শহর নামের ভাগাড়ে আমাদের জীবন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১১:০৪ এএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

শহরের দু’জন মানুষ – একজন ছাত্র আরেকজন সংবাদমাধ্যম কর্মী– দুই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির তলে চাপা মরে মরেছেন। মানুষ হত্যাকারী দুই চালকই ছিলেন ভাড়াটিয়া বা অবৈধ চালক। সব মিলিয়ে রাজধানীতে গত পাঁচ বছরে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িচাপায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে বলে গণমাধ্যম বলছে। ময়লার গাড়ি দিনেরবেলা সড়কে চলার কথা নয়, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দিনেরবেলা কেন ময়লার গাড়ি বের হয় তার কোনো উত্তরও কোথাও নেই।

এগুলো কোনো বড় খবর নয়, যদি আপনি ভাবেন সাধারণ মানুষ তো আসলে আবর্জনাই। কিন্তু ভাবনার জায়গা ভিন্ন জায়গায়। খবর বলছে, দুই সিটি করপোরেশনের অবৈধ ও ভাড়াটিয়া চালকরা পালিয়েছেন। যে কারণে বৈধ চালক সংকটে রয়েছে সংস্থা দুটি। নগরজুড়ে দেখা যাচ্ছে বর্জ্যের স্তূপ। সিটি করপোরেশন বলছে, অবৈধ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় এ সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে নগরীর অলিগলিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে বর্জ্য। দুই সিটি করপোরেশনের শত শত ময়লার গাড়ি। এখন গাড়ি আছে, চালক নেই। দু’জন পথচারীকে মেরে ফেলার পর অবৈধ চালকদের বাদ দিয়েছে দুই করপোরেশন। তাই ময়লা কমছে না, কেবলই বাড়ছে।

কি এক অদ্ভুত সেবা ব্যবস্থাপনা দুই সিটি করপোরেশনের। দু’জন মানুষের অকাল মৃত্যু না হলে আমরা জানতেই পারতাম না যে, তাদের ময়লার গাড়ির এমন মর্যাদা। একটি গণমাধ্যকে খুব মজাদার কথা বলেছেন একজন কর্মকর্তা। তার কথা, ‘অবৈধ ও ভাড়াটে চালকরা পালিয়েছেন। অনেক বৈধ চালক তো দীর্ঘদিন না চালানোর কারণে গাড়ি চালানোই ভুলে গেছেন। তাদের নিয়ে ভয় আরও বেশি।’ এর চেয়ে নাগরিক কপটতার আর কোনো দৃষ্টান্ত আছে কী?

ডিএসসিসির নিজস্ব গাড়ি রয়েছে ৫৯১টি। কিন্তু চালক ২২৫ জন। এর মধ্যে ভারী যানবাহন ৩৩৭টি। সেগুলোর চালক ১১০ জন। দৈনিক মজুরিভিত্তিতে চালক রয়েছে ২৬ জন। বাকি গাড়িগুলো সিটি করপোরেশন প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। একই অবস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেরও। তাদের বর্জ্যবাহী ভারী যান ১৩৭টি। বিপরীতে চালক মাত্র ৪১ জন। এর মধ্যে ২৫ জনই দৈনিক মজুরিভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। সংস্থা দুটির ৮০ ভাগ যানবাহনের ফিটনেস সনদও নেই।

চিত্রটি হতাশাজনক। এত এত উন্নয়নের খবরে সম্পূর্ণ বেমানান। কিন্তু এভাবেই চলছে প্রায় সব সরকারিসেবা প্রতিষ্ঠান। দুই সিটিতে পরিবহন চালকদের দুটি সংগঠন রয়েছে। ড্রাইভার্স ইউনিয়ন নামে সংগঠন দুটির বিশাল কমিটিও আছে। তাদের নেতারা কে কবে গাড়ি চালিয়েছেন তার হিসাব নেই। প্রভাব খাটিয়ে ভাড়াটে চালক দিয়েই নিজের নামের গাড়িগুলো পরিচালনা করছেন তারা। এ কারণেই এ খাতে বিশৃঙ্খলা চলছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়ার পরও ভারী যানের চালক খুঁজে পাচ্ছে না সিটি করপোরেশন। কতটা এগিয়েছি তাহলে আমরা!

আমাদের রাজধানীজুড়েই আবর্জনা, যার নাগরিক নাম বর্জ্য। সারা শহরেই আবর্জনা। আর সেই জমা আবর্জনার দুর্গন্ধে জীবন অতিষ্ঠ নগরবাসীর। দুই দুটি সিটি করপোরেশন। এদের দায়সারা মনোভাবেই আবর্জনার স্তূপ ক্রমেই বেড়ে চলছে। ঢাকা কোনো সাজানো গোছানো শহর নয়। একটি যেন এক আবর্জনার গ্রাম। বিভিন্ন পয়েন্টে ডাম্পিং স্টেশন আছে। সিটি করপোরেশনের গাড়ি সেখানে ময়লাও ফেলে। কিন্তু সে প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। বের হলেই দেখা যায় প্রায় সব রাস্তায় আবর্জনা উপচে পড়ে আছে।

পরিবেশ সম্পর্কে কিছু উদ্বেগ থাকলে, সরকার ও সরকারি সংস্থাগুলো এ নিয়ে তৎপরতা দেখাতো। এতদিন পরে এসে আসল চিত্রটা বেরিয়ে এল, আমরা জানতে পারলাম আবর্জনা সরাতে দুই করপোরেশনের সক্ষমতা একদম নেই। শহরে নিয়মিত জমা বর্জ্যের অপসারণ এবং পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়া নিয়ে কত কথাই শুনি আমরা। যে শহরে পথের জমা জঞ্জালই সাফ করতে দুই সিটি করপোরেশন হিমসিম খায়, সেখানে বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার মতো প্রত্যাশা করা যায় কি না, সে প্রশ্নওটা বড়।

বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, ডাস্টবিন বসানো, রাস্তার বর্জ্য সাফাইয়ের পাশাপাশি প্লাস্টিক বন্ধ করা– পুরোটাই আসলে বিজ্ঞান। তার চর্চা নেই কোথাও। আলাদা করতে হবে জৈব এবং অজৈব বর্জ্য। অজৈব বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করার চেষ্টা অনেক বড় বিষয়। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের চাপও বেড়েছে। সেই বর্জ্য কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে রাখা হবে, তার কোনো পরিকল্পনা আজও বলতে পারেনি করপোরেশনগুলো। ফলে এ রাজধানী পরিণত হয়েছে এক ভাগাড়ের স্বর্গরাজ্যে।

নগরায়ণের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বর্জ্য বাড়ছে। কিন্তু তার পুনর্ব্যবহারের উপযুক্ত বন্দোবস্ত কীভাবে করা হবে তার কোনো ভাবনা স্বচ্ছভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না কোনো জায়গা থেকেই। দুই সিটি করপোরেশন যেহেতু বর্জ্যের ঠেলা সামলাতে পারছে না, তার যন্ত্রণা তো সাধারণ নাগরিককে বইতেই হবে, এমনকি মৃত্যুও।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

‘অবৈধ ও ভাড়াটে চালকরা পালিয়েছেন। অনেক বৈধ চালক তো দীর্ঘদিন না চালানোর কারণে গাড়ি চালানোই ভুলে গেছেন। তাদের নিয়ে ভয় আরও বেশি।’ এর চেয়ে নাগরিক কপটতার আর কোন দৃষ্টান্ত আছে কী?

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]