দুই সিটির নির্বাচন : বইছে পাল্টাপাল্টি কথার ঝড়

বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২০

সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে এখনো তেমন আগ্রহ বা উত্তেজনা দেখা না গেলেও নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে। নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতারা যেমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি করছেন , তেমনি নির্বাচন কমিশনও বিতর্কের বাইরে থাকছে না। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে।

৩০ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়েছে। সেদিন হিন্দু সম্প্রদায়ের সরস্বতীপূজা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাড়াও অনেকে বাড়িতেও সরস্বতীপূজা করে থাকেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের এমন একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন কেন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো? দুচার দিন এগিয়ে পিছিয়ে নির্বাচনটা করলে কি ক্ষতি হতো বা ৩০ জানুয়ারি হলে কি বিশেষ লাভ হবে, সেটা যদি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করে বলা হতো, তাহলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হতো। অহেতুক বিতর্কে জড়াতে নির্বাচন কমিশন বুঝি পছন্দ করে।

এর আগে রংপুরের এক নির্বাচনেও এমন করেছে। তারিখ ঘোষণার আগে তারা হয় কোনো হোমওয়ার্ক করেন না, নতুবা তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের হিসাবের মধ্যে ধরার গরজ বোধ করেন না।। নির্বাচন কমিশনে তো এখন একজন বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিও আছেন। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার অনেক বিষয়েই অন্য কমিশনারদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন এবং সেটা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমকে জানাতেও ভুল করেন না ।

তো, সরস্বতীপূজার দিন নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি আপত্তি তুললেন না কেন? নাকি হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত ভোটারদের নিয়ে তিনিও আগ্রহ বোধ করেন না। যেমন করছে না বিএনপিও। বিএনপি নেতারা কত বিষয়ে কত কথা বলছেন প্রতিদিন কিন্তু এব্যাপারে মুখে কুলুপ আঁটা। সদা সোচ্চার গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও এনিয়ে রা-টি করছেন না! মুসলমানদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন কি কোনো নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে কি তা মেনে নেওয়া হতো? বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলেই কি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি উপেক্ষা করা সঙ্গত মনে করা হবে? ধর্ম নিয়ে হিন্দুদের কি কোনো ‘অনুভূতি’ নেই?

যাক, হিন্দুদের ভোট দেওয়া না দেওয়ায় হয়তো সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কিছু যাবে আসবে না। হিন্দু ভোটার আর কত? তবে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন কেমন হবে, সব ভোটার তার নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে অবাধে ভোট দিতে পারবে কিনা, সেটা নিয়েও সংশয় আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। তারা চাইবে না তাদের প্রার্থীদের পরাজয়। বরং এবার নির্বাচনে জেতার জন্য আওয়ামী লীগ বেশি সিরিয়াস। ক্ষমতায় আছে বলে জয় সহজ হবে, এটা হয়তো দলটি মনে করছে না। তাই দুই সিটির নির্বাচন পরিচালনার জন্য দুইজন সিনিয়র জাঁদরেল নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণে আমির হোসেন আমু এবং উত্তরে তোফায়েল আহমেদ। তারা দুই জনেই সংসদ সদস্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা তাদের নির্বাচনী কাজে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন। কারণ সিটি করপোরশন নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নির্বাচনের প্রচার বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় আছেন প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ,উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার পদে থাকা ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র। তারা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হলে ভোট দিতে পারবেন কিন্তু প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।

এই বিধিমালা মানতে আওয়ামী লীগের অনীহা আছে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থেকে বক্তব্য দিতে পারবেন, ঘরে বসে নির্বাচনের কৌশল ঠিক করতে পারবেন কিন্তু ভোট চাইতে পারবেন না।

আচরণবিধি নিয়ে নির্বাচন কমিশন এবং আওয়ামী লীগের বিরোধ বড় কোনো সংকটের জন্ম দেবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ যেমন নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য খুব একটা আমলে নেবে না, তেমনি নির্বাচন কমিশনও এনিয়ে শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে না। আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রায় সবাই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তির তালিকায় পড়েন। অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কেউ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তারা অতি গুরুত্বপূর্ণ নন। ফলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য শীর্ষ নেতারা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেও আওয়ামী লীগের সমপর্যায়ের নেতারা সে সুযোগ বঞ্চিত হবেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ এবার বিএনপি না তুলে হয়তো আওয়ামী লীগই তুলবে। তার লক্ষণ এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে দেন-দরবার শুরু করেছেন। আবার দুই দলের নেতারাই পরস্পরের বিরুদ্ধে কথার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জনপ্রিয়তার দাবি দুই পক্ষ থেকেই করা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব এক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছেন। তাদের পক্ষে নাকি শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের সমর্থন আছে! যদি দাবি সত্য হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে আছে কি করে?

বিএনপি হয়তো বলবে পুলিশ-মিলিটারির জোরে! তাই কি? আওয়ামী লীগের যে নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠী তারাও কি এখন বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে? বিএনপি নেতাদের এসব বাগাড়ম্বরের কারণেই দলটিকে পিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। একদিকে তারা জনপ্রিয়তার দাবি করছে, অন্যদিকে বলছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। তারা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মুখোশ উন্মোচনের জন্যই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যের মধ্যেই ভিন্নতা আছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করছে জয়লাভের জন্য আর বিএনপি প্রমাণ করতে চায় এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটা। আসন্ন নির্বাচনে দুই পক্ষের লক্ষ্যই পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে। জিতবে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আর নির্বাচন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ পাবে বিএনপি। মাঝখানে চলবে পরস্পরবিরোধী বক্তৃতার প্রতিযোগিতা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে মাঠে নেমে জনপ্রিয়তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আপনি (মির্জা ফখরুল) নিজে এমপি হয়ে পদত্যাগ করে একটি নাটক করেছেন। আপনি যদি চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে বলবো, আমাদের মন্ত্রী-এমপির প্রয়োজন হবে না। আমাদের দুইজন (শেখ ফজলে নূর তাপস এবং আতিকুল ইসলাম) ক্লিন ইমেজের মেয়র প্রার্থীই যথেষ্ঠ আপনার এবং বিএনপি নেতাদের ক্যাম্পেইন মোকাবেলার জন্য'।

প্রধান দুই দলের প্রার্থীরাই প্রচারণা শুরু করেছেন। প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব সম্মত বা বাস্তবায়নযোগ্য কিনা তা-ও হয়তো ভাবা হচ্ছে না। বিএনপি প্রার্থী ইশরাক হোসেন এবং তাবিথ আওয়াল নাগরিক সমস্যা সমাধানের যে কথা বলছেন, কীভাবে সেটা করবেন, তা বলছেন না। দুই সিটিতে বিএনপি মেয়র পেলেও সরকার থাকবে আওয়ামী লীগের। সরকারের সহযোগিতা না পেলে তারা কীভাবে পরিবর্তন ঘটাবেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন, অর্থের উৎস কী হবে, তা পরিষ্কার করে তারা বলতে পারবেন কি?

ভোটারদের বিবেচনা বোধ নিশ্চয়ই ভোটের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, সরকারের ওপর মানুষের সমর্থন না কমে বেড়েছে। দেশের অবস্থা নিয়ে বড় অসন্তোষ নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হোক– এটা মানুষ চায় না। তরুণ সমাজের মধ্যেও স্বস্তির ভাব লক্ষণীয়। তাহলে সিটি নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভোট-বিপ্লব হওয়ার দাবি কি বাস্তব সম্মত? বিএনপি কথার ঝড়ে বাজিমাত করতে চাইলে সুফল পাবে বলে মনে হয় না।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এইচআর/এমকেএইচ

আচরণবিধি নিয়ে নির্বাচন কমিশন এবং আওয়ামী লীগের বিরোধ বড় কোনো সংকটের জন্ম দেবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ যেমন নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য খুব একটা আমলে নেবে না, তেমনি নির্বাচন কমিশনও এনিয়ে শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে না। আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রায় সবাই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তির তালিকায় পড়েন। অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কেউ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তারা অতি গুরুত্বপূর্ণ নন। ফলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য শীর্ষ নেতারা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেও আওয়ামী লীগের সমপর্যায়ের নেতারা সে সুযোগ বঞ্চিত হবেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]