ঢাকা-১৫

জামায়াত আমিরের আসনে ৪৯ শতাংশই নারী ভোটার, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

রায়হান আহমেদ
রায়হান আহমেদ রায়হান আহমেদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৩৯ পিএম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ঢাকা-১৫ আসনের ভোটার খাদিজা বেগম, ছবি: জাগো নিউজ

রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের বাসিন্দা খাদিজা বেগম (৪৫)। প্রতিদিন ১০ নম্বর গোল চত্বরে ওভারব্রিজে ফুল বিক্রি করেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনের ভোটার খাদিজা। নারীর কাজ করার স্বাধীনতা আর চাঁদাবিহীন সমাজের প্রত্যাশা রেখে ভোট দেবেন তিনি।

সম্প্রতি ঢাকা-১৫ আসনে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কথা হয় খাদিজা বেগমের সঙ্গে। সে সময় জাগো নিউজকে প্রত্যাশার কথা বলেন তিনি।

খাদিজা বলেন, ‘১৫ বছর আগে খুলনায় আমাগো ঘর পুড়ে গেছিল। তখন খালেদা জিয়া ৫০ হাজার টাকায় ঘর বানাইয়া দিছে। সেই সাহায্য আমার এখনো মনে আছে। আমি ভোটটা হয়তো ধানের শীষেই দেবো।

ঢাকা-১৫ আসনে তালতলা এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ হোসেন। মিরপুর এলাকায় রিকশা চালান ১০ বছর যাবত। জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই আসনে ডা. শফিকুর রহমান আগে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। তখন থেকেই তাকে চিনি। আমিরের সঙ্গে মনে হয় না বিএনপির ওই প্রার্থী জিতে আসবে। সারাদেশে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে (ছাত্র সংসদ) তারা জিতেছে, এখন জাতীয় নির্বাচনেও তাদের জেতার সম্ভাবনা আছে।’

আরও পড়ুন:

‘কড়াইল বস্তির ভোট যার, সংসদ সদস্য পদ তার’ 

চা-কফির চুমুকে নির্বাচনি আলাপ, জমজমাট ব্যবসা 

নারীদের ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট করলেন জামায়াত আমির 

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-১৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ জন। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত রয়েছেন চারজন হিজড়া ভোটার। মোট ভোটারের প্রায় ৪৮ দশমিক ৯৩ শতাংশই নারী, যা এই আসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা-১৫ আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোঃ শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মোঃ শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, জাতীয় পার্টির মোঃ সামসুল হক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আহাম্মদ সাজেদুল হক, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, আমজনতার দলের মোঃ নিলাভ পারভেজ, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদের মোঃ আশফাকুর রহমান ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) মোবারক হোসেন। 

রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা-১৫ আসনেও বদলে গেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী থেকে এবার সরাসরি প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত। তাদের লড়াই ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উত্তাপ। বিশেষ করে একই নামের দুই শফিকের মুখোমুখি অবস্থান ও একজন প্রার্থী দলীয় প্রধান হওয়ায় এই এলাকায় মানুষের মাঝে নানা কৌতুহলও রয়েছে।

বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ঢাকা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির টানা তৃতীয় মেয়াদের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সে সময় জামায়াতের নিবন্ধন না থাকায় তিনি বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। বিতর্কিত সেই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে পরাজিত হন।

৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। এরমধ্যে একজন প্রার্থী দলের প্রধান কিংবা আমির হওয়ায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাড়তি গুরুত্ব এই আসনে।

জামায়াত ইসলামীর দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আমির নির্বাচনি জনসভায় সারাদেশে চষে বেড়াচ্ছেন। এরমধ্যে সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি সমাবেশও করছেন এই আসনে। এছাড়া পথসভা ও অলিগলিতেও যাচ্ছেন।

তবে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল মিল্টনের তুলনায় এই আসনে জামায়াত আমির কিছুটা কম সময়ই দিচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শফিকুল মিল্টন প্রতিদিন অলিগলি থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় যাচ্ছেন।

জামায়াত আমির দলের প্রধান হওয়ায় প্রতিদিন সময় দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী প্রচার সম্পাদক শাখাওয়াত কাফি।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, এই আসনে প্রতিদিন প্রচারণা হচ্ছে। আমাদের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইনের নেতৃত্বে পথসভা হচ্ছে। মা-বোনরা দাঁড়িপাল্লার ভোট চাচ্ছেন, যেহেতু এই আসনে অর্ধেক নারী। আমরা দেখেছি বিএনপির পক্ষে থেকেও এই আসনে নারীরা গিয়ে ভোট চাচ্ছে, অথচ কিছু দিন আগেই আমাদের নারীসহ জামায়াত কর্মীদের ওপর তারা হামলা করেছে।

সরেজমিনে আসনটি ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের ব্যানারই বেশি। শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুর ১০ রাস্তার দুই পাশেই ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার ব্যানার রয়েছে। অন্যদিকে, শুধু মিরপুর-১০ গোল চত্বর এলাকায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকের কিছু পোস্টার দেখা গেছে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকার জলাবদ্ধতা, মিরপুর-১০ নম্বর যানজট, চুরি-ছিনতাইসহ চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটই মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন তারা।

মিরপুর-১০ নম্বরের শাহ আলী প্লাজার সামনে ব্যবসায়ী রুহুল কুদ্দুস জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করাটাই আমাদের জন্য কষ্টের। জামায়াত চাঁদার বিরুদ্ধে যে কঠোর কথা বলছে, জানি না কতটুকু বাস্তবায়ন হবে। সবাই বলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধে তাদের পদক্ষেপ এখনো দেখিনি। এখানে বৃষ্টি হলে এখনো পানি জমে, যানজট আছে। যেই ব্যক্তিই ক্ষমতায় আসুক, মিরপুরের প্রাণকেন্দ্রের উন্নয়ন হলেই হলো।’

কাজীপাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিএনপির এই প্রার্থী নতুন হলেও ধানের শীষ প্রতীকের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। অন্যদিকে, আমির এর আগেও নির্বাচন করেছেন এই আসনে। এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আশা করছি, সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বের হয়ে আসবে।

আরএএস/এসএনআর/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।