তৈমূর কেন সব হারালেন?

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪২ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২২
ভোটের মাঠে নেমে এখন সব হারালেন তৈমূর আলম খন্দকার/ফাইল ছবি

অডিও শুনুন

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি—দলটির এমন সিদ্ধান্তের পরও ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছেন। অনেক জায়গায় জিতেও এসেছেন তারা। বিজয়ী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কারের তেমন কোনো নজির তৈরি করেনি বিএনপি।

নেতাকর্মীদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে নামার ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে লড়েছিলেন চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারও। কিন্তু ভোটে নাম লেখানোর পরই বিএনপির বিভিন্ন পদ-পদবি থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর ভোটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে যাওয়ার পর তাকে বিএনপি থেকেই বহিষ্কার করা হয়েছে।

এই বহিষ্কারাদেশের পর এখন আলোচনা উঠছে, ঢাকার প্রবেশমুখ নারায়ণগঞ্জের ময়দানের বর্ষিয়ান রাজনীতিক তৈমূরের ক্যারিয়ার কি এখানেই শেষ? নাকি সংস্কারপন্থিদের মতো ‘শাস্তিভোগ’ শেষে ফিরে আসবেন দলে?

তার প্রতি সহানুভূতিশীল নেতাদের একটি অংশ বলছে, তৈমূর অবস্থাদৃষ্টে বহিষ্কার হলেও ছ’মাস-এক বছরের মধ্যেই ‘প্রমোশন’ নিয়ে দলে ফিরতে পারেন। অবশ্য দায়িত্বশীলদের বক্তব্য, আপাতত তার দলে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিএনপির রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল হিসেবে বিএনপি অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও নেতাকর্মীদের স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার আগ্রহের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান নমনীয় ছিল।

গত ২ নভেম্বর ঠাকুরগাঁয়ে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি থেকে কেউ প্রার্থী হলে দলীয়ভাবে তাকে বাধা দেওয়া হবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করাটা সঠিক নয়। তাই বিএনপি এ নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না। তবে বিএনপি থেকে কেউ স্বতন্ত্র হয়ে অংশ নিলে সেখানে বাধা নেই।

তৈমূরের সমর্থক নেতাকর্মীদের প্রশ্ন, দলীয় অবস্থান এমন ‘নমনীয়’ হলে কী এমন ঘটলো যে তৈমূরকে প্রথমে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে পরে একেবারে দল থেকেই বহিষ্কার করতে হলো? কেন তিনি সব হারালেন?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি প্রতীক না দিলেও নেতাকর্মীদের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না। তৈমূর আলম খন্দকার হেরে গেছেন, তাই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে সরকারের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে। যদি জিততে পারতেন, তাহলে নিশ্চয়ই দল এ সিদ্ধান্ত নিতো না।

Taimur-3.jpg

তৈমূর আলম খন্দকার/ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে তৈমূর অংশ নেওয়ার কারণে সেখানকার নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়েছেন দাবি করে এই ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, একজন ‘আবাসিক নেতা’র কূটমন্ত্রে তাকে বহিষ্কার করা হলো। ছ’মাস-এক বছরের মধ্যে ওই নেতার যখন পদ বদলি হবে তখন প্রমোশন দিয়ে তৈমূরকে বিএনপি বরণ করে নেবে।

এর আগে অনেককে নির্বাচনজনিত কারণে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আবার তারা ফিরেও এসেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন (সংস্কারপন্থিদের) কেউ কেউ দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গিয়েছেন, জিয়া পরিবারকে আক্রমণ করেছেন, দলের নেতাকর্মীদের আক্রমণ করেছেন, তারাও দলে ফিরেছেন। বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল।

অবশ্য পল্টন থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফিরোজ আলম পাটোয়ারীর বক্তব্য, দলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। তিনি দাবি করেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিএনপির বেশ কিছু নেতাকর্মী তৈমূর আলম খন্দকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। সরকারের পাতানো নির্বাচনে ইভিএমের বৈধতা দিতে অর্থের বিনিময়ে তৈমূর আলম খন্দকার এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এবং ইভিএমের বিরোধিতা না করে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে মিষ্টি খাইয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন, এই কারণে তার বহিষ্কার যৌক্তিক।

সিনিয়র নেতাকে বহিষ্কার করায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না জানতে চাইলে ফিরোজ আলম বলেন, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। দলীয় শৃঙ্খলার চেয়ে ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন না।

এ বিষয়ে বিএনপির অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী নেতা সাইদুল ইসলাম মিন্টু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে চার কোটি টাকার বিনিময়ে অবৈধ সরকারের কাছে বিক্রি হয়ে ইভিএমকে বৈধতা দেওয়ার জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে দলের সাধারণ সদস্য পদসহ সকল পদ থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই।’

বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘স্বতন্ত্র’ লড়াই
জানা গেছে, বিএনপি দলীয়ভাবে ভোটে না গেলেও তাদের অনেক নেতাকর্মী স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েছেন ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেশ সাড়া পেয়েছেন তাদের প্রার্থীরা।

jagonews24

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে জয়ী সেলিনা হায়াৎ আইভী মিষ্টি খাইয়ে দেন পরাজিত প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে/ফাইল ছবি

হিসাব মতে, রাজশাহী বিভাগের ইউপি ভোটে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র লড়াই করে জয়ী হয়েছেন বিএনপির ২৬ জন। তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জয় এসেছে রংপুর বিভাগে, সেখানে ১৮ জন ইউপি চেয়ারম্যান হয়েছেন। ঢাকা বিভাগে বিএনপির ১৭ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম ও সিলেটে বিজয়ীর এই সংখ্যা ১৩ জন করে। এছাড়া ময়মনসিংহ, খুলনা এবং বরিশালেও তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী চেয়ারম্যান হয়েছেন।

এদিকে মেয়র পদে তৈমূর ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে লড়াই করেছেন বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ভোটে এক নারী কাউন্সিলরসহ ১০টি কাউন্সিলর পদে জয় এসেছে তাদের।

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভা নিবাচনে অংশ নেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মজিবুর রহমানও। তিনি কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়কও। মোবাইল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে জিতে এসেছেন মজিবুর। তিনিসহ বিজয়ী কোনো নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি বিএনপি।

তৈমূর যা ভাবছেন
আনীত সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করছেন তৈমূর আলম খন্দকার। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ নাকচ করার পাশাপাশি তিনি বলছেন, বিজয়ী প্রার্থীকে মিষ্টিমুখ করানোর বিষয়টি সৌজন্যবোধ।

নির্বাচনে অংশগ্রহণে কেউ বাধা দেয়নি দাবি করে তৈমূর বলেন, নির্বাচনের কারণে অন্য কোথাও কাউকে বহিষ্কার না করা হলেও আমাকে কোনো কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করা হয়েছে।

তৈমূর আলম বলেন, দল আমাকে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন আমার সামনে দুটি কাজই খুঁজে পেয়েছি। একটি হলো যাকে আমি মায়ের মতো শ্রদ্ধা করি, বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য এবং ভোট ডাকাতির মেশিন ইভিএমের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা। আমি বিএনপির পক্ষেই কাজ করে যাবো।

যা বলছেন দায়িত্বশীলরা
তৈমূর আলম খন্দকারকে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার ও এ টি এম কামালকে (নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট) প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদধারী কেউ নির্বাচন করলে তাকে বহিষ্কার করা হবে।

শিগগির তৈমূর আলম খন্দকারকে দলে ফেরানোর কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আপাতত দলের এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

কেএইচ/এইচএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]