সম্পর্কের স্বাভাবিকতা নেই, আছে উৎকণ্ঠা
কন্যার স্কুলে গিয়েছিলাম অভিভাবক হিসেবে বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল আনতে। এই স্কুলে সম্প্রতি একজন বৃটিশ প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
ফলাফল সংগ্রহ করে আরো কিছু বিষয়ের জন্য তিনতলায় গেলাম। বই এবং স্টেশনারি কোথায় পাওয়া যাবে বলতেই, একজন শিক্ষিকা মেয়ের হাত ধরে বললেন, তুমি আমার সাথে এসো, বাবা এখানে দাঁড়াক। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি অবাকই হয়েছি। আমাকে বললে, আমিই যেতাম। কিন্তু তিনি নিজে মেয়েকে নিয়ে সেই নির্ধারিত কক্ষে গিয়েছেন, আবার তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে এনেছেন।
আমার মেয়েও কিছুটা অবাক। বলছে, বাবা আমাকে বললেই আমি যেতে পারতাম, কিন্তু মিস নিজ হাতে আমাকে নিয়ে গেলেন, আবার তোমার কাছে দিয়ে গেলেন। মেয়ে বলেছে, আমাদের সব টিচাররাই খুব courteous ইদানীং।
ফেরার সময় প্রিন্সিপালের কাছে যাওয়া। নাম তার মার্ক বার্থোলোমিও। ফলাফল দেখলেন, মেয়েকে নানা প্রশ্ন করলেন, কোন বিষয় ভাল হবে বললেন, সিলেবাসের বাইরে দু’টি বইয়ের নাম করে বললেন, ক্লাস শুরুর আগেই পড়ে ফেল, আমাকে জানাবে কেমন লাগলো। বিদায়ের সময় উঠতেই দেখলাম তিনিও উঠলেন, আমাদের একবারে মেইন গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। বুঝলাম, পুরো স্কুলে এই সৌজন্যবোধ নতুন এই প্রিন্সিপালের কারণেই। ফেরার সময় আমি লক্ষ্য করেছি একটা ভালোলাগার বোধ পুরো রাস্তায় সর্বক্ষণ আমাদের সঙ্গে ছিল।
আসলে এটি শুধু সাধারণ সৌজন্য নয়। তার চেয়েও বেশি কিছু। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অনাদি আনন্দবন্ধন। মাঝখানে কেউ নেই। প্রশাসন নেই, রাজনীতি নেই, হিসেবনিকেশ নেই। শিক্ষাদান বা বিনিময়ের বাইরে এক অন্যরকম আদর আর ভালোবাসার সম্পর্ক যা সব কিছু ভুলে কাছে টেনে নিতে পারে।
মেয়ের স্কুলের এই ঘটনা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আমার স্কুল জীবনে। হয়তো এমন নাগরিক সৌজন্য আমার শিক্ষকরা দেখাননি, কিন্তু কি অপার ভালোবাসা ছিল তাদের আমাদের জন্য। কত শিক্ষককে ভয় পেতাম, কিন্তু সেই শিক্ষকদেরই দেখেছি, এসএসি পরীক্ষা হয়ে যাবে, আমরা স্কুল ছেড়ে যাবো, সেজন্য তাদের চোখ অশ্রুসজল।
দেশব্যাপী সব স্কুলে কি এমন সহমর্মী শিক্ষক আছেন? নিশ্চয়ই আছেন, তেমন শিক্ষার্থীও আছে। শুধু মাঝখানে ঢুকে পড়েছে অনেক কিছু। ঢুকেছে বাণিজ্য, রাজনীতি, আর পরষ্পরের প্রতি অশ্রদ্ধা। স্কুল জীবনে কম নম্বর পেলে মা-বাবাকে কিভাবে মোকাবেলা করবো, সেই চিন্তায় থাকতাম। লজ্জা হত, ভয় হত, আশঙ্কা হত। অভিভাকরা শিক্ষকদের ওপরই নির্ভর করতেন বেশি, তবে নিজেরাও কম শাসন করতেন না। এখনকার জামানায় শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপারটা ক্রমাগত উল্টে যাচ্ছে। শিক্ষক কেন কম নম্বর দিলেন, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতেই হিমশিম খেতে হয় শিক্ষকদের।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ব্যাপারটি এমন দাঁড়িয়ে গেছে। দুর্বৃত্ত ছাত্র যেমন রয়েছে, তেমনই দুর্বৃত্ত শিক্ষকও তো আছেন। কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষকের কথা মনে আছে নিশ্চয়, যিনি ছাত্রীদের বাসায় ডেকে শারীরিক সম্পর্কের বিনিময়ে নম্বর কমাতেন বা বাড়াতেন। এরা কেউ শারীরিক আঘাত করছেন, কখনও মানসিক লাঞ্ছনা করছেন, জনসমক্ষে অপমান করছেন, কেড়ে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস। এরা টিউশন-চক্র ফেঁদে বসেছেন, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করছেন, ছেলেমেয়েদের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বাধ্য করছেন তাঁর কাছে পড়তে। আসতে অস্বীকার করলে পরীক্ষার খাতায় যথাযোগ্য প্রতিশোধ নিচ্ছেন, অশ্লীল প্রস্তাব দিচ্ছেন কোনো ছাত্রীকে। এক চরম ভয় আর অনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
গণমাধ্যমে দু’একটি রিপোর্ট হলে দু’একজনের শাস্তি হয় ঠিকই। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে স্নেহ, দরদি শাসন, কল্যাণময় শিক্ষাদানের যে লালিত স্বপ্ন থাকে বাবা মায়ের তা অধরাই থেকে যায়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশই, বিশেষ করে তাদের অভিভাবকরা মনে করেন, তারা টাকা দিচ্ছেন, তাই শিক্ষকরা পড়ান, এখানে এত সুকুমার বিষয নিয়ে ভাববার কিছু নেই। আমার এখনো মনে পড়ে আমার শিক্ষকদের, জীবনের সব কষ্ট সয়েও আমাদের সামনে তাদের অমলিন, বিশ্বাসী চেহারাগুলো। একই সাথে মনে পড়ে আমার শিক্ষকদের ওপর আমার অভিভাবকদের নির্ভরতার কথা।
আগেই যা বলেছি, সম্পর্কের মধ্যে এখন ঢুকে পড়েছে রাজনীতি আর বাণিজ্য। বিশ্বাসের স্বাভাবিকতা বদলে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার তীব্রতায়। ডাক্তার-রুগী সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গিয়েছে বহু আগেই। পারস্পরিক অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে আমরা একে নাম দিয়েছি ডাক্তার-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক। হয়তো নষ্ট হওয়ার পথে সন্তানের সাথে বাবা মায়ের সম্পর্কও। আর এভাবেই হয়তো ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে সৌজন্যবোধও।
এইচআর/এমএস