বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কারের অঙ্গীকার বিএনপির
গত দেড় দশকে ব্যাপক দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, ব্যয়বহুল স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার কারণে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যয়বহুল ও অদক্ষ হয়ে পড়েছে বলে মনে করে বিএনপি। দলটির মতে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে টেকসই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
বিদ্যুৎ খাত
ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। সঞ্চালন লাইন বাড়িয়ে ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে নেওয়া হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা পুরোপুরি আধুনিক করে সিস্টেম লস কমানো এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে স্মার্ট গ্রিড চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বিএনপি জানিয়েছে, ক্যাপাসিটি চার্জসহ ভাড়াভিত্তিক ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো হবে এবং চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করতে ‘লিস্ট কস্ট’ ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
আরও পড়ুন
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডসহ ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতি
জিয়াউর রহমান দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে মুক্ত করেছিলেন
বাড়ি, শিল্পকারখানা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি নিরীক্ষা (এনার্জি অডিট) চালু করা হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার কারণ চিহ্নিত করে দেশীয় জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
জ্বালানি খাত
বিএনপি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ে কোনো গোপন চুক্তি করা হবে না এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তিগুলো পুনর্গঠন করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত এবং রাষ্ট্রের যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে।
ইশতেহারে ধাপে ধাপে পাঁচ মিলিয়ন টন পরিশোধন সক্ষমতার একটি নতুন অপরিশোধিত তেল শোধনাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে স্থাপন করা হতে পারে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও খনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
জ্বালানির দাম সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ রাখতে ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা হবে। প্রয়োজন হলে স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে। গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা ও মূল্যনীতিও পর্যালোচনা করে গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
আঞ্চলিক ও আন্তঃসীমান্ত গ্যাস পাইপলাইন এবং জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের কথাও বলেছে বিএনপি। প্রত্যন্ত ও বঞ্চিত এলাকায় সৌর হোম সিস্টেম, মাইক্রোগ্রিড ও বায়োগ্যাস প্রকল্পের মাধ্যমে জ্বালানি বৈষম্য কমাতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
ইশতেহারে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগে কর ছাড় ও স্বল্পসুদে সবুজ অর্থায়ন দেওয়া হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি।
আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা অনুসন্ধান এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পারমাণবিক জ্বালানির নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কোনো দুর্নীতি থাকলে তা তদন্তের অঙ্গীকার করেছে দলটি। নগর ও বন্দর এলাকায় জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন প্রকল্প চালুর কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেএইচ/কেএসআর