১৬ ইতিহাস কন্যা: পিতা শেখ মুজিব ঠিকানা ধানমন্ডি ৩২

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

জিনান বিনতে জামান

মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতিবাচক যে বিষয়গুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম “যুদ্ধ”। যুদ্ধ মানে শুধু দুটি পক্ষের হার-জিতের প্রশ্ন নয়, বরং এর সাথে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি জড়িত, তা হলো মানবতার বিপর্যয়। যুদ্ধে যে পক্ষই জিতুক বা হারুক এতে মানুষের বাহ্য জগতের পাশাপাশি অন্তর্জগতের যে বিপুল পরিমাণ ক্ষয় হয় তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সেদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিষয়টি অনেকটাই আলাদা। নিজ ভূমি আর তা পরিচলনার অধিকারের দাবি করায় একটি একপাক্ষিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল না হলেও খুব স্বাভাবিকও নয়। সুসজ্জিত একদল পাকিস্তানী সেনার সামনে নিরস্ত্র সাত কোটি বাঙালি যেন ক্ষুধার্ত বাঘের খাঁচায় অসহায় হরিণ শাবক!

নয় মাসের সুদীর্ঘ যুদ্ধে শত্রুসেনারা পরাভূত হলেও তাদের ধ্বংসযজ্ঞ বাংলার ভৌত অবকাঠামোর মতোই সামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক জগতে কিছু গভীর ক্ষতের জন্ম দেয় যার মাঝে সবচেয়ে বড় ক্ষত- ইতিহাসের বিস্মৃত সাহসিকা কন্যারা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যাদের প্রাপ্য সম্মান দিয়ে উঠতে পারেনি এই পঞ্চাশ বছর পরেও, বঙ্গবন্ধু যাদের নাম দিয়েছিলেন “বীরাঙ্গনা”। যুদ্ধে নারীর ওপর সহিংসতা যেন এক চিরাচরিত বিষয়। দৈহিকভাবে দুর্বল নারী নানা সুযোগে সমাজে কাপুরুষের লোলুপতার শিকার হয়েছে সবসময়। কিন্তু যুদ্ধকালে এ কাপুরুষেরাই বিপক্ষ শক্তিকে পরাস্ত করতে নারী ধর্ষণকে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

শুধু প্রাগৈতিহাসিক বর্বর যুগেই নয়, আধুনিক বিশ্বেও এর প্রকোপ বেড়েছে বৈ কমেনি। উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথাই ধরা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত রেড আর্মি জার্মানিতে প্রবেশ করেই ব্যাপক হারে জার্মান নারীদের ধর্ষণ করতে থাকে। প্রায় বিশ লক্ষ জার্মান নারী এ সময় ধষর্ণের শিকার হয়। এদের মধ্যে প্রচুর নারী ষাট থেকে সত্তর বারও গণধর্ষণের শিকার হয় বলে জানা যায়।

এসব ধর্ষণের ফলে আনমানিক দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার জার্মান নারী মৃত্যু বরণ করেন। বারো বছর বয়সী শিশুও এ ধর্ষণ থেকে মুক্তি পায়নি। এ যুদ্ধেই আমরা দেখি শুধু ইহুদি ধর্মানুসারী হওয়ার অপরাধে জার্মান বাহিনীও পোল্যান্ড আক্রমণের পর বহু পোলিশ ইহুদী নারীকে নিবিচারে ধর্ষণ করে।

কোরীয় যুদ্ধের সময় কম্যুনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী নারীদের ঘৃণ্য ধর্ষণের শিকার হতে দেখা যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের দ্বারা বহু ভিয়েতনামী নারীকে ধর্ষিত হতে হয়েছে। এমনি বুলগেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম, ফ্রান্স-আলজেরিয়া যুদ্ধ, রুশ- জাপান যুদ্ধ এগুলোর যেটির কথাই বলা হোক না কেন ধর্ষণ থেকে নারীর নিস্তার মেলেনি। যুদ্ধে মৃত্যু হলে তাৎক্ষণিক যন্ত্রনার বিনিময়ে শহীদের মর্যাদা পায় একজন ব্যক্তি মানুষ। অন্যদিকে যুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হলে সারাজীবন জীবন্মৃত হয়ে নিজেকে আড়াল করে সামাজিক অস্পৃশ্যতার অতলে হারিয়ে যান একজন নারী।

এ ক্ষত কতটা গভীর তার একটি উদাহরন প্রাক্তন জার্মান চ্যানেলর হেলমুট কোলের স্ত্রী হান্নেলোর কোল। তিনি মাত্র বারো বছর বয়সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গনধর্ষণের শিকার হন। প্রাণে বেঁচে গেলেও আজীবন মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যান তিনি, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ২০০১ সালে আত্মহত্যা করেন।

পাশ্চাত্যের সমাজ আমাদের এতদঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি উদার হওয়ায় সেখানে ধর্ষিতার মানসিক যন্ত্রনার বিষয়টি অনেকাংশেই ব্যক্তিগত; সমাজ ও পরিবার বরং তার প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল, সেখানেই যদি একজন ধর্ষিতা নারী অর্ধশতাব্দী পরেও আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আমাদের আপাত রক্ষণশীল সমাজে পরিস্থিতি কতটা জটিল তা সহজেই অনুমেয়।

দুই.
ঐতিহাসিকভাবেই এ অঞ্চলে যুদ্ধের সহজ শিকার হয়েছে নারীরা। তাইতো মুঘল-মারাঠা যুদ্ধে মারাঠাা পরাজয় নিশ্চিত জেনে রাজমহলে রানীসহ অন্তঃপুরের নারীদের আগুনে আত্মাহুতি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। রক্ষাশীলতা আর তীব্র পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকোপে এ অঞ্চলে যুক্তিহীনভাবেই ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সহানুভূতির বদলে ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। কি আশ্চর্য এ মনোদৈন্য!

শুধু ধর্ষিতাই নয় তার পরিবারকেও অস্পৃশ্যতার দায় ভোগ করতে হয়েছে বিনা অপরাধে। সে কারণে এ একবিংশ শতকে এসেও ধর্ষনের শিকার কোনো মেয়ের খবরটি প্রকাশ্যে আনতে আমরা দ্বিধান্বিত হই। এমনকি শুধু সামাজিক নিগ্রহের ভয়ে ধর্ষিতার পরিবার ধর্ষকের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতেও পিছপা হয়। আজকের এই সমাজ বাস্তবতাই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর ধর্ষণের শিকার বীরাঙ্গনাদের অসহায়ত্ব ও দুরবস্থা।

আমরা অনেকটা প্রচলিত প্রবচনের মতোই বলে থাকি, “দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পেয়েছি স্বধীনতা”- কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই তাই? আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি স্বাধীনতার এতো বছর পরও আমরা এর সঠিক সংখ্যাটি জানিনা। বিভিন্ন সূত্র থেকে এই যুদ্ধকালীন ধর্ষনের শিকার নারীর সংখ্যা পাঁচলক্ষাধিক অনুমান করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা এর বেশি বৈ কম নয়। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি”- গ্রন্থ ছাড়া খুব বেশি উল্লেখযোগ্য কোন প্রামাণ্য গ্রন্থও পাওয়া পায়না স্বাধীনতা সংগ্রামে এই সেনানীদের প্রসঙ্গে। তবে বেশ কিছু গবেষণা হলেও বাঙ্গালি আর বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের এই ধাত্রীকন্যারা রয়ে গেছে বিস্মৃতির অন্তারালেই।

মুক্তিযুদ্ধের পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের ধর্ষণে শিকার নারীদের তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ের ওয়াশিংটন ভিত্তিক বাংলাদেশী সাংবাদিক আনুশেহ হুসাইন বিশ্বখ্যাত Forbes ম্যাগাজিনে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, (প্রকাশকাল: ২১ শে মে, ২০১২)। যেখানে তিনি বাংলাদেশের সুহৃদ অস্ট্রেলিয় চিকিৎসক Geoffrey Davis এর কিছু বক্তব্য তুলে ধরেন। Dr. Davis- যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে International Planned Parenthood Federation (IPPF) ও জাতিসংঘের আহবানে বাংলাদেশে আসেন। তিনি যুদ্ধে ধর্ষিত নারীদের বিলম্বিত গর্ভপাত (Late term abortion) ও যুদ্ধ শিশুদের আন্তর্জাতিকভাবে দত্তক প্রদানের জন্য কাজ করেন।

তৎকালীন পরিস্থিতে নিয়ে Dr. Davis - বলেন, ``...Probably the numbers are very conservative compared with what thay did. The deseriptions of how they captured towns were very interesting. They’d keep the infantry back and put artillery ahead and they would shell the hospitals and schools. And that caused absolute chaos in the town. And then the infantry would go in and begin to segregate the women. Apart from little children, all those were sexually matured would be segregated. And then the woman would be put in the compound under guard and made available to the troops... Some of the stories they told were appalling. Being rapped again and again and again. A lot of them died in those [rape] camps. There was an air of disbelief about the whole thing. Nobody could cedit that it really happend! But the evidence clearly showed that it did happen.

Dr. Davis- এর এই বক্তব্যে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় যুদ্ধে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারকারী নারীদের শোচনীয় অবস্থা খুব সহজেই অনুমেয়। সে সময়ে যুদ্ধে নিগৃহীত নারীদের নিয়ে কাজ করা আরেকজন ব্যক্তির কথাও আনুশেহ তাঁর প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন, তিনি সিস্টার বিনা ডি কস্টা। বীরাঙ্গনা নারীদের নিয়ে ঘনিষ্টভাবে কাজ করা সিস্টার বিনা একটু ভিন্ন চোখে মূল্যায়ন করেন বীরাঙ্গনা ও স্বাধীনতা-উত্তর সমাজ প্রেক্ষাপটকে। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে এ বীর ললনাদের অবদানকে অস্বীকার করার তীব্র প্রবণতাকে তিনি ‘Historical amnesia” বলে ধিক্কার দেন, একই সাথে একে এ জাতির ইচ্ছাকৃত বলেও অভিযোগ করেন।

তিন.
স্বাধীনতার জন্য নিজ সম্ভ্রমের ত্যাগ স্বীকার করে ও স্বাধীন রাষ্ট্রে অবহেলিত নারীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করা হলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে যার ডাকে এ মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম, এতো আত্মত্যাগ সেই মহামানবের ভূমিকা কেমন ছিল এ নারীদের জন্য? এ আলোচনা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক অমোচনীয় দাবি।

বীরাঙ্গনা নারীদের নিজ সম্ভ্রমের সাথে সাথে সমাজ আর পরিবারও যখন তাঁদের ত্যাগ করেছিল তখন তাঁদের পাশে স্বর্গদূতের মতোই আবির্ভূত হন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। এ ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করতে হয়, সময়টা ১৯৭২। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে ছুটে চলেছেন বঙ্গবন্ধু। সে বছরই ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে একটি বাঁধ সংস্কার উদ্বোধনে পাবনার বসন্তপুরে যান বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি মঞ্চে উঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁর পথরোধ করেন একদল নির্যাতিতা নারী। তাঁরা তাঁদের দুদর্শার কথা বললে কোমলপ্রাণ জাতির পিতার মোটা কালো ফ্রেমের চশমার কাঁচও অশ্রুর আদ্রর্তায় ঝাপসা পয়ে ওঠে। তিনি সে নারীদের আশ্বস্ত করে মঞ্চে ওঠেন। সেদিন সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু এ বীর নারীদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের “বীরাঙ্গনা” উপাধিতে ভূষিত করেন। এ নারীদের স্বামী, পিতা এবং পরিবারকে এদের নিয়ে গর্ববোধ করার কথা বলেন। একই সাথে বীরাঙ্গনাদের যথাযথ সম্মানের সাথে সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বঙ্গবন্ধু শুধু একজন ব্যক্তি মানুষই নন বরং তিনি নিজেই এক আদর্শ। তাইতো শুধু মুখের কথাতেই নন, কাজেও তিনি নিজ বচনের প্রতিফলন ঘটান। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সনদে “বীর” শব্দটির পাশাপাশি “বীরাঙ্গনা” শব্দটির উল্লেখ দেখা যায়।

তবুও সামজিক নিগৃহ থেকে যথাযথ মুক্তি মেলেনি বীরাঙ্গনাদের। হাসপাতাল আর পুনর্বাসন কেন্দ্রে বাড়তে থাকে পরিবারত্যাগী বীরাঙ্গনাদের ভীড়। একবার হাসপাতাল পরিদর্শনে এমনই অসুস্থ বীরাঙ্গনাদের দেখে বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন বহুবার বহুজনের পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনেক পরিবার থেকেই তাদের এ নির্যাতিতা কন্যাদের গ্রহণের কোনো সাড়া মেলেনি। তখন বঙ্গবন্ধু পরিবারহীন ভাগ্যাহত বীরাঙ্গনাদের মাথায় হাত রেখে বলেন “আজ থেকে এদের বাবার নাম শেখ মুজিব আর ঠিকানা ধানমন্ডি-৩২”। এই ছিলেন হিমালয়সম হৃদয়ধারী জাতির পিতা, যিনি নিজ সন্তানের মর্যাদায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের।

যুদ্ধে নির্যাতিতা এ নারীদের সন্তান তথা যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দত্তক আইন জারি করেন। এ যুদ্ধশিশুদের দত্তক দেওয়ার জন্য পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, সেন্ট্রাল অরগানাইজেশন ফর রিহ্যাবিলিটেশন ও মাদার তেরেসার মিশনারীজ অব চ্যারিটিজ কাজ শুরু করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশী দম্পতিদের কাছে এ শিশুদের দত্তক নেওয়ার তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায় নি। ফলে বহু বিদেশী নাগরিকের দত্তক সন্তান হিসেবে পরবাসে ঠাঁই মেলে এদেশের ইতিহাসের সূর্যসাক্ষী এসব যুদ্ধশিশুদের।

বঙ্গবন্ধুর তত্ত্বাবধানেই ১৯৭২ সালে যুদ্ধে নির্যাতনের শিকার এ নারীদের জন্য “নারী পুনর্বাসন বোর্ড” গঠন করা হয় । নারী নেত্রী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী আর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে ১১ সদস্য বিশিষ্ট এ বোর্ডের উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিলেন অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম, অ্যাডভোকেট মমতাজ বেগম প্রমুখ। মূলত নারীদের আশ্রয় ও ভাতার ব্যবস্থা করা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করা, তাঁদের সুচিকিৎসা ও তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থাসহ কল্যানমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনার লক্ষ্যে এ বোর্ড কাজ করে। এ বোর্ডের আওতায় বেইলীরোডে উইম্যান ক্যারিয়ার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে সেক্রেটারিয়াল ট্রেনিং, মোহাম্মদপুরে সেলাই ও কারুশিক্ষা প্রশিক্ষণ এবং সাভারে পোল্ট্রি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবেই এসব নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই নয়। বরং ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ভাবেও তিনি হয়েছিলেন বীরাঙ্গনাদের পিতৃতুল্য। যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সহধর্মিনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেসা মুজিব পুনর্বাসন কেন্দ্রের ধানমন্ডি শাখার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাশাপাশি তিনি নিজ উদ্যোগে এ বীরাঙ্গনা কন্যাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন, এর ফলশ্রুতিতে তিনি দশ জন বীরাঙ্গনা কন্যা বিয়ে দেন।

বঙ্গবন্ধু সরকরের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৩৭৩-৭৮) তেও যুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্থ এ নারীদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালে পূর্বগঠিত “নারী উন্নয়ন বোর্ড”-কে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে পুনর্গঠন করে “নারী পুনর্বাসন ও কল্যান ফাউন্ডেশন”-এ রূপান্তর করা হয়। যার কাজ ছিল জেলা ও থানা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো প্রস্তুত, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, নির্যাতিত নারীদের উৎপাদিত পন্যের বাজারজাত করণে বিক্রয় ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। সেই সাথে নারীদের চিকিৎসা ও তাদের সন্তানদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা আরো সম্প্রসারণ করা হয়। একই সাথে এ নারীদের সন্তানদের জন্য “দিবা যত্ন কেন্দ্র” স্থাপনের সিদ্ধান্তটিও এর একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল। ১৯৭৪ সালে পুনর্গঠিত “পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন” এর কার্যক্রমই বর্তমানে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায়- “দুস্থ মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিল” নামে পরিচালিত হচ্ছে।

কালের আবর্তে ইতিহাস পা রাখে এক নিমর্ম কৃষ্ণ অধ্যায়ে। সময়কাল ১৯৭৫। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে শুধু বাঙ্গালির সমৃদ্ধির স্রোতকেই আপাত রুদ্ধ করে দেওয়া হয়নি বরং এ বীরাঙ্গনাদের সামনে এগিয়ে যাওয়াকেও নানা ভাবে ব্যহত করার একটি অপচেষ্টা শুরু হয়। পরবর্তীকালে সেসব সরকার বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় আরোহন করেছে তাদের কারো মাঝেই এ বীর ললনাদের যথাযথ মূল্যায়নের কোন প্রবণতা তেমন একটা লক্ষ্য করা যায়নি। তাই যেন এক নীরব অভিমানে কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছিল এ বীরাঙ্গনাদের নাম, একই সাথে আবারও সামাজিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছিলেন তাঁরা।

তবে ইতিহাসের গতিকে থামিয়ে রাখা দায়। এজন্যই বোধ করি, দীর্ঘ সময় পরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির কর্ণধার হয়ে জাতির পিতার আত্মজা এলেন গণমানুষের নেতৃত্বে - বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে। পিতার প্রতিজ্ঞা ছিল তাঁর রক্তের ধারায়। তাই তিনি ভুলেননি বঙ্গবন্ধু কন্যার মর্যাদা দিয়েছিলেন বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বহারা বীরাঙ্গনাদের, দিয়েছিলেন নিজ আবাসের ঠিকানার অংশীদারিত্ব। তাইতো ২০১৫ সালের অক্টোবরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বীরাঙ্গনাদের “মুক্তিযোদ্ধা” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।

একথা অস্বীকার করার জন্য উপায় নেই যে, তথাকথিত ধর্মীয় বা সামাজিক রক্ষণশীলতার দোহাই দিয়ে যে ইতিহাসকন্যাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল স্বাধীনতার সুফল ভোগ থেকে, অসাম্প্রদায়িক বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু তাঁদের দিতে চেয়েছেন যথাযোগ্য সম্মান আর মর্যাদা। স্বাধীনতার লাল সূর্যটাতে শুধু বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই নয় বীরাঙ্গনাদেরও আছে সমান অধিকার- এ কথার প্রথম স্বীকৃতিদাতা তাই নিঃসন্দেহে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, দর্শন, ঢাকা কলেজ।

এইচআর/এএসএম

স্বাধীনতার লাল সূর্যটাতে শুধু বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই নয় বীরাঙ্গনাদেরও আছে সমান অধিকার- এ কথার প্রথম স্বীকৃতিদাতা তাই নিঃসন্দেহে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]