বঙ্গবন্ধুর কঠিন ব্রতের সহায়ক ছিলেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩১ এএম, ০৮ আগস্ট ২০২০

শামীমা আক্তার তন্দ্রা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্যটা আমরা উপহার পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদের প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা আদৌ এই বাংলাতে আর জন্ম নেবে কিনা সেটা সন্দেহের বিষয়। ছেলেবেলা থেকেই তিনি একজন প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন। আমৃত্যু তিনি দেশের মানুষের কল্যাণে সংগ্রাম করে গিয়েছেন। এই মা, মাটির কল্যাণের জন্যই তিনি বহুবার কারাবরণ করেছিলেন। প্রতিটি পুরুষের ভালো কাজের পিছনে একজন না একজন নারীর ভূমিকা থাকে। নজরুল তাঁর 'নারী' কবিতায় বলেছেন-

'পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর'।

ঠিক এমনইভাবে বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পিছনে একজন নারীর ব্যাপক ভূমিকা ছিল। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সঙ্গী,সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (৮ আগস্ট ১৯৩০-১৫ আগস্ট ১৯৭৫)। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ফার্স্ট লেডি। ফজিলাতুন্নেছার শৈশবের সঙ্গী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দু'জনে একই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পিছনে যার অবদান অনস্বীকার্য, তিনি হচ্ছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

এই মহীয়সী নারী জন্মেছিলেন আগস্ট মাসের ৮ তারিখে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের এদেশীয় দোসরদের কারণে তিনি পরিবারসহ জীবন দিয়েছিলেন আগস্ট মাসেরই ১৫ তারিখে। বঙ্গমাতার পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক যশোরে কো-অপারেটিভ ডিপার্টমেন্টে অডিটর পদে চাকরি করতেন। প্রথম কন্যা বেগম জিনাতুন্নেছা, ডাকনাম জিন্নি ৫ বছর এবং কনিষ্ঠ কন্যা ২ বছর বয়সী ফজিলাতুন্নেছা, ডাকনাম রেণুকে রেখে পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং পরে মাতা হোসনে আরা বেগম মৃত্যুবরণ করেন। পিতৃ-মাতৃহারা হয়ে শিশু ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান আর মাতা সায়েরা খাতুনের আদর-যত্নে বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গে খেলার সাথী হয়ে বড়ো হয়েছেন।

বঙ্গমাতা ১৩ বছর বয়সে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় 'বিয়ে কী তা তো বুঝলাম না। শুনলাম রেণুর দাদা আমার আব্বাকে এক রকম হুকুম জারি করেছিলেন। মুরব্বিরা তাঁর কথা অবহেলা করার অবকাশ পাননি। সুতরাং বিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়ে গেল। ' ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুর স্কুল জীবনের সাথী হলেও প্রকৃত জীবন সাথী হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাস করার পর। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, তাঁদের বিয়ের ফুলশয্যা হয়েছিল ১৯৪২ সালে।

দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় সফল হয়ে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর সাথেই তার রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের দুটি ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণের সাথে বঙ্গমাতা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। এই মামলায় বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তানে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেও গ্রেফতারের হুমকি দেয়। পাকিস্তান সরকার এ সময় লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্তে বেঁকে বসেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গমাতা প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানান। পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ।

পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। বঙ্গমাতা কারাগারে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর বৈঠকে যেতে নিষেধ করেন। ফজিলাতুন্নেছার পরামর্শে শেখ মুজিব অনড় থাকেন। গণ অভ্যুত্থানের মুখে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি তাদের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়। বঙ্গমাতার অনন্যসাধারণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের নেপথ্যে বঙ্গমাতার সঠিক পরামর্শ ছিল।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি নির্মাণের পিছনে বঙ্গমাতার অনেক কষ্ট ও শ্রম আছে। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময় অনেকবার বঙ্গমাতাকে বাসা বদল করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বঙ্গমাতার অবদান উদ্ভাসিত হবেই। বঙ্গমাতা জানতেন কীভাবে একটা সংসারকে সামলাতে হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১২ বছর জেলে কাটিয়েছেন। সে সময় বঙ্গমাতা সংসারের সকল ভার বহন করেছেন। সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে তদারকি করেছেন।

শুধু তাই নয় একজন নারী হয়েও তিনি সে সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গমাতার মাঝে সবসময়ই প্রকাশ পেত একজন মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু বাইরে থাকাকালীন সময়ে ফজিলাতুন্নেছা বিভিন্ন রকমের বই পড়তেন, গান শুনতেন। বঙ্গমাতা অত্যন্ত ধৈর্যশীল মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর 'অসামাপ্ত আত্মজীবনী ' এবং লেখার মূল উৎসাহ ছিল বঙ্গমাতার। এককথায় শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে প্রধান অবলম্বন ছিলেন তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা। অন্তরের সবটুকু নির্যাস দিয়ে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলেন। সংসারের শুরু থেকেই বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর খাবারের প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন।

একজন আদর্শবান স্ত্রীর সকল বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান একাধিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সাথে পরামর্শ করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ও যুদ্ধকালীন তিনি তাঁর সন্তানদের বুকের মাঝে আগলে রেখেছেন। চারদিকে বৈরি পরিবেশ যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ এরমাঝে সমস্ত দেশের দায়িত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুর উপর। সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেনাপতিকে পিছন থেকে সাহস যুগিয়েছেন তিনি আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গমাতা একে অপরের সাথে এমনভাবে জড়িত ছিলেন যে,কাউকে আলাদা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। ফজিলাতুন্নেছা তিন বছর বয়স থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে মৃত্যু পর্যন্ত একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।

' দেবী নহি,নহি আমি সামান্যা নারী
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্ব,সে নহি নাহি
হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে,সে নহি নহি
যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সংকটে, সম্পদে
দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতের সহায় হতে
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।'

রবীন্দ্রনাথের 'চিত্রাঙ্গদা'র এই কয়টি লাইনের ভাবার্থ সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয় আমাদের বঙ্গবন্ধু ও জীবনে।বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পিছনে বঙ্গমাতার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ৮ আগস্ট এই মহীয়সী নারীর জন্মদিন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই মহীয়সী নারীর জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। নবীন প্রজন্মের সকল নারীর নিকট আহ্বান থাকবে যে, বঙ্গমাতার আদর্শকে তারা যেন নিজের মধ্যে ধারণ করে। বঙ্গমাতার আদর্শকে প্রতিটি নারী তার নিজের মধ্যে ধারণ করলে এদেশ আরো দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে।

লেখক : তরুণ কলামিস্ট, সদস্য , বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, সাবেক শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]