জলবায়ু সংকটে বিপন্ন হবে বাংলাদেশও

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১৯ এএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

জলবায়ুর পরিবর্তনে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আজ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র। গত ৯ নভেম্বর শনিবার রাতে বাংলাদেশের সুন্দরবন-সংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এরপর এটি সুন্দরবনের খুলনা ও বাগেরহাট অংশের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। তবে প্রবল শক্তির এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সেভাবে পড়তে পারেনি সুন্দরবনের গাছপালায় এই ঝড় বাধা পাবার কারণে। এর আগেও ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডব থেকে এই বন উপকূলকে রক্ষা করেছে। যদিও সেই দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছিল বিস্তৃত বনাঞ্চল।

জলবায়ু সংকট আজ একা কোনো দেশের নয়, এই সংকটে গোটা বিশ্ব বিপন্ন হবে। আমরা এ যাবত ক্লাইমেট সংকট নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের থেকে যা তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি তাতে এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, ২০৫০ সাল থেকে জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা বিশ্বকে গ্রাস করবে মারাত্মকভাবে। সব রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়, সে কারণে ২০১৫ সালে প্যারিসে সব দেশের এবং যারা জলবায়ু নিয়ে কাজ করে তাদের এক সম্মেলন হয়েছিল। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন নামে খ্যাত প্যারিস সম্মেলনে একটা চুক্তি হয়েছিল তাতে প্রত্যেক দেশ দস্তখত করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ছিলেন এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী।

২০১৬ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছিল এবং তাতে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী ছিলেন হিলারি ক্লিনটন আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করে নেবেন। কারণ তিনি কোনোভাবেই মানেন না যে মনুষ্যসৃষ্ট কোনো কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন। গত ৪ নভেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে জাতিসংঘকে পাঠানো ওই চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগামী বছরের ৪ নভেম্বর চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার অনুমতি দিতে বলা হয়েছে। মানে আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একদিন পরই তারা যাতে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।

২০১৫ সালে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার জাতীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিটি দেশ নিজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক ধনী দেশও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করতে সম্মত হয়। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র দেশ এবং বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তার ভূমিকা দ্বিতীয়।

প্রকৃতপক্ষে, এই চুক্তিটি তৈরি হওয়ার পরের বছরগুলোতে ব্রাজিল, চীন, জাপান এবং ভারতসহ অনেক রাষ্ট্র অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কিন্তু কেউ প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসেনি। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের শিল্পের ওপর থেকে জলবায়ু চুক্তির ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ কমানোর লক্ষ্যে বিস্তারিত একটি কৌশল প্রণয়ন করেছে, ওই কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।

মগজ ছাড়াও স্রষ্টা মানুষ সৃষ্টি করেন আবার তাকে আমেরিকার মতো রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে বসান। এটা স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে বড় লীলাখেলা। উত্তর আমেরিকার অর্ধেক অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং তারা শিল্পোন্নত দেশ। বারাক ওবামার লেখা ‘দ্য অডাসিটি অব হোপ’ বইটিতে পড়েছি আমেরিকা দৈনিক ৮০ কোটি ডলার মূল্যের তেল পোড়ায়। জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানির বিরূপ প্রতিক্রিয়া আবহাওয়ার গুরুতর ক্ষতি করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার একটি বড় কন্ট্রিবিউটর। এই কথাটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপলব্ধি করতে না পারায় বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণে আমেরিকা ছাড়াও বড় দুইটি কন্ট্রিবিউটর রাষ্ট্র হচ্ছে- ভারত ও চীন।

ভারতে বায়ুদূষণের কারণে জনজীবনের বিপর্যয় শুরু হয়ে গেছে। গত অক্টোবর মাসের শেষের দিকে থেকে রাজধানী দিল্লি এবং আশপাশের এলাকায় মধ্যদুপুরেও অল্প কিছু দূরের সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেছে। দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় উড়োজাহাজের উড্ডয়ন অবতরণের ব্যাপারটা সমস্যাসঙ্কুল হয়ে পড়েছে। বহু উড়োজাহাজ উড্ডয়ন করতে পারেনি, বহু উড়োজাহাজ অবতরণ করতে না পেরে অন্যত্র চলে গেছে। শহরের কোনো কোনো এলাকায় বায়ুর এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স বা একিউআই ৬০০ ছাড়িয়েছে। এতে শহরের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। বায়ুতে একিউআই শূন্য থেকে ৫০ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করলে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে অনুকূল কিন্তু দিল্লিতে ৪ নভেম্বর থেকে বায়ুতে একিউআই হয়েছিল ৪০৭ আর ১২ নভেম্বর এক লাফে তা ৬২৫ এ গিয়ে পৌঁছেছে।

গাজিয়াবাদ, গুড়গাঁও, ফরিদাবাদে দূষণের মাত্রা ৪০০ থেকে ৭০৯ পর্যন্ত ওঠানামা করেছে। এসব এলাকা রাজধানীসংলগ্ন উত্তরপ্রদেশের অংশ। জলবায়ুবিদরা বলেছিলেন বৃষ্টি হলে সূচক কমবে। দিল্লিতে ৯ নভেম্বর একপশলা বৃষ্টিও হয়েছিল কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কথা সত্য হয়নি। বরঞ্চ বৃষ্টির পর একিউআই বেড়েছে। এখন দিল্লির সূচক ৬২৬। এভাবে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত চললে দিল্লি জনশূন্য হয়ে যাবে।

কলকাতা-চেন্নাইও একই ঝুঁকিতে রয়েছে। হরিয়ানা এবং পাঞ্জাবের ক্ষেতে ধানের নাড়া পোড়ানোতে নাকি ধোঁয়া দিল্লির দিকে ধাবিত হয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রাজস্থানেরও আবহাওয়া খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই কারণে। এই অবস্থায় প্রধান সমস্যা হচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারা।

চীনের অবস্থাও ভালো নয়। চীনে যেকোনো সময় ভারতের অবস্থার উদ্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থা দিল্লির অনুরূপ হওয়া বিচিত্র নয়। এর আগে অনেকবার রিপোর্ট হয়েছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি। ঢাকার পরই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। গত দুই সপ্তাহ আগের এক তথ্য অনুযায়ী দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ। ওই তালিকার শীর্ষ তিনটি শহর যথাক্রমে ভারতের নয়া দিল্লি, কলকাতা ও ইন্দোনেশিয়ার জার্কাতা। চতুর্থ স্থান অধিকারী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পর পঞ্চম অবস্থানে দেখা গেছে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের নাম। বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে।

জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল দিল্লি সফরে এসেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পরামর্শ দিয়ে গেছেন গাড়ি তেলের পরিবর্তে ইলেকট্রিক দিয়ে চালানোর ব্যবস্থা করার। আমাদের সরকারও একই পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। এমনকি রেলগাড়ি ডিজেলের পরিবর্তে ইলেকট্রিক দিয়ে চালানোর ব্যবস্থা করা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনে পৃথিবী অবর্ণনীয় দুর্দশার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করে জলবায়ুর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন বিশ্বের ১৫৩ দেশের প্রায় ১১ হাজার বিজ্ঞানী। তারা উল্লেখ করেছেন নৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা এই ভয়াবহ হুমকির ব্যাপারে সতর্ক করছেন।

গত ৫ নভেম্বর বিজ্ঞানীদের জোটের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বায়োসাইন্স নামক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তারা ৪০ বছরের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে গবেষণা চিত্র তুলে ধরেছেন। বিজ্ঞানীরা ছয়টি পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। ১. জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তে কম কার্বন নিঃসরণের জ্বালানি ব্যবহার; ২. মিথেনের মতো দূষণের নিঃসরণ কমানো; ৩. মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা, বিশেষ করে মাংসের প্রতি আসক্তি কমিয়ে উদ্ভিদ জাতীয় খাদ্য গ্রহণ; ৪. বিশ্বে ইকোসিস্টেম রক্ষা; ৫. কার্বনমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ; ৬. জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী ও সরবরাহকারীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভর্তুকি প্রদান বন্ধ করা।

বিজ্ঞানীদের প্রতিবেদনটি পড়ে মনে হয়েছে যে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় দিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবিলার কাজ সামাল দেয়া সম্ভব হবে না। পরিবেশ অধিদফতরের কাজ দেশের মানুষ চোখেই দেখে না। বায়ূদুষণ আর শব্দ দূষণে ঢাকা শহরে নাক-কান বন্ধ করে চলতে হচ্ছে। প্রত্যেক রাষ্ট্রের উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় স্থাপন করা এবং বিশেষ বিবেচনায় কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। কেউ কেউ নিচ্ছেও। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার এবং জরুরীরি ভিত্তিতে তা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলে বন্যার আঘাতের শিকার হবে চার কোটি ২০ লাখ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্টার বলেছে, বাংলাদেশের বন্যাপীড়িত লোকের সংখ্যা পাঁচ কোটি ৭০ লাখ হতে পারে। এত লোক উদ্বাস্তু হলে দেশের অবস্থা কী হবে! সুতরাং এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বিপদ এসে গেলে তখন কোনো পদক্ষেপ কার্যকর হবে না। আর যেহেতু বিপদ হবে বিশ্বব্যাপী কমবেশি সব দেশেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে তখন। কেউ কাউকে পর্যাপ্ত সাহায্য করতে পারবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এখন থেকেই প্রস্তুতি না নিলে জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় অসহায় হয়ে পড়তে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]