্লাবকে যে সাত লাখ টাকা ঋণ দিয়েছি সেটা দিয়ে দাও।'

প্রায় অবসরে চলে যাওয়া সাবেক এক ফুটবলার জবাব দিয়েছিলেন- 'মোহামেডানের মত ক্লাবকে যিনি ঋণগ্রস্থ করেছেন সেই ব্যথর্তায়ই আপনার সরে যাওয়া উচিত।' শেষ পযর্ন্ত তিনি সরেননি। ক্লাবের পদ-পদবীতে তার আরো উন্নতি হয়েছিল। এবং সেটা উত্তরোত্তর বেড়েছে। শুধু রাজনৈতিক কার্ড কোন সময়ে কোনটা খেলতে হবে সেটা জানার কারণে। কখন কাকে বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিতে হবে সেই হিসেব নিকেশটা ঠিকমত মেলাতে পারার কারণে। পরর্বতী সময়ে ভদ্রলোক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক বনে গেলেন বন্ধুত্বের সৌজন্যে! তবে তিনি না ফুটবল না ক্রিকেট কোন খেলারই লোক নন।

হ্যাঁ; নন। তিনি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট বিতাড়নে হাততালি দিয়েছিলেন ফুটবল কিংবা ক্রিকেট কোনটার প্রতি বিরাগ বা ভালবাসার কারণে নয়। সেটার মূল কারণ, ছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা হলে 'বঙ্গবন্ধু' নামটা বিশ্ববাসীর কাছে বার বার পৌঁছে যায় শুধু ক্রিকেটের কারণে! অতএব ক্রিকেটকে বঙ্গবন্ধু থেকে সরাতে হবে। সেই প্রকল্পে দারুণ ভূমিকা রাখা জানাকয়েক লোকের মধ্যে তিনিও ছিলেন। আর প্রথম বঙ্গবন্ধু কাপে মোহামেডান যাতে না খেলে তার জন্য ফুটবলারদের টাকা দিতে অস্বীকার করেছিলেন। তার পেছেনে আবার আরও একটা কারণ ছিল, সেই বছর মোহামেডান ফুটবল দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তারপর টিমের ম্যানেজার এবং কয়েকজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছিলেন। সেটা তিনি এবং সেই সময়ে মোহামেডানের সভাপতি মেনে নিতে পারেননি। তাই ফুটবলারদের প্রতি অন্যরকম একটা প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু প্রকৃতির কী বিচিত্র প্রতিশোধ। ধীরে ধীরে সেই মোহামেডান এমন এক ক্লাবে পরিণত হয়েছে চ্যাম্পিয়নশিপ দূরে থাক, তারা রেলিগেশন বাঁচাতে মাঠে নামে! শেষ কবে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লিগে তা একটা প্রজন্ম জানেই না। যেমন জানে না, সেই ভদ্রলোক কী করে ক্রিকেট কর্মকর্তা হয়ে গেলেন! বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসনে পাঠানোর জন্য যিনি এতোকিছু করলেন, তিনি আবার কোন বিশেষ দক্ষতায় বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছাকাছি চলে যান ক্রিকেট কর্তা হিসেবে!

তবে সেই প্রকৃতির নিয়মে আবার অনেক কিছু উন্মোচিত হয়ে যায়। আসলে ক্রীড়াঙ্গনে এসেছিলেন তিনি বিএনপির এক সময়ের মহাসচিব লে. ক.(অব.) মোস্তাফিজুর রহমানের হাত ধরে ব্রাদার্স ক্লাবে নাম লিখিয়ে। পরে মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে সাথে তিনি ঢুকে পড়লেন মোহামেডানে। মোস্তাফিজ সাহেব বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্টোলবোর্ডের সভাপতি হিসেবে এই ভদ্রলোককে অবশ্য নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, বিসিসিবিতে কোন পদপদবী না দিয়ে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যার সময় তিনি এতোগুলো কমিটির দায়িত্বে যেন তিনি ছাড়া ক্রিকেট অচল। আর মোহামেডান ক্লাব সচল রাখতে তিনি ক্যাসিনো চালানেন ঝিলপাড়ার ক্লাব টেন্টে! নানা দিক থেকে ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর বিভিন্ন পদে আহরণ অনেক তাৎপর্যপূর্ণ।

নানা দুর্নীতির অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে মোহামেডান ক্লাব নিয়ে। ক্রিকেট বোর্ডের বিভিন্ন পদের কাযর্ক্রম নিয়ে। কিন্তু রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার বলয়ের কাছাকাছি থাকার কারণে তিনি ছিলেন যথেষ্ট নিরাপদে। হঠাৎ, তিনি ক্যাসিনো কান্ডে আটক। অবশ্য তাতে নাকি ক্রিকেট বোর্ডের মান সম্মান ক্ষুণ্ন হয়নি! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিয়ামক সংস্থাটির ভাবমূর্তি কী আদৌ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? যদি না হয়, তাহলে বাকি যারা ধরা পড়েছেন ক্যাসিনাো কান্ডে তাদের জন্য অন্যক্লাব বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূতির্র কী ক্ষতি হলো?

আসলে এখন অনেক ‘অস্বাভাবিক’-কে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ক্রিকেট পরিচালনা পর্ষদে যদি ক্যাসিনো পরিচালনা করার লোকজন জড়িত থাকেন , তাহলে দেশের সব অস্বাভাবিক জিনিসকে স্বাভাবিক মনে হলে, ‘মন'-কে দোষ দিবেন কীভাবে?

লেখক : এডিটর, দীপ্ত টিভি।

এইচআর/পিআর

আসলে এখন অনেক ‘অস্বাভাবিক’-কে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ক্রিকেট পরিচালনা পর্ষদে যদি ক্যাসিনো পরিচালনা করার লোকজন জড়িত থাকেন , তাহলে দেশের সব অস্বাভাবিক জিনিসকে স্বাভাবিক মনে হলে, ‘মন'-কে দোষ দিবেন কীভাবে?