বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ সবার আগে’র অঙ্গীকার

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৬ পিএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করছেন তারেক রহমান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছে। এতে ‘বাংলাদেশ সবার আগে’ নীতির অঙ্গীকার করা হয়, যেখানে সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততায় জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইশতেহারে বিএনপি উল্লেখ করেছে, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের কল্যাণ- এই বিষয়গুলোই তাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে।

বিএনপি জানিয়েছে, সমতা, ন্যায়সংগততা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক ভূমিকা পালন করবে।

দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক প্রসঙ্গে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, আন্তর্জাতিক বিধি ও নিয়ম মেনে সমতা, বাস্তববাদ এবং পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলায় গুরুত্ব দেবে দলটি। আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারা জানায়, বাংলাদেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না।

ইশতেহারে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা, জোট ও উদীয়মান আঞ্চলিক ব্লকের সঙ্গে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে বিএনপি উদ্যোগ নেবে। বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্পখাতে মূল্য সংযোজন বাড়াতে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তির প্রবেশাধিকার বাড়াতে শ্রম ও অভিবাসন কূটনীতি জোরদার করা হবে।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বিএনপি জানিয়েছে, প্রধান বৈশ্বিক শক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা সুরক্ষায় কার্যকর কূটনীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। কৃষি ও শিল্পের কাঁচামাল নিশ্চিত করতে এবং বাণিজ্য সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনতে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা- জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, উপকূলীয় নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি মোকাবিলায় আঞ্চলিক কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করা হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বিএনপি জানিয়েছে, সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে তাদের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

সীমান্তবর্তী নদীর পানিবণ্টন প্রসঙ্গে অঙ্গীকার করে বিএনপি বলেছে, পদ্মা, তিস্তা এবং বাংলাদেশের সব আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে কোনো হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং জাতীয় সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

ইশতেহারে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বিএনপি। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর পুঁজি এবং বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ একত্র করে অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অংশীদারত্বের আওতায় পারস্পরিক খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামরিক শিল্প ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে বিএনপি বলেছে, এ সংকটের দ্রুত সমাধান তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। গত আট বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতির অভাবের জন্য জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে দলটি। তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার সফলভাবে দুবার রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করেছিল। ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা হবে।

ইশতেহারে সফট পাওয়ার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিকেও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষক, গবেষক, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বেসরকারি নীতিনির্ধারক ও তরুণ রাজনীতিকদের অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচি গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতিমনস্ক তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক পরিসরে যুক্ত করে দেশের সফট পাওয়ার শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বিএনপি জানিয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী করতে জনবল নিয়োগ বৃদ্ধি, বিদেশে মিশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় ও বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনগুলোর মানবসম্পদ, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে।

কেএইচ/এএমএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।