মরে যাবো, কিন্তু মাথা নোয়াবো না

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:১৩ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২০

অধ্যাপক ড. কামালউদ্দিন আহমদ

যিশু খ্রিস্টের জন্মের ৪৪ বছর আগে ১৫ মার্চ রোমের গৌরব জুলিয়াস সীজারকে নির্মমভাবে হত্যা করে তারই সন্তানপ্রতিম ব্রুটাস ক্যাসিয়াস এবং অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীরা। সীজারের বিজয়াভিযান গড়েছিল রোমের ভিত্তি। সীজার হত্যার দু’হাজর বছরেরও কিছু পর স্বাধীনতার আরেক সৈনিক, জাতীয়তাবাদের প্রতীক, রাষ্ট্রের স্থপতি এবং জাতির পিতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫-এ তারই কৃপার পাত্র কিছু সামরিক ও বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারী।

ষড়যন্ত্রকারীদের মূল লক্ষ ছিল বাংলাদেশের ভিত্তির চার মূলনীতি। তাঁরা জানতো যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই এই মূলনীতিগুলো রক্ষা করার আর কেউ থাকবে না। এখানে তৈরি করতে পারবে এক মিনি পাকিস্তান। তারা জানতো যে বাঙালিকে আর পাকিস্তানী করা যাবে না, তবুও সৃষ্টি করতে হবে এমন একটি রাষ্ট্র যা চলবে পাকিস্তানের ছায়ায় যেখানে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বকে এই উপমহাদেশে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করা যাবে। রক্ষা করা যাবে কায়েমী স্বার্থ। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, কেবল ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার ফলও নয়। এর পিছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা দখলের অদম্য আকাঙ্খা।

অনেকে এটাকে সামরিক অভ্যুত্থান বলে মনে করেন। এটাকে সামরিক অভ্যুত্থান বলা চলে কি না সেটা আলোচনা সাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক আইনে সেই অবস্থাকে ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থান বলা হয় যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সাংবিধানিক বহির্ভূত উপায়ে হঠাৎ বা জবরদস্তিমূলক ভাবে গ্রহণ করা হয় এবং সাধারণত এটা সামরিক বাহিনীর একটি অংশ বা সমগ্র সামরিক বাহিনী দ্বারা সংঘঠিত হয়। ১৯৭৫ এর আগস্ট হত্যাকাণ্ডে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার জড়িত ছিল, তাদের মধ্যে দুজন চাকরিচ্যুত এবং বাকী ৫ জন মেজরপদের। এদের মধ্যে মেজর ফারুক হোসেন ও আবদুর রশীদের লন্ডনের সানডে টাইমস-এর এন্থনি ম্যাসক্যারানহাসের সঙ্গে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য বেরিয়ে পড়ে।

এই সাক্ষাৎকারটি লন্ডনের আট টিভি থেকে সম্প্রচারিত হয়। এই সাক্ষাৎকারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে মার্চ ৭৪ থেকে এই হত্যার একক পরিকল্পনা করে ফারুক হোসেন যখন সে (তার নিজের কথামত) একজন সাধারণ সৈনিক ছিল এবং রাষ্ট্র চালনা বা রাজনীতি সম্বন্ধে কোন জ্ঞানই তার ছিল না, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার জন্য সে প্রস্তুতি নিতে থাকে। এ ব্যাপারে একমাত্র তার ভায়রা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদুর রশীদকে অবহিত করে। ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল জিয়ার (তখন ডেপুটি চীফ অব আর্মি স্টাফ) সঙ্গে ফারুক দেখা করে এবং দেশের অবস্থা পর্যালোচনা করার পর জুনিয়র অফিসারদের মুজিব হত্যার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এতে তাঁর সমর্থন ও নেতৃত্ব চায়। জুনিয়র অফিসাররা এ ধরনের পরিকল্পনা করে থাকলে তারা এগিয়ে যেতে পারে বলে জিয়া অভিমত ব্যক্ত করেন।

ফারুক জিয়ার মনের কথা বুঝতে পেরে যোগাযোগ করে খন্দকার মুশতাকের সঙ্গে। সামরিক বাহিনীর আর কারো প্রত্যক্ষ সমর্থন ফারুক ও রশীদ পেয়েছিল বলে কোনো উল্লেখ এই সাক্ষাৎকারে নেই। এরপর রশীদ যোগাযোগ করে চাকরিচ্যুত সে সব জুনিয়র অফিসারদের সঙ্গে যাদের ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল জাতির পিতার প্রতি।

চাকরিচ্যুত কয়েকজন জুনিয়র অফিসারকে নতুন এয়ারপোর্টে ১৪ আগস্ট রাতে এই ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়। তখনই তারা বঙ্গবন্ধু, সেরনিয়াবাত ও শেখ মনিকে হত্যার সিদ্বান্ত নেয়। এর আগে এই হত্যার পরিকল্পনা কাজে পরিণত করার জন্য মার্চ ১৯৭৫ থেকেই ফারুক তার ইউনিটের ট্রেনিং শুরু করে এবং প্রতি মাসে দুবার রাতে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে। এই ট্রেনিং-এ অংশ নিতো ফারুক রহমানের বেঙ্গল ল্যান্সারস এবং সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারি যার অধিনায়ক ছিল রশীদ। এই ট্রেনিং এর একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেয়া। কাজেই এটাকে কোন মতেই সামরিক অভ্যুত্থান আখ্যা দেয়া যায় না।

বঙ্গবন্ধু, শেখ মনি ও সেরনিয়াবাতের বাড়িতে যে হত্যাকাণ্ড হয় তা একদিকে যেমন নৃশংস অপর দিকে তেমনি কাপুরুষচিত। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন তার মধ্যে ছিল তাঁর দশ বছর বয়সের শিশু পুত্র রাসেল, তাঁর স্ত্রী ও তাঁর দুই পুত্রবধূ, শেখ মনির গর্ভবতী স্ত্রী সেরনিয়াবাতের শিশু নাতি এবং তাঁর ছেলে, মেয়ে। রক্তপিপাসু পেশাদার খুনির পক্ষেই কেবল সম্ভব ছিল এই হত্যাকাণ্ড করা। কোনো পেশাদার সৈনিক বা সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য এই ধরনের খুন করা শিক্ষা পায় না। রাজনৈতিক হত্যকাণ্ড কোনো বিছিন্ন ঘটনা নয়। রাজনীতির আদিকাল থেকেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের হত্যা করা হয়েছে। প্রচীন রোমে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সিংহাসনের লোভে অনেক রাজা, রাজপুত্র, সামরিক বাহিনীর নেতা খুন হয়েছে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিবিদরা। আধুনিক ইতিহাসে ১৯৪৭ সালে বার্মায় আওং সাংসহ তাঁর মন্ত্রীসভার সমস্ত সদ্যসকে হত্যা করা হয়। ১৯৬১ সালে কংগোর প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং ১৯৭৩ সালে চিলির আলেন্দে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন সামরিক অভ্যুত্থানে।

১৯৭৫ সাল ছিল রাজনৈতিক হত্যার বছর এবং এই হত্যার ষড়যন্ত্রে তৃতীয় বিশ্বের ৪ জন রাষ্ট্রপতি নিহত হন আততায়ীর হাতে। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের এই বছরের শেষ শিকার। তাঁর আগে হত্যা করা হয় শাদের রাষ্ট্রপতি আয়গারতা ইমবালাওয়ে, মালাগাসির রাষ্ট্রপতি কর্নেল রাতিসমানদাভা ও সৌদি আরবের রাজা ফয়সল। ইতিহাসে যতগুলো রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাস আছে তাঁর মধ্যে নৃশংসতম ছিল ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবার পরিজনের হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রকারীরা কাজে লাগিয়েছিল কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর লোকদের। যারা উচ্চাভিলাষ ও ব্যক্তিগত ক্রোধের কারণে খুনির ভূমিকা গ্রহণ করে। নিছক আক্রোশের এই হত্যাকাণ্ডকে ঢাকবার জন্য মিথ্যা প্রচার করা হয় যে এটা ছিল সামরিক অভ্যুত্থান।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করার জন্য পর্যালোচনা করতে হবে ছয়দফা আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। ছয়দফা আন্দোলন ছিল স্বাধিকার আন্দোলনের গোড়ার কথা এবং পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সরকার এই আন্দোলনের মধ্যে দেখতে পেয়েছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর ভাঙন। হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর ‘হোয়াইট হাউস ইয়ার্স’ বইতে লিখেছেন, “পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীকার লাভের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের কোনো জাতীয় স্বার্থ ছিল না বরং এর জন্য মার্কিনীরা কিছু পরিকল্পনার কথাও বলেছিল তবে তারা চেয়েছিল এটা একটা বিবর্তনমূলক অবস্থায় আসুক।” কিভাবে এটা আসবে তার মধ্যে মার্কিনী স্বার্থ ছিল কেননা যদি কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে এটা আসে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চীনসহ পৃথিবীর অন্যান্য বহু দেশে এর প্রতিক্রিয়ায় বিপর্যয় আনবে। নিক্সন মনে করেছিলেন যে ধীরে সুস্থে সামরিক শাসনের অবসান হবে এবং ডিসেম্বরের শেষের দিকে বেসামরিক সরকার গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করবে। এই ভাবে যদি ঘটনা ঘটে তাহলে ব্যতায় হবে না এবং ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিবাহিনীরাও ক্ষমতায় আসতে পারবে না।

নিক্সন সরকার যদি মার্কিন জনগণকে উপেক্ষা না করতো তাহলে পাকিস্তান থেকে কাশ্মির, বেলুচিস্তান এবং পশ্চিমের আরো কিছু অংশ বিছিন্ন হয়ে যেত এবং সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান ভেঙে যেত। আমরা অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে এই বিপর্যয় ঠেকাতে পেরেছিলাম। নিক্সন যুদ্ধ বন্ধ করতে চান নি। ‘তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধ ধীরে ধীরে চলুক। কিন্তু মার্কিন জনগণ, কংগ্রেস এবং সংবাদ মাধ্যমগুলো তার এই নীতি সমর্থন করে নি।’

যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এবং চোরাচালানী, কালোবাজারী ও মজুতদারী বন্ধ করার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার দুবার সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগান। এতে কিছুটা উপকার হলো। এর মধ্যে দেশে যে সমস্ত রাজাকার আলবদরেরা লুকিয়েছিল তারা আস্তে আস্তে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। ১৯৭২ এর গোড়া থেকেই মানুষজন এদেরকে সিক্সিটিন ডিভিশন নামে অভিহিত করতো। এরাই প্রধানত দায়ী ছিল দেশে বিরাজমান অরাজকতার জন্য। এই অরাজকতা বন্ধের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার কয়েকটি আইন প্রণয়ন করেন। তার মধ্যে কোলাবেরটর অর্ডার এবং স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট অন্যতম। কিন্তু রাজনৈতিক দলের সরকার বিরোধী আন্দোলন এবং অতি বিপ্লবী ভূমিকাও বঙ্গবন্ধুকে বিব্রত করার চেষ্টা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এসব বিপ্লবী নেতাদের দেশ প্রেমের ফাঁকা আওয়াজের সঙ্গে দেশের মানুষ এখন অনেকটাই অবহিত। যে নেতা তখন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে তাদের অনেকেই এখন সুবিধাবাদী এবং স্বার্থান্বেষী হিসেবে চিহ্নিত।

কালোবাজারী ও চোরাচালানী বিরোধী অভিযানের সময় একটি কুচক্রিমহল বঙ্গবন্ধু সরকারকে তাদের কার্যকলাপের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে নিন্দনীয় করে তোলে। দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার ‘৭৩-এর নভেম্বর মাসে সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে তাদের নিজস্ব এলাকায় নাগরিক কমিটি গঠন করেন। আওয়ামীলীগ, ন্যাপ (মো:) ও বাংলাদেশের কমুনিস্ট পার্টি নিয়ে ‘গণ ঐক্য জোট’ গঠন করে চোরাচালান ও কালোবাজারী বন্ধের জন্য সরকারকে সাহায্য করার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা এবং দেশের সিক্সিটিন ডিভিশন খ্যাত আলবদর ও আলশামস সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।

৭২ থেকে ৭৪ এর শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সরকার দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও- অল্প সময়ের প্রচেষ্টায় গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন এবং ৭৩ এ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। পাকিস্তানী সৈন্যরা যাবার সময় দেয়া এবং বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত অবৈধ অস্ত্র জমা দেয়ার জন্য সরকার আবেদন করেন- যার ফলে সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিলেও রাজাকার, আলবদর খ্যাত সিক্সিটিন ডিভিশনের লোকেরা অস্ত্র জমা দেয় নি। সেই সব অস্ত্রধারীরা শহরে, গ্রামে, গঞ্জে, রাজনৈতিক দলের মুখোশ পড়ে খুন, জখম, রাহাজানি ও হাইজ্যাক করতে থাকে। তবে বঙ্গবন্ধু সরকারের তৎপরতায় অনেকাংশে এইসব অত্যাচার ‘৭৪’-এর শেষের দিকে বন্ধ হয়। এর মধ্যে যুক্ত হয় মার্কিন সরকারের সুপরিচিত অর্থনৈতিক অবরোধ নীতি। অবরোধনীতির শিকার হয় তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ। এই অবরোধনীতি পোলান্ডের বিরুদ্ধে, আলেন্দের চিলির বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হয় ।

বাংলাদেশের উপর এই নীতি এলো বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে চরম বির্পযয়ের মুখে তখন বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে দাতা দেশগুলো দাবি জানালো যে বাংলাদেশেকে সাবেক পাকিস্তানের ঋণের একাংশের দায় নিতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশকে সাহায্য দেয়া সম্ভব নয়। তাদের কাছে এটা অবিদিত ছিল না যে পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে বিপুল সম্পদের জন্য ঋণী ছিল। তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংক অবস্থার নাজুকতা বুঝে চাপ দেয় পাকিস্তানের ঋণের ভার গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নীতির প্রশ্নে আপোস না করে বললেন, “দাতা মহল তাদের দাবী না ছাড়লে কালই তারা ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে পারেন। ঐ শর্তে আমরা সাহায্য নিতে পারি না।” বিশ্ব ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্টকে এই সিদ্বান্ত জানালেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এবং পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ড. নুরুল ইসলাম। বিশ্ব ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট এই কথা শুনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান এবং বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন “শুনেছি আপনারা বলেছেন যে সাহায্য নিতে হলে আপনাদের শর্ত মানতে হবে আগে। ভদ্র মহোদয় এই যদি আপনাদের শর্ত হয়ে থাকে, তা হলে সাহায্য আমরা নেব না, আমাদের জনগণ রক্ত দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আমাদের বাঁচতে হলে জনগণের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই বাঁচতে হবে। আমরা আপনাদের সাহায্য ছাড়াই চলবো।” এর তিন সপ্তাহ পর বিশ্বব্যাংক জানায় যে তারা শর্ত উঠিয়ে সাহায্য দিতে রাজি হয়েছে।

এটা ছিল ৭২ সাল। ষড়যন্ত্রকারীরা তখনো তাদের দোসরদের সংগঠিত করতে পাওে নি। কিন্তু ৭৪’- এ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো সংগঠিতভাবে এবং মার্কিন সাহায্যকারীরা তাদের নিজস্ব রূপ দেখাতে লাগলো। ‘৭৪-এর বন্যার পর দেশে যখন খাদ্য শস্যের অভাব তখন খাদ্য শস্যের চালান (পি এল ৪৮০এর অধীনে ) বন্ধ হয়ে গেল। শস্য বোঝাই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শস্য খালাস না করে ফেরত চলে গেল। এইভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছিল খাদ্যাভাব এর সঙ্গে ছিল চোরাচালানী এবং কালোবাজারী।

বঙ্গবন্ধু বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বক্তৃতায় হতাশার সঙ্গে বলেছিলেন, “আমি ভিক্ষা করে খাবার জিনিস নিয়ে আসি আর চাটার দল সব খেয়ে যাবে।” যাদের উপর তাঁর ভরসা ছিল তারাই তাঁকে হতাশ করেছিলেন। বিরোধী দলগুলো কোন গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পাওে নি। তারা তাদের বিপরীতমুখী আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে যেন বঙ্গবন্ধু সরকারের পতন ঘটানোই একমাত্র লক্ষ। তার পরবর্তীতে কি হবে সে সম্বন্ধে তারা ছিল সম্পূর্ণ উদাসীন। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি পরাজিত মুসলিম লীগ, জামাত ও তৎকালীন চীনপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার ২১ বছর পরও কোন গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারেনি জিয়া, এরশাদ সরকার। ফ্রীডম পার্টি নামে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ ছিল স্বাধীনতার মূল্যবোধের উপর চপেটাঘাত। খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সংসদ সদস্য করতে দ্বিধা করেনি। একে অপরকে দুর্নীতিবাজ বলে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বাড়ানো হয়েছিল এবং গণতন্ত্রকে বিদায় দেয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের কাছে আত্মসমর্পণের ফলে দেশের প্রত্যেক জিনিসের দাম সাধারণ জনগণের আয়ত্তের বাইরে ছিল। দেশের অর্থনীতি -রাজনীতি ছিল লুটপাটসর্বস্ব ও শ্বাসরুদ্ধকর, দুর্নীতি ছিল সীমাহীন। সীজারকে হত্যার পর সীজারের ঘনিষ্ঠজন সমস্ত রোমবাসীকে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে আন্দোলন করে। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার-পরিজনদের হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন কেবল কর্নেল জামিলউদ্দিন এবং তাকে ঘটনাস্থলেই খুন করা হয়। আর করেছিল একজন পাহারারত পুলিশ, তাকেও সেখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর কলঙ্ক কয়েকজন উচ্চভিলাষী জুনিয়র অফিসার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের নির্দেশ এবং দেশী প্রতিক্রিয়াশীলদের সাহায্যে জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি দ্বারা “সূর্যসন্তান” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
মহাভারতে “সূর্যসন্তান” বলে খ্যাত হয় সূর্যের ঔরসে কুন্তীর জারজ সন্তান কর্ণ। বোধ করি সেই অবৈধতার কথাই সার্বিকভাবে গ্রাস করেছিল স্বঘোষিতকেই, তাই জাতির পিতার ঘাতক বাংলার কানীজ পুত্রদের “সূর্যসন্তান” বলে সম্মানিত করেন স্বয়ং খুনি অবৈধ রাষ্ট্রপতি মোশতাক।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ছাত্র সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, “আলেন্দের মতো মরে যাব, কিন্তু মাথা নোয়াব না।” ৭৫ এর ১৫ আগস্ট আকস্মিক হয়ে দেখা দিয়েছিল নিঃসন্দেহে- কিন্তু কালের দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে ঘটনা যখন বিশ্লেষণ করি তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্তের সাথে উপযোগী তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি ঘটনা তৈরিতে কিভাবে সক্ষম হয়েছিল। তবে আমরা এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আশাবাদী। তাঁর আমলেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার ও রায়ের আদেশ কার্যকর হয়েছে। পলাতক আসামিদের দেশে ফেরত এনে ফাঁসি কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য জননেত্রীর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তাঁর নেতৃত্ব আগামীতে থাকলেও পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

লেখক : ট্রেজারার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]