কী শেখালেন গুলতেকিন?

মিলি সাহা
মিলি সাহা মিলি সাহা
প্রকাশিত: ১০:৪৫ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

অতি সম্প্রতি স্বনামধন্য শিক্ষিকা ও কবি গুলতেকিন খান দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। বলা ভালো, বসতে বাধ্য হয়েছেন; কেননা তার প্রথম বিয়েটি ভেঙে দেয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না এবং তিনি তা করতে বাধ্য হয়েছেন যেহেতু অন্যপক্ষ চেয়েছিলেন। হ্যাঁ, ৫৬ বছর বয়সে একজন বাঙালি নারী দ্বিতীয়বার বিয়ে করছেন; এটি সমাজের চোখে সঠিক নয়। তবে প্রথম বিয়েটিও গুলতেকিন অসময়েই করেছিলেন; যদিও সমাজে তা ততটা আলোড়ন তুলেনি এবং এত আগে করা বিয়ে মাঝবয়সে অসময়েই ভেঙেছে! তাহলে তিনি কি সমাজের চোখে ভুল? আমাদের কি ভুল কিছু শেখালেন? এই বয়সে বিয়ে বা দ্বিতীয়বার বিয়ে নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন, তাদেরকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছি না; তবে অনেক ও অধিকাংশ মানুষই শুভকামনা জানাচ্ছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা! শুধু গুলতেকিন নয়, পরবর্তীতে অন্য যারা একাকীত্ব ঘোচানোর তাগিদে যেকোনো বয়সে দ্বিতীয়বার সঙ্গী খুঁজে নেবে তাদেরও যেন আমরা অভিবাদন জানাই। সেটা শাওনও হতে পারে। কেননা, নারীর একাকীত্বের যন্ত্রণার অধিকাংশজুড়েই থাকে সামাজিক চাপ। নয়তো নারী পুরুষের মতোই একাকীত্ব উপভোগই করতো!

সত্যিই তারা হয়তো বুঝতে পেরেছেন কেন গুলতেকিন এই বিয়ে করেছেন। তার কি এটি প্রয়োজন ছিল? শারীরিক বা সামাজিক স্বস্তির জন্য যে গুলতেকিন বিয়ে করেননি তা তো স্পষ্ট; কেননা সেটি ১৫ বছর আগেই করতে পারতেন বা নিদেনপক্ষে ৭-৮ বছর আগে যখন আফতাব সাহেবের সাথে পরিচয় হয়, যেমনটা করেছেন হুমায়ূন। হ্যাঁ, গুলতেকিন তার মনের মানুষকে বিয়ে করেছেন এবং যতক্ষণ না সেই সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে করার সবগুলো স্বাভাবিক কারণ উধাও হয়েছে! যারা শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, তারা সবাই কি এই কঠিন দর্শনটুকু অনুধাবন করেছেন? গুলতেকিনের প্রেম ও সততা কতটা গভীর তা কি আমাদের কাছে অনুমেয়? যে স্বপ্ন ও আবেগ নিয়ে হুমায়ূনকে বিয়ে করেছিলেন, সেই একই আবেগ তিনি অন্য কারও সাথে ভাগ করে নেননি! হুমায়ূন কি এতটা গভীরভাবে ভেবেছিলেন তার দুটো সম্পর্কের একটি নিয়েও? নাকি শুধুই অল্প বয়সী আবেগে মুগ্ধ করার ক্ষমতার সুযোগে ভালোবাসার অংশীদার হয়েছেন অবচেতন মনে?

পুরুষতান্ত্রিক বাঙালি সমাজ সব মেনে নিতে পারে; বাল্যবিবাহ, বাল্যবৈধব্য, অকাল বৈধব্য, অবিবাহিতা পরনির্ভরশীল নারী; এমনকি সঙ্গীহীন ডিভোর্সি নারীকে ও আজকাল এই সমাজ সামান্য স্বীকৃতি দেয়। সহজ কথায়, পুরুষের সুবিধা নিশ্চিত করতে তৈরি করা নিয়ম মানতে গিয়ে মেয়েদের যেকোনো বিপদে সমাজের কোনো অনিয়ম হয় না। হয় শুধু নারী সেইসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের সুখ খুঁজতে গেলেই! ছেলেরা নিয়ম ভাঙলে পৌরুষত্ব, মেয়েরা ভাঙলে অনাচার! বাঙালি যা সহ্য করতে পারে না তা হলো নারীর সাহস! আমি বলব, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বড় ভয় হলো একজন স্বাবলম্বী ও ব্যক্তিত্ববান নারী যে সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মনের কথা শুনে! কেননা তাতেই পুরুষের দুর্বলতাটুকু প্রকাশ হয়ে যাবার সমূহ ভয়!

কী নিয়ম ভাঙলেন গুলতেকিন? অথৈ প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে নিজের ইচ্ছেয় টিন-এজার মেয়েটি বয়সে অনেক বড় এক লেখক-শিক্ষককে বিয়ে করেছেন! না, এখানে হুমায়ূনের বেশি বয়স কোনো কোনো বাধা ছিল না; গুলতেকিন প্রেমে পড়েছেন বা করেছেন- সেটিই মূল সমস্যা। আমার বিশ্বাস তার পরিবারকে এই বিয়েতে বাধা না দেয়ার জন্য অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার পরিবারকে। হয়তো দাম্পত্য জীবনের সুখ-দুঃখের অভিযোগ করতে পারেননি কোথাও, কেননা নিজেই বিয়ে করেছেন! প্রকাশ করতে পারেননি স্বামীর অবহেলার কথা; হুমায়ূনের খ্যাতির আড়ালেই সকল বঞ্চনা ও অন্যায় চাপা পড়ে ছিল বলতে গেলে।

গুলতেকিন সমাজের চোখে সুখী নারী হয়েই ছিলেন; মেয়েদের সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের সংজ্ঞাও তৈরি হয়েছে স্বামী-সংসার-সন্তান কেন্দ্রিক! এসব না থাকলে আবার সুখ কীসের? টাকা-কড়ি-চাকরি-ব্যবসা তো স্বামীর থাকলেই চলে, নারীর আর কী চাই? বিদ্যা-বুদ্ধি-যশ-খ্যাতি সেসব স্বামীরই প্রাপ্য; তা না হলে নারীর সম্মান থাকে না! যে নারী নিজেই সেসব পেতে চেয়েছেন, সমাজের সংজ্ঞায় তাকে অসুখীই হতে হয়েছে বৈকি! প্রেম, বিয়ে ও সংসারের জন্য গুলতেকিন নিজের সব ছেড়েছেন; পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, প্রচার, প্রশংসা- সবকিছু! এমন একটি শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারের মেয়ের হতে পারত আরও অনেক অভাবনীয় অর্জন। গুলতেকিন সুখী হতে চেয়েছিলেন, খ্যাতি চাননি; পারিবারিক মেধার মূল্যায়ন করেননি, নারীত্বের দায় স্বীকার করেছেন; ব্যক্তিসত্ত্বাকে অবহেলা করেছেন, নিজেকে ভালোবাসেনি। ভালোবেসেছেন পরিবার ও সন্তানদের, সৎ থেকেছেন সম্পর্কে, নির্ভার করেছেন স্বামীর খ্যাতিকে।

বিশ্বাসী গুলতেকিনের ভালোবাসায় ভর করে হুমায়ূন পৌঁছেছেন সাফল্যের শীর্ষে, পাল তুলেছেন অন্য দ্বীপে; তবুও ব্যক্তি গুলতেকিন করেননি অভিযোগ। নীরবে সরে এসেছেন সন্তানদের নিয়ে; দায়িত্বে অবহেলা করেননি কোনো। দু-একবার যা একটু অভিযোগ করার চেষ্টা করেছেন, সমাজ উল্টো তাকে দোষারোপ করেছে মৃত হুমায়ূনের প্রতি অবিচার করার অপরাধে! নারী জীবনের কি দাম নেই কিছু? অসৎ পুরুষ মৃত হয়েই মহান, নারী সৎ হলেও নিস্তার নেই; অবলাই হতে হবে! তবে সবচেয়ে বড় অঘটনের এই বিয়েও গুলতেকিন প্রেম করেই করেছেন এবং শুধুই প্রয়োজনে করেননি। আগের বিয়েও প্রেমিককেই করেছিলেন ভীষণ ভালোবেসে; তবে সময়ের আগে। এবার সময়ের পরে। গুলতেকিন কি বাংলাদেশের নারীদের জন্য অননুমেয় এক উদাহরণ তৈরি করে গেলেন না?

তাহলে কি সবাইকেই ভালোবেসে অসময়ে বিয়ে করতে হবে, বা দীর্ঘ একাকিকত্বের অভিশাপ নিতে হবে? না! নারী, নিজেকে ভালোবাসো, কান পেতে নিজের মনের কথা শোনো, নিজেকে সম্মন করো, সমাজের সাথে অসম যুদ্ধে নিজেকে তৈরি করো সবার আগে। প্রতিটি জীবনে আদর্শ থাকুক- প্রয়োজন যেন নীতিহীন না হয়; আপস করো না; সমাজ যেন তোমার মনের ক্ষত তৈরি করতে না পারে। লিভ ইওর ওউন লাইফ, উওমেন!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

এইচআর/বিএ