কৃষি ও কৃষকের বাংলা নববর্ষ

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম
কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম , কৃষিবিদ ও লেখক
প্রকাশিত: ১০:০৯ এএম, ১৪ এপ্রিল ২০১৮

বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ থেকে সূচনা হয় নব বর্ষের। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার হাজারো আয়োজন থাকে। নববর্ষ বাঙালির একটি সার্বজনীন লোক উৎসব। নববর্ষ কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক। অতীতের ভুল-ত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় বাংলাদেশের মতো ভারতের পশ্চিম বাংলায় উদযাপিত হয় নববর্ষ।

এক সময় নববর্ষ পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। কৃষি কাজ ঋতুনির্ভর হওয়ায় এ উৎসবের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল কৃষির। তাই কৃষক সমাজের সাথে বাংলা সাল এবং নববর্ষের একটি গভীর আত্মিক সম্পর্ক গ্রথিত প্রোথিত হয়ে আছে ঐতিহাসিকভাবে। কেননা, বাংলা সনের উৎপত্তি হয় কৃষিকে উপলক্ষ্য করেই।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনাও হয় আকবরের সময় হতে। বাংলা বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে তারিখ-ই-এলাহী বা ফসলী সাল নামে পরিচিত ছিল। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ অথবা ১১ মার্চ এটি বঙ্গাব্দ নামে প্রচলিত হয়। আকবরের রাজত্বের ঊনিশতম বর্ষ, অর্থাৎ ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাল প্রবর্তিত হলেও তা গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। কারণ এদিন আকবর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহন করেন।

আকবরের বিজয়কে মহিমান্বিত করে রাখার লক্ষ্যে সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হলেও কৃষি কাজের সুবিধার্থে এবং কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত উপায়ে অধিকতর সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যেই মূলত সম্রাট আকবর বাংলা সাল প্রবর্তন করেন। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সাল প্রবর্তিত হয়।

বাংলা সাল প্রবর্তনের আগে মুগল সম্রাটগণ রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করতেন। কৃষকদের জন্যে হিজরি বর্ষপঞ্জির ব্যবহার ছিল খুবই ঝামেলাপূর্ণ। কারণ চান্দ্র ও সৌরবর্ষের মধ্যে ১১/১২ দিনের ব্যবধান থাকায় ৩০ সৌরবর্ষে হতো ৩১ চান্দ্র বর্ষ। সেসময় রাজস্ব আদায় হতো চান্দ্র বর্ষ অনুযায়ী, কিন্তু ফসল সংগ্রহ হতো সৌর বর্ষ অনুযায়ী। তাই আকবর তার রাজত্বের শুরু থেকেই দিন-তারিখ গণনার একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, কর্মোাপযোগী ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি চালুর জন্যে বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

এ উদ্দেশ্যে তিনি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিবাজীকে প্রচলিত বর্ষপঞ্জিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দায়িত্ব দেয়া হয়। তাঁর প্রচেষ্টায় ৯৬৩ হিজরীর মহররম মাসের শুরু থেকে বাংলা বর্ষের ৯৬৩ অব্দের সূত্রপাত হয়। যেহেতু ৯৬৩ হিজরীর মহররম মাস বাংলা বৈশাখ মাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, সেহেতু চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাসকেই বাংলা বর্ষের প্রথম মাস করা হয়। চৈত্র ছিল বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস, যা সেসময় ব্যবহৃত হতো।

বাংলা সন প্রচলিত হওয়ার পর হতে মুগলরা জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ পালন করতেন। কৃষকরাও নববর্ষ পালন করতেন যথেষ্ট আড়ম্বরে। সে সময়ে বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতেন। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে। এ উপলক্ষ্যে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে উঠে পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে শুভ দিন হিসেবে।

বাংলা সালের জন্মলগ্ন থেকে নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং কৃষকদের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় খাজনার দায় পরিশোধের বিষয়টি না থাকলেও সামর্থ্য মতো সারা বছরের ধার-দেনা পরিশোধ করে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু করার অভিপ্রায় সব কৃষকের মনেই জাগরুক থাকে।

তেমনি এক দায়মুক্ত মানসিক প্রশান্তিতে কৃষকরা নববর্ষে বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, কৃষি ও ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করা, গবাদি পশুর জন্য প্রচুর পরিমাণ খাওয়া রেডি রাখা। সেদিন মাঠে পারতপক্ষে কাজ না করা এবং সকালে গোসল সেরে পুত পবিত্র হয়ে সেজে গুজে দিন অতিবাহিত করা। এদিনটিতে বিশেষ ভালো খাওয়া, ভালো থাকা, ভালো জামা কাপড় পরতে পারা এবং প্রতিবেশীদের সাথে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্যে মঙ্গলজনক মনে করে। এদিন ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পাড়া প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি, পিঠা, পুলি-পায়েসসহ নানারকম লোকজ খাবার তৈরি ও খাওয়ানোর ধুম পড়ে যায়।

একে অপরের সাথে নববর্ষের বিশুদ্ধ শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। এছাড়া নববর্ষকে আরও উৎসবমুখী করে তোলে বৈশাখী মেলা। সার্বজনীন লোকজ এমেলা অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর আমেজে উদযাপিত হয় দেশের বিভিন্ন গ্রাম-পল্লীতে বটতলায়, নদীর ঘাটে, হাটে, গঞ্জে। অবশ্য শহরাঞ্চলে এমেলা বসে নগর সংস্কৃতির আদলে, ভিন্ন আমেজে, ভিন্ন আঙিকে। কৃষকদের নববর্স পালন একটু ভিন্ন আমেজ আর শুভ সুন্দরের বারতা নিয়ে হাজির হয় প্রতি বছর বৈশাখের প্রথম লগনে।

দেশের ৩ পার্বত্য জেলা-রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে নববর্ষ উদযাপিত হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। বাংলা বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন-এতিনদিন মিলেই বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয় এ’তিন জেলায়। উপজাতীয়দের কাছে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রতিবছর আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত এ উৎসবকে ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাই এবং চাকমারা বিজু নামে আখ্যা দিলেও ঐতিহ্যবাহী এ’উৎসব পুরো পার্বত্য এলাকায় ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত।

বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু -এ নামগুলোর আদ্যাক্ষর নিয়েই ‘বৈসাবি’ শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন- এ’তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বৈসাবি’ পালিত হয়। পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে জুমিয়া কৃষকসহ আপামর পাহাড়ি সম্প্রদায় সে আদিকাল থেকে তিনদিনব্যাপী এ’বর্ষবরণ উৎসব পালন করে আসছেন। এ ’উৎসব উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা বৈসাবি উৎসবকে ৩ ভাগে পালন করেন। প্রথম দিনটির নাম ‘ফুলবিজু’। এ’দিন শিশু কিশোর-কিশোরীরা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে ‘মূলবিজু’। এ’দিনে হয় মূলঅনুষ্ঠান। এ’দিন নানারকম সবজির সমন্বয়ে একধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম পাঁজন। এটি বৈসাবির অন্যতম একটি আকর্ষণীয় খাবার। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে জাতি-ধম-বর্ণ নির্বিশেষে। নতুন বছরের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘গজ্যা পজ্যা’।

গত দুদিনের আনন্দময় ক্লান্তি নিয়ে এদিনটি সবাই কাটায় অনাবিল আয়েশে। এ’তিনদিন জুমিয়া কৃষকরা বৈষয়িক ও চাষাবাদের কাজ থেকে নিজেদেরকেমুক্ত রাখে। নতুন বছরে সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভালো ফসল কামনায় নিকটবর্তী বৌদ্ধ মন্দিরে প্রার্থনালয়ে প্রার্থনা সভায় মিলিত হয়। শুনেন বৌদ্ধের অমেয় স্লোক বাণী।

একটি বছর শেষ হলেই যথানিয়মে আসে নতুন বছর। সময়ের ধারাবাহিকতায় পুরাতন বছরের ভুল-ত্রুটি, ব্যর্থতা ও গ্লানি ভুলে সবাই নতুন বছরকে বরণ করে নেয় ভবিষ্যত সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায়। সকল পেশাজীবী জনগোষ্ঠির মধ্যে আমাদের কৃষকরাও বাংলা নববর্ষে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে যায় পেশাগত সাফল্যের দিকে।

বাংলা নতুন বছরে নতুন অঙ্গীকারে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে নতুনভাবে আত্মনিয়োগ করে অধিক ফসল উৎপাদনে। বাংলা নববর্ষে সবার মতো কৃষকরাও আশা করে- প্রতিটি নতুন বছর উপহার দেবে অনাবিল প্রশান্তি, উজ্জ্বল ভবিষ্যত এবং সাফল্যময় ঝামেলাহীন সুন্দর জীবন।

সবাই আনমনে গেয়ে যাবে... এসো হে বৈশাখ এসো এসো..তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষরে দাও উড়ায়ে..বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক...যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি...যাক অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক যাক যাক...মুছে যাক গ্লানি, ঘুছে যাক জরা...অগ্নিস্নানে শূচি হোক ধরা...রসের আবেশ রাশি শুস্ক করি দাও আসি...আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাখ...মায়ার কুজঝটি জাল যাক দূরে যাক...।

সবার জন্য নিরন্তর শুভ কামনা। শুভ নববর্ষ।

লেখক : কৃষিবিদ অতিরিক্ত পরিচালক, ক্রপস উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা।

এইচআর/আরআইপি

‘বাংলা নতুন বছরে নতুন অঙ্গীকারে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে নতুনভাবে আত্মনিয়োগ করে অধিক ফসল উৎপাদনে। বাংলা নববর্ষে সবার মতো কৃষকরাও আশা করে- প্রতিটি নতুন বছর উপহার দেবে অনাবিল প্রশান্তি, উজ্জ্বল ভবিষ্যত এবং সাফল্যময় ঝামেলাহীন সুন্দর জীবন।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]