গণতন্ত্র রক্ষায় জগদ্দল পাথর সরাতে হবে : মঈন খান
ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের নের্তৃত্বাধীন সরকার জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের উপর চেপে বসেছে, গণতন্ত্র রক্ষায় এটাকে সরাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। শনিবার ঢাকার বিয়াম অডিটোরিয়ামে ‘কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত বিবিসি সংলাপে প্যানেল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
ড. আব্দুল মঈন খান ছাড়াও অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন- প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, রোম ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অরগানাইজেশন (আইডিএলও) এর মহাসচিব ও মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন খান এবং বাংলাদেশ অ্যালায়েন্স ফর ইউমেন লিডারশিপে’র নির্বাহী পরিচালক নাসিম ফেরদৌস।
ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, এই সরকার সম্পূর্ণ জনপ্রতিনিধিত্ববিহীন। শুধুমাত্র অস্ত্রের জোরে টিকে রয়েছে। তাই তারা কোন সরকার হতে পারে না। নির্বাচনের ফলাফল রিমোট কন্ট্রোলে নির্ধারিত হবে বলেই বিএনপি নির্বাচনে যায়নি।
২০০৮ সালেও আওয়ামী লীগ ব্যাপক কারচুপি করে ক্ষমতায় গিয়েছিলো। কিন্তু সেখানে বিএনপি অংশ নিয়েছিলো দেখে সরকার বৈধতা পেয়েছিলো।
‘একটি অন্তবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা কতোটুকু’ এ এস এম এনামুল হক নামে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, অন্তবর্তী নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তেমন পরিস্থিতি হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। ৫ জানুয়ারিতে জামায়াত-বিএনপি যে নৈরাজ্য চালিয়েছে তাতে সম্প্রতি কোনো অন্তবর্তীকালীন নির্বাচন দেবে না সরকার।
নাসিম ফিরদৌস বলেন, অন্তবর্তী নির্বাচন যখন দুইদল একমত হলে সম্ভব। তা না হলে একই কথা হবে। আইরিন খান বলেন, জনতা অধৈর্য হয়ে পড়ছে তা কিন্তু দৃশ্যমান। শুধু অন্তবর্তী নির্বাচন হলে সমাধান হবে না।
মঈন খান বলেন, আমরা গণআন্দোলনে বিশ্বাসী। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
“গণতন্ত্র যদি হয় একটি দেশের সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা, তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের কি সেই ব্যবস্থা আছে”? ঢাবি শিক্ষার্থী উর্মি দেব এমন প্রশ্নের জবাবে প্যানেল আলোচনায় ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণের প্রতিনিধিত্বের সরকার। দেশের সব মানুষ সংসদে কথা বলতে পারেন না সে জন্য তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন করেন। যে দেশে অর্ধেকেরও বেশি সংসদীয় আসনে নির্বাচন ছাড়া প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় সেখানে কিভাবে গণতন্ত্রমনা সরকার আসবে?
৫ জানুয়ারির নির্বাচন শুধু ভোটারবিহীন বললেই ভুল হবে, বলতে হবে ভোটবিহীন নির্বাচন।
বিডিএডব্লিওএল এর নির্বাহী নাসিম ফেরদৌস বলেন, জনপ্রতিনিধিত্বই বা নির্বাচনই গণতন্ত্রের মূল কথা নয়। ৫ জানুয়ারি আওয়ামীলীগের সাথে ঐক্যমত না হলেও বিএনপি’র উচিত ছিল নির্বাচনে যাওয়া।।
প্যানেল আলোচনায় নিজের বক্তব্যে আইরিন খান বলেন, আমরা সামনে কিভাবে এগিয়ে যাবো তা আগে ভাবা দরকার। যা হবার তা হয়ে গেছে। সামনে কি হবে তাই ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলেও একমাত্র মাপকাঠি নয়। দেশে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চা নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশে নির্বাচনের আগে ও পরে মানবাধিকার, মিডিয়ার স্বাধীনতা ও সুশাসন কোনোটাই রক্ষিত হয় নি।
এইচ টি ঈমাম বলেন, ৫ জানুয়ারি জনগণের অংশ গ্রহণেই নির্বাচন হয়েছে। তিনি বলেন, খেলায় দুই দল থাকে। কিন্তু এক দল না আসলে তো ওয়াকওভার পাবোই- মন্ত্র করেন ইমাম।
প্যানেল আলোচকদের বক্তব্যে মন্তব্য করতে গিয়ে এক দর্শক বলেন, যেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারি নি সেখানে গণতন্ত্র কোথায়?
৫ই জানুয়ারির পর দেশে একনায়কতন্ত্রের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে এইচটি ইমাম বলেন, (মার্কিনীরা) মাইলামরা ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে আসে। তাদের কথা গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার।
তবে এক দর্শক বলেন, গনতন্ত্র কোনো খেলা না। পরিবারতন্ত্রের বাইরে এসে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে।
‘নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি নয় জনগণ মাশুল দিচ্ছে’ দর্শকের করা এমন এক প্রশ্নের জবাবে মঈন খান বলেন, জনগণ নয় মাশুল দিচ্ছে বিএনিপি নেতাকর্মীরা। সরকার বিএনপিকে কোনঠাসা করতে মামলার হামলা করছে।
প্যানেল আলোচক আইরিন খান বলেন, আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকার যতোই উন্নয়ন করুক তা হবে একক ও স্বৈরাচারি। কারণ রাজনৈতিক ঐক্যমতহীন সরকার। দেশের উন্নয়নে ও গনতন্ত্রের স্বার্থে সব দলকে ঐক্যমতের ভিত্তিতে কাজ করা দরকার।
শাকিলা মাহজাবীন নামে এক দর্শক প্রশ্ন করেন, আগামী নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল যাতে অংশ নিতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা কি খুঁজে পাওয়া যাবে? জবাবে এইচ টি ইমাম বলেন, আদালত সংবিধান সংশোধন করেছে। সেখানে সরকারের কি করার আছে?
তিনি আরও বলেন, বিএনপি বলছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯৬ আমলে খালেদা কি বলেছিলেন স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি আসবে না তা আমরা কি করে বলবো, আমরা কলা ঝুলিয়ে রাখবো না। তারা আসলে আসুক, না আসলে নেই।
কোনো ফর্মুলা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংবিধানেই সমাধান আছে। যেমন সার্চ কমিটির করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে কাজ করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। নির্বাচন হতে হবে সংবিধান অনুযায়ী। সংবিধানের বাইরে আমরা নির্বাচন করতে পারবো না।
ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস হলে আজকের সরকার কিভাবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে? সংবিধান কোন বাইবেল না যে তা পরিবর্তন করা যাবে না। সহজ সমাধান হলো আলোচনা। আলোচনা থেকেই সমাধান আসবে।
আইরিন খান বলেন, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলের ইচ্ছা, মনোবল আর দূরদর্শিতা প্রয়োজন। জনগণের চাপেই দলগুলোকে আসতে হবে নির্বাচনে। জনতার মত সব ক্ষমতার উৎসব হলে জনগণ তো চাইছেই সমাধান।
নাসিম ফিরদৌস বলেন, ফরমুলা হচ্ছে আমাদের নেতাদের আমিত্ব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দুই নেতা যদি নিজেরা হস্তক্ষেপ না করে, সংলাপে বসে আর সবার মতামত মেনে নিতে পারেন তবেই সমাধান সম্ভব।
“একটি দেশের উন্নয়নের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কতটা জরুরী” এমন প্রশ্নের উত্তরে আইরিন খান বলেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র হাতে হাত ধরে যাবে। এমন অনেক গবেষণা আছে, যেখানে গণতন্ত্র ঠিকমতো চলছে। যেখানে সুশাসন আছে, সেখানে উন্নয়ন স্থায়ী হয়।
এইচ টি ইমাম বলেন, গণতন্ত্র আর উন্নয়ন একসাথে চলতে পারে। সিঙ্গাপুরসহ পার্শ্ববর্তী আরও অনেক দেশের মতো আমরাও পরিবারতন্ত্র চাই না। জনগণের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উন্নয়ন আনা হচ্ছে।
নাসিম ফিরদৌস বলেন, উন্নয়নের সাথে স্যাক্রিফাইস জড়িত। জনগণকেও স্যাক্রিফাইস করতে হবে।
এ বিষয়ে মঈন খান বলেন, উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র ১০০ ভাগ জরুরি। বাংলাদেশের মানুষ না খেয়ে থাকতে রাজি আছে। কিন্তু গণতন্ত্রকে ছাড়া একদিনও নয়।
অনুষ্ঠানটির প্রযোজনা করেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ এবং উপস্থাপনা করেন আকবর হোসেন। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন এবং বিবিসি বাংলার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। এতে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বিষয়ে দর্শকরা সরাসরি প্যানেল সদস্যেদর কাছে প্রশ্ন বা মতামত প্রকাশ করে অংশ গ্রহণকারীরা।