সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১০:১১ এএম, ২১ অক্টোবর ২০১৯

রাশেদ খান মেনন যা বলেছেন, তাতে তার হিরো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ভিলেনই রয়ে গেলেন। কারণ দৈনিক যুগান্তরে একই দিনে দুটি শিরোনাম। প্রথম পাতায় শিরোনাম ‘র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য: ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন মেনন।’ আর ভেতরের পাতায় ছাপা হয়েছে ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, গত নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি: রাশেদ খান মেনন।’ অন্য সব পত্রিকায় অবশ্য পরের খবরটিই প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে। আলোচনার ঝড় রাশেদ খান মেননের এই স্বীকারোক্তি ঘিরেই।

শনিবার বরিশাল নগরীর টাউন হলে ওয়ার্কার্স পার্টির এক সম্মেলনে রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত হয়েছি। তারপরও আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি পরবর্তীতে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ।’

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আপনি-আমি মিলে যে ভোটের জন্য লড়াই করেছি, আজিজ কমিশনকে ঘেরাও করেছি, আমরা এক কোটি ১০ লাখ ভুয়া ভোটার তালিকা ছিঁড়ে ফেলে নির্বাচন বর্জন করেছি মনোনয়ন জমা দেয়ার পরও। আজকে কেন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জাতীয় নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারছে না? উন্নয়ন মানে গণতন্ত্রহরণ নয়। উন্নয়ন মানে ভিন্নমতের সংকোচন নয়। উন্নয়ন মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাহরণ নয়। উন্নয়ন মানে গণতন্ত্রের স্পেস কমিয়ে দেয়া নয়।’

এই বক্তব্যের পর আসলেই রাশেদ খান মেননের হিরো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি সবাই তাকে নিয়ে ট্রল করছে। মজাটা হলো, সবাই তার কথা বিশ্বাস করছে। কিন্তু সবারই প্রশ্ন, নির্বাচনের ১০ মাস পর কেন রাশেদ খান মেনন এই কথা বলছেন? তাকে ফ্রুটিকা খাওয়াল কে? এটাও বলা হচ্ছে, জনগণ যদি ভোট দিতে নাই পারে, তাহলে রাশেদ খান মেননের উচিত পদত্যাগ করা। যদিও রাশেদ খান মেনন বলে দিয়েছেন, পদত্যাগ তিনি করছেন না।

এতদিন পর কেন রাশেদ খান মেননের এমন বোধোদয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সবাই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অবশ্য উত্তর দেননি, পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, ‘এতদিন পরে কেন, এই সময়ে কেন? মন্ত্রী হলে কি তিনি
এ কথা বলতেন?’

আমি ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে একমত, মন্ত্রিত্ব পেয়ে গেলেই আর রাশেদ খান মেনন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন না। এই সময়ে কেন? ওবায়দুল কাদেরের এই প্রশ্নটি আমারও। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে ভালো হয়নি, এটা সবাই জানে। সময়টা নিয়ে আমার কৌতূহলের জবাবটাই পেয়ে যাই যুগান্তরের রিপোর্টে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের মাধ্যমে শুরু হয় সরকারের শুদ্ধি অভিযান। সেদিনই অভিযান চালানো হয় ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে। সেই অভিযান আলো ফেলে ক্যাসিনোর এক অন্ধকার জগতে। একের পর এক ধরা পড়েন যুবলীগের নেতারা, বন্ধ হয়ে যায় ক্যাসিনো। অভিযানের প্রথমদিনেই জানা যায়, ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবের চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি একদিনই সেখানে গেছেন এবং ক্যাসিনোর ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

প্রাথমিকভাবে আমি তার কথা বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছি, হয়তো স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন ক্লাবের চেয়ারম্যান হতে হয় তাকে। হয়তো তিনি ক্যাসিনোর কথা জানতেনই না। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন মতিঝিল এলাকায় একের পর এক ক্যাসিনো আবিষ্কার হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে, তার এলাকায় এতকিছু ঘটে গেল, আর তিনি কিছুই জানেন না, এটা কীভাবে সম্ভব? তারপরও আমি তাকে বেনিফিট অব ডাউট দিয়েছি, ভেবেছি রাশেদ খান মেনন হয়তো আসলেই জানেন না। কিন্তু রিমান্ডে থাকা যুবলীগ নেতা সম্রাট নাকি জানিয়েছেন, রাশেদ খান মেনন ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন। সম্রাট গোপনে র্যাবের কাছে কী বলেছে, সেটাই বিশ্বাস করতে হবে; এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু মতিঝিল এলাকার টানা তিনবারের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা, তাতে পত্রিকায় ছাপা হওয়া এই খবর তারা বিশ্বাস করেছেন।

এর আগেও ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি নিয়ে তার বিরুদ্ধে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। অনেক ভুক্তভোগী সেটা সাংবাদিকদের জানিয়েছেনও। সবমিলে রাশেদ খান মেননকে বিশ্বাস করার মানুষই বরং কম। এখন অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করছেন, রাশেদ খান মেনন যখন বুঝে গেছেন, গ্রেফতার হওয়া সম্রাট বা খালেদ সত্য কথা বললে তিনি ফেঁসে যাবেন। তখনই তিনি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। বরিশালের সেই অনুষ্ঠানে মেনন বলেছিলেন, ‘ক্যাসিনো মালিকদের ধরা হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের ধরা হচ্ছে, কিন্তু দুর্নীতির আসল জায়গা নির্বিঘ্ন আছে। সেই দুর্নীতিবাজদের বিচার কবে হবে, তাদের সাজা কবে হবে, তাদের সম্পদ কবে বাজেয়াপ্ত হবে?’

মনে করার অবকাশ আছে, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি থেকে নিজেকে বাঁচাতেই রাশেদ খান মেনন পাল্টা আক্রমণে গেছেন। আক্রমণই প্রতিরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়।

ছাত্রনেতারা মাস্তানি করবে, যুবনেতারা টেন্ডারবাজি করবে, রাজনীতিবিদরা চাঁদাবাজি করবে; এসবই আমাদের এখানে স্বাভাবিক। কিন্তু সেই নেতাটা যখন হন রাশেদ খান মেনন; তখন আমরা কষ্ট পাই, বিশ্বাস করতে চাই না। রাশেদ খান মেনন ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নেন বা ভিকারুননিসায় ভর্তির জন্য টাকা নেন; এটা বিশ্বাস করলে আসলে নিজেকেই পরাজিত মনে হয়। কারণ রাশেদ খান মেনন ছাত্রজীবন থেকে আমাদের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে সামনের কাতারে ছিলেন। সারাজীবন বাম রাজনীতি করা রাশেদ খান মেননের স্খলন আসলে রাজনীতির ওপরই আমাদের বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো সত্য হলে পাল্টে লিখতে হবে, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে।

এইচআর/বিএ/পিআর

হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো সত্য হলে পাল্টে লিখতে হবে, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে

সবাই তার কথা বিশ্বাস করছে। কিন্তু সবারই প্রশ্ন, নির্বাচনের ১০ মাস পর কেন রাশেদ খান মেনন এই কথা বলছেন? তাকে ফ্রুটিকা খাওয়াল কে?

কিন্তু রিমান্ডে থাকা যুবলীগ নেতা সম্রাট নাকি জানিয়েছেন, রাশেদ খান মেনন ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন