ফেলে দেওয়া প্লাস্টিককে সম্পদে রূপ দিচ্ছে প্রাণ-আরএফএল
- বছরে ৬৯ হাজার মেট্রিক টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার
- বছরে সাশ্রয় ৪০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা
- রিসাইক্লিংয়ে তৈরি শতাধিক সামগ্রী, হচ্ছে রপ্তানিও
- ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র নির্মাণ
বাসার প্লাস্টিকের যে চেয়ারটি অনেক বছর ব্যবহারের পর ভেঙে গিয়েছিল, তা হয়তো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল কোনো এক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীর কাছে। এখন কয়েক হাত ঘুরে এর ঠাঁই হয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে। যেখানে স্তূপ হয়ে আছে পলিথিন, বালতি, ড্রাম, বোতলসহ নানান ধরনের পুরোনো প্লাস্টিক। সাধারণ চোখে এগুলো বর্জ্য হলেও, এখানে তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়ে ফিরে পাচ্ছে নতুন রূপ।
রিসাইক্লিং প্ল্যান্টের বিশাল মেশিনের ভেতরে ফেলে চূর্ণ করা, পানি দিয়ে ধোয়া, শুকানো ও গলানোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এসব প্লাস্টিক পরিণত হচ্ছে নতুন পণ্য তৈরির মূল কাঁচামালে। সেই কাঁচামাল দিয়েই আবার তৈরি হচ্ছে চেয়ার-টেবিল, ফুলের টব, ময়লার ঝুড়ি, মুরগির খামারের পাত্র, বাগানের জিনিসপত্রসহ শতাধিক সামগ্রী।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে পুরোনো প্লাস্টিক রিসাইকেল করে নতুন পণ্য উৎপাদনের কারখানা/ছবি: জাগো নিউজ
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ঘুরে এই কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। জানা গেছে, সেখানে কীভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করা হয়। ফলে পরিবেশ দূষণ কমে এবং হ্রাস পায় কার্বন নিঃসরণ।
বর্তমানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে, যা বছরে প্রায় ৬৯ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছাচ্ছে। এই পরিমাণ প্লাস্টিকের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে বছরে ৪০০ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হতো। এখন উৎপাদন ব্যয় কমছে। ফলে দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
আমরা প্রতিদিন প্লাস্টিক আলাদা করা ও মেশিনে দেওয়ার কাজ করি। আগে জানতাম না প্লাস্টিক আবার এভাবে ব্যবহার করা যায়। এখন বুঝতে পারি, এগুলো পরিবেশের জন্যও ভালো।- রিসাইক্লিংয়ে যুক্ত কর্মী শিউলি আক্তার
যাত্রা শুরু যেখান থেকে
মানুষের আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তবে এর সুবিধার পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা দেশে এক বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এমন বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তিশালী সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলা সম্ভব।
এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ২০১২ সাল থেকে প্লাস্টিক রিসাইকেল কার্যক্রম শুরু করে। হবিগঞ্জে প্রায় এক হাজার ১০০ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের বৃহৎ শিল্প পার্কে উৎপাদন হয় বিভিন্ন ধরনের পণ্য। এখানেই গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ ও অত্যাধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট, যেখানে সারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য নতুন আকারে ব্যবহার উপযোগী হয়ে ফিরে আসে।
রিসাইকেল করার জন্য সংগ্রহ করা প্লাস্টিকের পুরোনো পণ্যের স্তূপ/ছবি: জাগো নিউজ
স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে কাজ
সরেজমিনে দেখা গেছে, রিসাইক্লিং সেন্টারে কর্মীরা তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কাজ করছেন। মেশিনে পুরোনো প্লাস্টিক দেওয়া থেকে শুরু করে নতুন পণ্য তৈরি পর্যন্ত বিশাল এ কর্মযজ্ঞে কাজ করছেন সহস্রাধিক শ্রমিক।
রিসাইক্লিংয়ে যুক্ত কর্মী শিউলি আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন প্লাস্টিক আলাদা করা ও মেশিনে দেওয়ার কাজ করি। আগে জানতাম না প্লাস্টিক আবার এভাবে ব্যবহার করা যায়। এখন বুঝতে পারি, এগুলো পরিবেশের জন্যও ভালো।’
একই ইউনিটে কাজ করা মো. সোহেল মিয়া বলেন, ‘আগে এসব প্লাস্টিক ফেলে দেওয়া হতো। এখন এগুলো আবার নতুন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। এখানে কাজ করে আমাদেরও আয়-রোজগারের সুযোগ হয়েছে।’
আরও পড়ুন
চীনের বিভিন্ন শহরে হবে ৩০টি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেট
রাষ্ট্রায়ত্ত ৫০ পাট-বস্ত্রকলের মাত্র ৯টিতে ঘুরছে চাকা
শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিই ‘অরক্ষিত’
সার্কুলার ইকোনমি গড়ছে ‘টেল প্লাস্টিকস’
প্রাণ-আরএফএলের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান টেল প্লাস্টিকস এরই মধ্যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার খাতে দেশে একমাত্র ও পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার ইকোনমি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। তারা জানিয়েছে, পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিতরণ, বিক্রি, ভোক্তার ব্যবহার এবং পরে বর্জ্য সংগ্রহ ও রিসাইকেল প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তারা নতুন পণ্য সৃষ্টি ও বাজারজাত করছে।
টেল প্লাস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ১২টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। সেখান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে পাঠানো হয় রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে। যেখানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে শতাধিক নতুন পণ্য। এসব পণ্য শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের ১২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে প্ল্যান্টে কাজ করছেন কর্মীরা/ছবি: জাগো নিউজ
এরই মধ্যে টেল প্লাস্টিকস আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি ‘গ্লোবাল রিসাইকেল্ড স্ট্যান্ডার্ড (জিআরএস)’ সার্টিফিকেট অর্জন করেছে, যা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান।
পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক কেজি পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক প্রায় এক দশমিক ০৮ কেজি কার্বন নিঃসরণ কমায়। সেই হিসেবে প্রাণ-আরএফএল বছরে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে, প্রতি মেট্রিক টন পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক প্রায় ৮১০ ঘনমিটার ভাগাড় রক্ষা করে। ফলে বছরে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনমিটার ভাগাড় বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।
দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্লাস্টিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একে আর বর্জ্য হিসেবে দেখা যাবে না, বরং এটি মূল্যবান সম্পদ।- টেল প্লাস্টিকসের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান
এছাড়া প্রাণ-আরএফএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের শূন্য নিঃসরণ ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে তরল বর্জ্য পদার্থ পরিশোধনের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইটিপি (বর্জ্য পরিশোধনাগার) রয়েছে। সেখানে পরিশোধনের পর ওই পানি পুনরায় রিসাইকেল কাজে ব্যবহার করা হয়।
শুধু পরিবেশ নয়, এ উদ্যোগ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। রিসাইকেল সংক্রান্ত বিশাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি প্রায় এক হাজার ২০০ কর্মী যুক্ত এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কারখানায় উৎপাদন করা হচ্ছে নতুন পণ্য/ছবি: জাগো নিউজ
২০৩০ সালের মধ্যে যে পরিকল্পনা
বর্তমানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের মোট প্লাস্টিক ব্যবহারের প্রায় ১৫ শতাংশ পুনরায় ব্যবহার করছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। বছরে প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করার সক্ষমতা রয়েছে তাদের।
রিসাইক্লিং খাতে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পিইটি বোতল, ব্যবহৃত টায়ার ও ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং, জৈবপচনশীল নন-উভেন ব্যাগ উৎপাদন এবং টেক্সটাইল শিল্পের জন্য পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক থেকে সুতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া, একই সময়ের মধ্যে সারা দেশে মোট ১০০টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
টেল প্লাস্টিকসের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্লাস্টিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একে আর বর্জ্য হিসেবে দেখা যাবে না, বরং এটি মূল্যবান সম্পদ। রিসাইকেল ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় উদ্যোগকে সহায়তা ও নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করছি প্লাস্টিক যেন দূষণ নয়, সম্পদ হিসেবে অর্থনীতিতে ফিরে আসে।’
আরও পড়ুন
কর বাড়লে সমস্ত পণ্য ভোক্তার হাতের বাইরে চলে যাবে: আহসান খান চৌধুরী
সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তর বিকল্প নয়, প্রতিযোগিতার পূর্বশর্ত
পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে সরকার: ত্রাণমন্ত্রী
তিনি জানান, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সার্কুলার ইকোনমি পদ্ধতি এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য। প্লাস্টিক বর্জ্য যেন পরিবেশ দূষণের কারণ না হয়। একে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করে সার্কুলার ইকোনমি তৈরি করতে পারলে এই বর্জ্য সম্পদ হিসেবে অর্থনীতিতে ফিরে আসতে পারে। এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্লাস্টিককে পরিবেশবান্ধব সম্পদে পরিণত করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
মোহাম্মদ কামরুল হাসান মত দেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের রিসাইক্লিং চ্যালেঞ্জ, স্বচ্ছ সরবরাহ শৃঙ্খল ও জাতীয় সার্কুলার ইকোনমি গঠনের মাধ্যমে একটি টেকসই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। নীতিগত সহায়তা এখাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে রিসাইক্লিং শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া হলেও বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের সুবিধা সীমিত। বর্তমানে পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধরা হয়। এই ভ্যাট প্রত্যাহার এবং সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম জোরদার করা হলে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং খাত আরও দ্রুত বিকশিত হতে পারে।
আরএএস/একিউএফ/এমএমএআর/এমএফএ