ব্যালেন্সিং অর্থনীতিই হতে পারে সংকট উত্তরণের উপায়

লীনা পারভীন
লীনা পারভীন লীনা পারভীন , কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:০০ এএম, ০৬ জুলাই ২০২৩

বিশ্বজুড়ে চলছে অর্থনৈতিক মন্দার লু হাওয়া। আমাদের দেশেও সেই মন্দার ধাক্কা এসে লাগছে। এই মন্দা কেন বা কতদিন চলবে সে সম্পর্কে সব স্তরের মানুষের জানা না থাকলেও এই মন্দার শিকার কিন্তু আমরা সবাই। বাজারে অস্থিরতা, বিদ্যুতের সমস্যা। গ্যাসের সমস্যা। ফলাফল জনগণের জীবনে বাড়তি খরচের চাপ।

এই বিশ্ববাজারের যুগে পারস্পরিক নির্ভরতা থাকবেই এতে কোনো সন্দেহ নেই বা সমস্যাও নেই কিন্তু এটা তো সত্য যে নিজের ঘরের ভিত্তি যদি শক্ত না থাকে তাহলে প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কটাও কিন্তু ধরে রাখা যায় না বা স্বাস্থ্যকর থাকে না। পরনির্ভরশীল জাতির কপালে কেবল ভোগান্তিই থাকে, অগ্রগতি থাকে না।

এ ধারণা থেকেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার সবাইকে আহ্বান করেছেন যেন অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করি। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে অনেক। একসময় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে যুগের চাহিদায় আমরা সরে এসেছিলাম। শিল্পনির্ভর হতে চাইলাম আমরা। কিন্তু এই শিল্প নির্ভরশীলতার কিছুই আমাদের হাতে নেই। সবকিছুই কিনে আনা লাগে ভিন দেশ থেকে। বিষয়টা এমন যে বিদেশ থেকে সুতা, রং, মেশিন ইত্যাদি এলেই কেবল অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা খাত গার্মেন্টসের উৎপাদন সম্ভব।

গার্মেন্টসের কেবল শ্রমটাই আমাদের আর বাকি প্রায় সবই পরের। ফলে কী হয়- করোনা আসার পরেই সম্ভবত আমরা সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছি। চাহিদার পড়তি বাজারে আমাদের অনেক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাজারের হিসাবটাও পাল্টে যাওয়ার আশংকা থাকছে। আমেরিকা আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার হলেও রাজনৈতিক কারণে দুদিন পরপর স্যাংশনের আশঙ্কায় সেই বাজারেও আসতে পারে বড় আঘাত। সবসময় ভয় নিয়েই এগোচ্ছে আমাদের পোশাক শিল্প।

কিন্তু কৃষিতে সেই ভয় নেই। আমাদের আছে অবারিত পতিত জমি। ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় এমন সম্পদের পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। একটা সময় আমাদের প্রচুর জলাশয় ছিল যেখানে মাছ চাষ হতো। সেই জলাশয়গুলো আমরা ভরাট করে আধুনিক হতে চাইলাম। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেইসব জলাশয়ও ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার সময় হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন বিশ্ববাজারে সেসব কৃষিপণ্যও রপ্তানি করছে। ভাবা যায় যে এখন বিশ্বের সবখানে আমরা আমাদের নিজেদের কৃষিপণ্যকে পৌঁছে দিতে পারছি। ২২ কৃষিপণ্যের বাজার এখন আমাদের শীর্ষ তালিকায়। ফসল উৎপাদনে আমরা এখন বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ দশে আছি। প্রতি বছর আগাচ্ছি আমরা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেশভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের ২০২১ সালের তথ্য পর্যালোচনার ফলাফল এটি। বাংলাদেশ আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের ৯৪তম দেশ; তবে প্রাথমিক কৃষিপণ্য (শুধু ফসল) উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪তম। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, আয়তনে ছোট হলেও কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো।

সবাই যখন প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ঠিক তখন আমাদের মাটির মানুষগুলো ক্রমেই সংবাদ হয়ে উঠছে। রোবট সঙ্গীর আবিষ্কারের সংবাদ পড়ার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ হলো যখন পত্রিকার পাতায় বড় করে ছাপা হলো ফসল উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ দশে বাংলাদেশ। আজকাল আর মানুষকে চিন্তাও করতে হয় না। কেবল মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলেই গুগল সব বলে দিচ্ছে।

আমাদের দেশ ডিজিটাল হওয়ার পথে হাঁটছে। ব্যস্ত জীবনে সবকিছুই রেডিমেড চাই। ছোটবেলায় পড়েছি বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। একটা সময়ে আমাদের ছিল গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ। কালের গর্ভে সেসব এখন বইয়ের পাতায়ও আর নেই। বইয়ের পাতা দখলে নিয়েছে রোবটের মাধ্যমে খাবার পরিবেশন। এই আধুনিকতার মাঝে আমাদের কৃষকরা কিন্তু দমে যায়নি। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও নিজস্ব সম্পদকে হারাতে দেয়নি তারা।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই এগিয়ে ছিল। চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। সংবাদ বলছে, ২০২০ সালে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে তৃতীয় অবস্থানে ওঠে বাংলাদেশ। আলু উৎপাদনেও এগিয়েছি আমরা। আলু উৎপাদনে কানাডা, তুরস্ক, পোল্যান্ডের মতো ১৩টি দেশকে একে একে পেছনে ফেলে ৭ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

এক দশকে চীন ও থাইল্যান্ডকে পেছনে ফেলে শুকনা মরিচ উৎপাদনে ভারতের পরই দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। দেশেই উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কৃষিজাত পণ্য আমদানিতে ব্যয় কমেছে। বিবিএস এর হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে শুকনা মরিচ উৎপাদন ২৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে, যা ছয় অর্থবছর আগের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। পেঁয়াজ ও সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম। আমদানিনির্ভরতা কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যত বাড়বে ততই ঘরের টাকা ঘরেই থাকবে। ডলার বা আন্তর্জাতিক কোনো সংকটে আমাদের আর দুর্ভিক্ষের গান গাইতে হবে না।

আসলে যত আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে তত আমরা নিজেদের চাহিদা নিজেদের সম্পদ দিয়েই মিটাতে পারবো কিন্তু কেবল উৎপাদনেই সব সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। কারণ এরই মধ্যে আমরা জানি বাজার সিন্ডিকেশনের কথা। পেঁয়াজ বা চালের মজুতে সমস্যা না থাকলেও সিন্ডিকেশনের প্রভাবে বাজারে দাম বেড়ে যায় দুদিন পরপর। সরকারকে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কাজটা সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে পরিচালনা করতে হবে আবার অন্যদিকে উৎপাদনের ফসল যেন সবার সমানভাবে ভোগ করতে পারে সেই বাজার ব্যবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।

এইচআর/ফারুক/এএসএম

পেঁয়াজ বা চালের মজুতে সমস্যা না থাকলেও সিন্ডিকেশনের প্রভাবে বাজারে দাম বেড়ে যায় দুদিন পরপর। সরকারকে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কাজটা সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে পরিচালনা করতে হবে অন্যদিকে উৎপাদনের ফসল যেন সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারে সেই বাজার ব্যবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।