বাইশ গজে রাজনীতির বাউন্সার কাম্য নয়

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯

নতুন বছরে ক্রিকেটের বাইশ গজে রাজনীতি আর কূটনীতির বাউন্সার এবং বিমার সম্ভবত অনেক বেশি দেখবেন ক্রিকেটানুরাগীরা। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট বৈরিতা নতুন কিছু না। সেটা রাজনৈতিক কারণে। এবং দেশ দুটোর জন্মের পর থেকেই। তার আঁচ দুদেশের ক্রিকেটের গায়েও লেগেছে। দু'দেশের দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজ বন্ধ রয়েছে দশকের পর দশক। আবার মাঝে মাঝে ক্রিকেট কূটনীতিতেই বৈরিতার সেই বরফ গলানোর চেষ্টা হয়েছে। কখনো কখনো মনে হয়েছে 'ক্রিকেট' কূটনীতির বড় এক হাতিয়ার। কিন্তু রাজনীতির বাউন্সারে রক্তাক্ত হয়েছে ক্রিকেট। রাজনীতিবিদরা রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়েছেন ক্রিকেটকে। সেটা ভারত-পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে সংক্রমিত হয়েছে ক্রিকেট গ্রহের বিভিন্ন দেশে!

কেপটাউন থেকে কলম্বো। ক্যানবেরা থেকে ঢাকা। ক্রিকেট রাজনীতির ছোঁয়া লেগেছে সব জায়গায়। আইসিসি যখন অভিজাতদের ক্লাব থেকে মধ্যবিত্তের হাতে চলে আসে গেলো শতাব্দির শেষ দিকে। জগমোহন ডালমিয়া প্রেসিডেন্ট হলেন। সবাইকে টেক্কা দিয়ে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকাকে সঙ্গী করে দ্বিতীয় বার উপমহাদেশে বিশ্বকাপ নিয়ে এলেন। তখন শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত দেশ সেখানে খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানালো! বিষয়টা আপাত দৃষ্টিতে ছিল নিরাপত্তাজনিত কারণ। তাহলে ইতিহাসের বুকে প্রশ্ন থেকে যায়; বাকি দেশগুলো সেখানে বিশ্বকাপ খেললো কিভাবে?

আবার আইসিসির নক আউট টুর্নামেন্ট যেটা পরিচিতি পেয়েছিল ' মিনি বিশ্বকাপ' হিসেবে, সেটা যখন ঢাকায় আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ, তখন বন্যার ধুয়া তুলে অনেকগুলো দেশ প্রথম দিকে খেলতে আসার ব্যাপারে নিমরাজি ছিল। ক্রিকেট কূটনীতির সৌজন্যে শেষ পযর্ন্ত সেই ঐতিহাসিক টুর্নামেন্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো। এরপর বিশ্ব একাদশ আর এশিয়া একাদশ নামের একটা প্রদর্শনী ম্যাচও হলো সেই ঢাকায়।

এরপর ক্রিকেট রাজনীতি আর কূটনীতির সফল যুগলবন্দীতে বার দুয়েক অনুষ্ঠিত হলো ভারত এবং সাউথ আফ্রিকায় আফ্রোশিয়া কাপ। সেখান মহাত্মা গান্ধী আর নেলসন ম্যান্ডেলার নাম জড়ানো ছিল। কিন্তু পরর্বতীতে সেই আফ্রো এশিয়া ক্রিকেট জোটের মৃত্যু ঘটে। টুর্নামেন্টেরও ইতি ঘটে। এই শতাব্দির গোড়ার দিকে সুনামী আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ক্রিকেটকেই বেছে নিলেন ক্রিকেট কর্তারা। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব একাদশ আর এশিয়া একাদশের ম্যাচ। শচীন-লারার মত তারকারা দাঁড়ালেন আর্ত মানবতার পাশে। হাতিয়ার সেই ক্রিকেট।

আবার কাশ্মীর সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান গোলাগুলি। ওয়াগা সীমান্তে সাজোয়া ট্যাংকের মহড়া। কারগিল যুদ্ধ সব মিলিয়ে দু'দেশের ক্রিকেট আবহ বদলে গেলো। তার মধ্যে দিয়ে কিন্তু ভারত-পাকিস্তান আইসিসির টুনার্মেন্টে মুখোমুখি হলো। কিন্তু নিজেদের মধ্যে আবার দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ। এমন কী এখন তারা ক্রিকেট মাঠে একজন আরেকজনের বিপক্ষে কেন, এক সঙ্গে এক দলেও খেলতে চান না! সেখানেও প্রয়োজন দু'দেশের রাজনীতিবিদ আর কূটনীতিবিদদের অনুমোদন! বাইশ গজের যুদ্ধ বা লড়াই এখন দুদেশের রাজনীতিবিদের লাভ-লোকসানের হিসেবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

মুজিব বর্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে দুটো প্রদর্শনী টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। সেটা এশিয়া একাদশ আর বিশ্ব একাদশের ম্যাচ হবে। তবে সেখানে এশিয়া একাদশে কোন পাক ক্রিকেটার থাকছেন না। কিন্তু কেন? তা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি করেছে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড। পিসিএল এর কারণে পাক ক্রিকেটাররা আসতে পারবেন না। সেটা আগেই আয়োজকদের জানিয়েছেন পিসিবি। কিন্তু আগ বাড়িয়ে বিসিসিআই এর দু' একজন কর্মকর্তা বলছেন, এশিয়া একাদশে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা থাকলে, কোন ভারতীয় ক্রিকেটার খেলবেন না!

ভারত প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের বন্ধু। ক্রিকেটেও ভারত বাংলাদেশের বন্ধু। তবে ক্রিকেট মাঠে পাকিস্তান বাংলাদেশের শত্রু সেটা ভেবে কেউ ক্রিকেট মাঠে নামেন না। আর দশটা প্রতিপক্ষের মত পাকিস্তানকেও বাংলাদেশ প্রতিপক্ষই মনে করে। আগামীতেও তাই থাকবে।কিন্তু আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড যেভাবে হুমকি-ধামকি দিতে শুরু করেছেন সেটা অনেক বেশি অসৌজন্যমূলক।

শ্রীলংকা দুই টেস্ট সিরিজ খেলে যাওয়ার পরই পিসিবি সভাপতি বলেছেন; বাকি বিশ্বকে প্রমাণ করতে হবে, পাকিস্তান কেন অনিরাপদ!’ পাকিস্তান নিরাপদ সেটা কী শুধু লংকার দুই টেস্টেই প্রমাণিত! বাংলাদেশ যদি বলে, আগে নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরিবর্তে লাহোর-করাচি- ইসলামাবাদ-মুলতানে খেলান, তারপর বাংলাদেশ পাকিস্তানে টেস্ট খেলবে! আবার ওদের যখন দুবাই-শারজা-আবু ধাবিতে টেস্ট খেলালেন, তখন কেন বাংলাদেশকে ডাকলেন না! উত্তরটা পিসিবিকেই দিতে হবে।

তবে রাজনীতি-কূটনীতির চাল ক্রিকেটের বাইশ গজে না দেয়া ভাল। এমনিতেই ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড আবার জোটবদ্ধ হচ্ছে 'সুপার সিরিজ' নিয়ে। তাহলে বাকি বিশ্বকে একজোট হওয়া ছাড়া উপায় কী আছে। কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড যেভাবে এখনই মনে করছেন আইসিসি পুরোপুরি স্পোর্টিং উইকেট হয়ে গেছে।সবাই সমান।সেটা ভাবার কোন আপাত কারণ দেখা যাচ্ছে না। সেটা যতোই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হোক না কেন!

ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের সুপার সিরিজের পক্ষে এখনই ব্যাট হাতে নেমে পড়েছেন সাবেক এক ইংলিশ অধিনায়ক। মাইকেল ভনের দাবি; আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে টেস্ট প্লেয়িং দলগুলোর পুরোপুরি শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটছে না! প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না! তাহলে আগামীতে কী সৌরভ গাঙ্গুলির সুপার সিরিজ চিন্তাই আইসিসিতে বিভাজনের রেখাটা টেনে দেবে?

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/পিআর

রাজনীতি-কূটনীতির চাল ক্রিকেটের বাইশ গজে না দেয়া ভাল। এমনিতেই ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড আবার জোটবদ্ধ হচ্ছে 'সুপার সিরিজ' নিয়ে। তাহলে বাকি বিশ্বকে একজোট হওয়া ছাড়া উপায় কী আছে। কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড যেভাবে এখনই মনে করছেন আইসিসি পুরোপুরি স্পোর্টিং উইকেট হয়ে গেছে।সবাই সমান।সেটা ভাবার কোন আপাত কারণ দেখা যাচ্ছে না। সেটা যতোই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হোক না কেন!

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]