লঞ্চ দুর্ঘটনার শেষ কোথায়?

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ এএম, ০১ জুলাই ২০২০

একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সব আশাভরসা এক পলকে শেষ হয়ে যায়। শেষ হয়ে যায় পরিবারের ভবিষ্যৎ। গত সোমবার রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে নিখোঁজ রয়েছে আরও বেশ কিছু মানুষ। উদ্ধারে তৎপরতা চালাচ্ছেন নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

আমাদের জীবন যেন আজ কিছুতেই নিরাপদ নয়। একের পর এক বিপদাপদ ধেয়ে আসছে। একদিকে বিশ্বময় মহামারি করোনা সবার জীবনকে ওলট-পালট করে দিয়েছে অপরদিকে বিভিন্ন দুর্ঘটনা যেন পিছু ছাড়ছে না। মৃত্যু কখন যে আমাদের প্রাণ কেড়ে নেবে তা কেউ বলতে পারে না। সব জায়গায় মৃত্যুর ভয়ালথাবা বিস্তার করে আছে। আজ স্বাভাবিক মৃত্যু যেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবনের আজ কোনো মূল্য নেই। জীবন যেন অতি তুচ্ছ।

বেশ কয়েক বছর ধরে বাসে উঠতে ভয় পাই, কখনজানি বাসটি উল্টে যায় বা আরেক বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ বাঁধে। রেলে যাতায়াত করছি কিন্তু রেলেও দুর্ঘটনা থেকে মুক্ত নয় আর লঞ্চে তো ভয়ে উঠিই না এই ভেবে যে কখন মাঝনদীতে ডুবে মরব। আগে জানতাম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়েছে। কিন্তু এখন তো বুড়িঙ্গায় কোনো প্রতিকূল আবহাওয়া বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে এই লঞ্চডুবি ঘটেনি, ঘটেছে দুটি লঞ্চের সংঘর্ষের কারণে। এটাকে দুর্ঘটনা তথা দৈব-দুর্বিপাক বলার কোনো সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। দিনে দুপুরে একটি লঞ্চ পেছন থেকে এসে মেরে দিয়ে এতগুলো প্রাণ কেড়ে নিল, এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ ছাড়া দিনের বেলায় যদি এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? কোনো বাহনই তো দেখছি আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। প্রতিনিয়ত আমাদের শুধু দেখতে হচ্ছে স্বজনদের আহাজারি। বাস, ট্রেন, লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত্যু যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না এসব দুর্ঘটনা। সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশের মানুষের ৩৫ ভাগ যাতায়াতই সম্পন্ন হয় নৌপথে। আর এই নৌপথেই লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর মারা যায় শত-শত মানুষ।

বুড়িগঙ্গার লঞ্চ দুর্ঘটনার বিষয়ে নৌপরিবহন অধিদফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীর মঙ্গলবার সকালে (৩০ জুন) বলেন, ‘আমি গতকাল (সোমবার) দুর্ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সিসিটিভির একটা ফুটেজও দেখেছি। যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যানালাইসিস করার চেষ্টা করি? এটি কীভাবে ঘটল? প্রাথমিকভাবে দেখতে চাইলাম, ডুবে যাওয়া লঞ্চের সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন ঠিক ছিল কিনা। এদিক দিয়ে আমরা কোনো সমস্যা পাইনি। সব ঠিক ছিল।’

তিনি বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনার পেছনে অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। বৈরি আবহাওয়া হতে পারে, নির্মাণ ত্রুটি হতে পারে, ইকুইপমেন্ট ফেইলিওর হতে পারে। তদন্তে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিষয়টি উঠে আসে।’

তিনি আরও বলেন, গতকালের (সোমবার) দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এই দুর্ঘটনায় উপরের কোনো কারণই কাজ করেনি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে ওখানে (ময়ূর-২ লঞ্চ) মাস্টার ও অন্যান্য যারা কাজ করেছেন তাদের ‘হিউম্যান ফেইলিওর’। দুর্ঘটনার অবস্থায় ‘সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস’ ওই পার্টিকুলার পরিস্থিতিতে সে তার দায়িত্বটা হ্যান্ডেল করতে পারেনি, আমার কাছে এটা মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় ময়ূরের মূল মাস্টার নয় একজন শিক্ষানবিশ মাস্টার চালাচ্ছিলেন বলে আমরা শুনেছি। আমাদের পক্ষে এই মুহূর্তে এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল, তবে তদন্তে হয়তো পুরো বিষয়টি উঠে আসবে।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া নদীর পাশের একটি সিসি ক্যামেরায় ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির ময়ূর-২ ও অপেক্ষাকৃত অনেক ছোট মর্নিং বার্ড পাশাপাশি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। খানিকটা এগিয়েই ময়ূর-২ ‘মর্নিং বার্ড’ এর ওপর উঠে যায় এবং উল্টে গিয়ে তলিয়ে যায় যাত্রীবোঝাই লঞ্চটি। সেই ভিডিও দেখে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘যেভাবে ঘটনা ঘটেছে, আমার মনে হয়েছে এটা পরিকল্পিত। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড।’ (সূত্র: জাগো নিউজ)

যাতায়াতে সবচেয়ে আরামদায়ক ও নিরাপদ মনে করা হয় নৌপথকে। তবে মাঝে মাঝে এ পথেও দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যান্ত্রিক ত্রুটি, মুখোমুখি সংঘর্ষ ও চালকের অসাবধানতাসহ বিভিন্ন কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু বুড়িগঙ্গার এ লঞ্চডুবির ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতি বছর আমাদের দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে অনেক যাত্রীর। তেমনই কিছু লঞ্চ দুর্ঘটনা-

২০০০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঈদুল আজহার রাতে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল এলাকায় মেঘনা নদীতে এমভি জলকপোত ও এমভি রাজহংসী নামের দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারায় রাজহংসীর ১৬২ যাত্রী।

২০০২ সালের ৩ মে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনায় ডুবে যায় সালাহউদ্দিন-২ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ। ওই দুর্ঘটনায় ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার ৩৬৩ যাত্রী মারা যান।

২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঢাকা থেকে লালমোহনগামী এমভি নাসরিন-১ চাঁদপুরের ডাকাতিয়া এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাইয়ের কারণে পানির তোড়ে তলা ফেটে যায়। এতে প্রায় ২ হাজারের বেশি যাত্রীসহ এটি ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় ১২৮ পরিবারের প্রধানসহ সরকারিভাবে ৬৪১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে লাশ উদ্ধার করা হয় প্রায় ৮০০।

২০০৪ সালের ২২ মে আনন্দবাজারে এমভি লাইটিং সান লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৮১ জন এবং ও এমভি দিগন্ত ডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া ভৈরবের মেঘনা নদীতে এমএল মজলিসপুর ডুবে ৯০ জনের মৃত্যু হয়।

২০০৬ সালে মেঘনা সেতুর কাছে এমএল শাহ পরাণ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা যায়।

২০১১ সালের ২৮ মার্চ চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেড এলাকায় মেঘনা নদীতে দুটি লঞ্চের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় এমভি কোকো-৩ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ।

২০১৪ সালের ১৫ মে মুন্সীগঞ্জের কাছে মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ ডুবে যাওয়ার পর অন্তত ২২ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুইশর বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ঢাকা থেকে শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের দিকে যাচ্ছিল।

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট পদ্মায় স্মরণকালের ভয়াবহ নৌদুর্ঘটনায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ২১ জনকে শিবচর পৌর কবরস্থানে অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করা হয়।

২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় বালুবাহী একটি কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে যায়। লঞ্চটি তাৎক্ষণিকভাবে তীরের ধারে নেয়ায় দুই শতাধিক যাত্রী প্রাণে বেঁচে যায়।

২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর ওয়াপদা চেয়ারম্যান ঘাটের টার্মিনালে তীব্র স্রোতে ডুবে যায় তিনটি লঞ্চ। এতে একই পরিবারের তিন জনসহ লঞ্চ স্টাফ ও যাত্রীসহ ২২ জন লোক ছিল।

২০১৯ সালের ২২ জুন মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে এমভি রিয়াদ নামের একটি লঞ্চের তলা ফেটে অর্ধেক পানিতে ডুবে যায়। লঞ্চের তলা ফেটে পানি উঠতে শুরু করলে অন্য ট্রলার গিয়ে লঞ্চযাত্রীদের উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে যায়।

সর্বশেষ সোমবার (২৯ জুন ২০২০) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফরাশগঞ্জ ঘাট সংলগ্ন কুমিল্লা ডক এরিয়ায় ময়ূর-২ লঞ্চ পেছনের দিকে ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। সর্বশেষ সংবাদ পাওয়া পর্যন্ত পুরুষ, নারী ও শিশুসহ ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

দেখা যায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে অসতর্কতার অনেক কারণ পাওয়া যায় আর অসতর্কতার ফলেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে আর কত মানুষের প্রাণ যাবে? ভবিষ্যতে দুর্ঘটনায় আর যেন কোনো প্রাণহানি না ঘটে সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে। বুড়িগঙ্গার এই মর্মান্তিক লঞ্চডুবির ঘটনার পেছনে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, সবার পথচলা হোক নিরাপদ ও শান্তিময়।

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]