কোটার ভিত্তিতে নয়, দেশ চলবে মেধার ভিত্তিতে

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:৪৮ এএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
রহমান মৃধা ও তার সহধর্মিণী

গণঅভ্যুত্থানের মূল কথা ছিল, কোটাভিত্তিক নয়, মেধাভিত্তিক দেশ চাই। কিন্তু আজ দেখছি সেই কোটাই বহাল রয়েছে। এমন তো কথা ছিল না। এখনও পরিবারতন্ত্র আছে, এখনও কোটা সিস্টেম আছে, এখনও তেল দেওয়া চলে, এখনও উড়ে এসে জুড়ে বসার রীতি রয়ে গেছে। আমার প্রশ্ন, আমরা যদি সেই অতীতের মতোই থাকবো, তাহলে কি দরকার ছিল এত মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার।

এই আন্দোলন কি শুধু মুখ বদলের জন্য ছিল, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর জন্য। যদি চরিত্র না বদলায়, তাহলে এই রক্তের দায় কে নেবে।

ড. ইউনূসের একমাত্র এবং একটি কাজ ছিল সংস্কার করা। কিন্তু তিনি সেই কাজটিও ঠিকমতো করতে পারেননি। হয়তো বলা হবে, তাকে করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তখন তার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। হয় সেই সংস্কার আদায় করা, নয়তো সরে যাওয়া। তিনি দুটোর একটিও করেননি। সংস্কার না করে থেকে যাওয়া মানে পুরোনো ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া। ইতিহাস এটিকে কোনোদিন দায়িত্বশীলতা বলে মানে না।

ঋণ খেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে কীভাবে কেউ রাজনীতির মাঠে নামতে সাহস পায় শহিদের রক্তের ওপর দিয়ে। এই সাহস কোথা থেকে আসে। কে এই সাহস জোগায়। যদি ড. ইউনূস জবাব না দেন, তাহলে কে দেবে। রাষ্ট্র কি শুধু সুবিধার সময়েই নৈতিকতার কথা বলে।

ঋণ খেলাপি, তেলবাজি এবং অর্থ পাচারের ফলে দেশের মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, এরা একা কীভাবে এত বড় অপরাধ করতে পারে। কোটি কোটি টাকা কি আকাশ থেকে নামে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বোর্ড সদস্য এবং প্রভাবশালী মহলের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। ঋণদাতাদের ছাড় দিলে চলবে কেন। তাদের এই কুকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে বলেই নিয়ম ভেঙে, যোগ্যতা ছাড়া, জামানতহীনভাবে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়। দায় শুধু ঋণ খেলাপিদের নয়; যারা কলমের এক আঁচড়ে জনগণের টাকা লুটের সুযোগ করে দিয়েছে, তারাও সমান দায়ী। এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দুর্নীতির এই চক্র কখনোই ভাঙবে না।

এই অর্থনৈতিক অপরাধই পরে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নেয়। লুটের টাকাই নির্বাচনের পুঁজি হয়, প্রভাব কেনা হয়, বিচারকে প্রভাবিত করা হয়। ফলে যারা রাষ্ট্রের নিয়মকে পায়ের তলায় কুঁচকাচ্ছে, তারাই জনমুখে নৈতিকতার ভাষণ দেয়। এই লজ্জাহীন, অসৎ মানুষগুলো সমাজের এলিট সেজে ঘুরে বেড়ায় এবং নির্বিঘ্নে দেশের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে।

আর আমরা নীরবতার সঙ্গে এসব অপরাধ দেখছি, অথচ কিছুই করতে পারছি না বা করছি না। এই সত্যটা ভাবলেই নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মায়, কারণ আমাদের এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।

শত সহস্র শহিদের মৃত্যু, অসংখ্য সংগ্রামীর পঙ্গুত্ববরণ, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ, এর কোনো কিছুই কি আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ওপর একটুও আঁচ কাটেনি। মনে হচ্ছে, বিশাল এই রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান আমাদের শাসক, প্রশাসক ও বিচারকদের মানসিকতায় কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।

কী করে খুনসহ ৪৫ জন দণ্ডিত ব্যক্তি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছে। দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও ২২ জন দণ্ডিত লোকের প্রার্থিতা বৈধতা পায় কীভাবে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় অনেক খারাপ, এ বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। আমরা সবাই তা দেখছি। ঘরোয়াভাবে আলোচনা করছি। ক্ষোভ প্রকাশ করছি। কিন্তু এর বেশি কিছু করছি না। এই নীরবতাই আজ সবচেয়ে বড় সমস্যা।

আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সময়টা মনে আছে কি। তার বাবার মৃত্যুর পর ভারত থেকে খুলনায় আগমনের মুহূর্তটি ছিল বিরল। তখন তিনি ক্ষমতার বাইরে ছিলেন। তখন তার মধ্যে একটি মানবিকতা ছিল। তিনি পরিবারহারা একজন একাকী মানুষ ছিলেন। তখনো তিনি মনুষ্যত্বের ভারসাম্য পুরোপুরি হারাননি।

পরবর্তীতে সাংবাদিকরা সাক্ষাৎ করেছেন। বলেছেন, প্রশ্ন করতে আসেনি, সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছি। সেই সৌজন্যই ধীরে ধীরে তেলে পরিণত হয়। দিনের পর দিন তেল দিতে দিতে একসময় তাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে দেওয়া হয়। ফলাফল আজ সবার সামনে। শুধু তিনি নন, তার বাকি পরিবারসহ আজীবনের জন্য দেশচ্যুতির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এই একই চর্চা এখন বর্তমানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। যে মাত্রায় তেল দেওয়া শুরু হয়েছে, তাতে ফল আসতে বেশি সময় লাগবে না। ইতিহাস আমাদের বারবার জানিয়েছে, পরিণতি আলাদা হয় না। ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু পরিণতি বদলায় না। কারণ সমস্যা কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, সমস্যা এই তেলবাজ সংস্কৃতি।

আমি জোর গলায় বলতে পারি, দেশের মানুষের অধঃপতনের পেছনে তেলবাজ, দুর্নীতিবাজ এবং নীরবতার দলে থাকা মানুষগুলোর দায় সবচেয়ে বেশি। কারণ দুর্নীতিবাজ একা কিছু করতে পারে না। তাকে জায়গা করে দেয় তেলবাজরা। তাকে টিকিয়ে রাখে আমাদের নীরবতা।

এই দেশে প্রতিবারই একই গল্প লেখা হয়। মানুষ জীবন দেয়। পরিবর্তনের কথা ওঠে। তারপর সেই ভাষাটাই ধীরে ধীরে ক্ষমতার সুবিধাজনক শব্দে পরিণত হয়। কোটা না মেধা কোনো স্লোগান ছিল না। এটি ছিল একটি নৈতিক চুক্তি। রাষ্ট্র বলেছিল, আমি আর পক্ষপাত করবো না। সমাজ বলেছিল, আমরা আর মেনে নেবো না। আজ যদি সেই কোটাই বহাল থাকে, শুধু নাম পালটে, কাঠামো পালটে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই রাষ্ট্র কি কিছুই শিখলো না।

আজকের বাংলাদেশ অতীতের চেয়ে খারাপ কেন। কারণ আগে মানুষ অন্তত বিশ্বাস করতো, পরিবর্তন সম্ভব। এখন মানুষ জানে, মুখ বদলাবে, খেলা বদলাবে না। এই বিশ্বাসভঙ্গই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ বিশ্বাসহীন সমাজে সংস্কার হয় না, শুধু বিস্ফোরণ হয়।

এখন প্রশ্ন, নতুন স্লোগান দরকার কি না। না। দরকার ধারাবাহিক প্রশ্ন। ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা। তেল নয়, জবাবদিহি চাওয়া। নীরবতা নয়, দায়িত্ব নেওয়া। না হলে আমরা বারবার একই জায়গায় দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করবো।

তবুও এত কিছুর পরেও আমি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে যখন দেখি, বেশ কিছু নেতা ও প্রার্থী মেধার গুণে রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে পরিচয় নয়, উত্তরাধিকার নয়, বরং যোগ্যতার প্রশ্নটি সামনে আসছে। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাদের সহধর্মিণীরাও পাশে আছেন এবং তারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে, নানা পেশায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

এই চিত্রটি আমাদের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। বিশ্বায়নের এই সময়ে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হলে এই বাস্তব চিত্রটিও সামনে আনতে হবে। ইসলামের আদর্শ নারী মানেই ঘরের চার দেয়ালে বন্দি, এই প্রচলিত ধারণাটি ভাঙা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক চর্চায় আমরা দেখছি, নারীদের সম্মান দেওয়া হয়, তাদের সক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয় না, তাদের বদ্ধঘরে আটকে রাখার সংস্কৃতি সেখানে বাধ্যতামূলক নয়। এটি ভালো বা খারাপের চূড়ান্ত রায় নয়, বরং একটি পর্যবেক্ষণ, যা ন্যায্য আলোচনার দাবিদার।

এই বাস্তবতাগুলো দেখায়, রাজনীতি একমাত্র উত্তরাধিকার বা তেলবাজির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য নয়। বিকল্প চিন্তা সম্ভব। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বিকল্পগুলো সৎভাবে দেখতে চাই, নাকি পুরোনো পূর্বধারণা আঁকড়ে ধরে প্রতিটি নতুন সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করবো।

পরিবর্তন কখনো শূন্য থেকে জন্মায় না। পরিবর্তন আসে তখনই, যখন একটি সমাজ নিজের ভুলগুলো চিনতে শেখে এবং সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া বন্ধ করে। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কোনো একক দল বা ব্যক্তির নয়। সংকট হলো আমাদের সম্মিলিত অভ্যাসের। প্রশ্ন না করার অভ্যাস, তেল দেওয়ার অভ্যাস, আর ভুল দেখেও চুপ করে থাকার অভ্যাস।

তাই আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন স্লোগান নয়, নতুন অভ্যাস। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অভ্যাস, যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার অভ্যাস, আর নীরবতা ভাঙার সাহস।

এই অভ্যাসগুলোই যদি আমরা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা হবে না। সেটি হবে ধীরে ধীরে, বাস্তবতার ভেতর দিয়েই। আর সেখান থেকেই হয়তো একদিন আমরা বলতে পারবো, এই দেশ শুধু মুখ বদলায়নি, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শিখেছে।

সেই সম্ভাবনাটুকুই আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা।

এই জায়গা থেকেই একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি আবার শুধু আশা নিয়ে থেমে যাবো, নাকি সেই আশাকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবো।

পরিশেষে একটি প্রস্তাব রাখতে চাই। আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি বাধ্যতামূলক ও নিরপেক্ষ ডিবেট ফোরাম চালু করা হোক, সরাসরি টেলিভিশনের পর্দায়। যেখানে সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব একসঙ্গে উপস্থিত থাকবেন এবং জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে জানাবেন, তারা দেশ কীভাবে চালাতে চান।

সুইডেনে নির্বাচন বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে এটি একটি শক্ত সংস্কৃতি। সকল রাজনৈতিক দল একই মঞ্চে বসে, সরাসরি সম্প্রচারে অংশ নেয়। দুইজন স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাংবাদিক পুরো আলোচনা পরিচালনা করেন। এখানে স্লোগান নয়, প্রশ্ন থাকে। আবেগ নয়, পরিকল্পনা থাকে। জনগণের সামনে দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই প্রক্রিয়াটি শুধু বিতর্ক নয়। এটি একটি প্রকাশ্য অঙ্গীকার। একই সময়, একই মঞ্চে, জাতির সামনে প্রতিটি দলের অবস্থান পরিষ্কার হয়। মিথ্যা লোকানোর জায়গা থাকে না। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

বাংলাদেশের মতো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ভণ্ড প্রতিশ্রুতি ও জবাবদিহিহীনতায় আক্রান্ত একটি দেশের জন্য এই সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়। এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত। গত পঞ্চান্ন বছরে সবাই যার যার জায়গা থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু ফলাফল দেখেছে দেশ। এই চক্র থেকে মুক্তি চায় জাতি।

তাই এখানে একটি স্পষ্ট করণীয় তালিকা থাকা জরুরি।

১. জাতীয় টেলিভিশনে সকল রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক সরাসরি অংশগ্রহণ
২. স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকের তত্ত্বাবধানে প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা
৩. দেশ গঠন ও উন্নয়ন বিষয়ে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য পরিকল্পনা উপস্থাপন
৪. একই সময়, একই মঞ্চে সব দলের বক্তব্য জনগণের সামনে আনা
৫. দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো নথিভুক্ত করে ভবিষ্যতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা
৬. জনগণের সামনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাধ্যতামূলক করা

যদি জনগণের সামনে সত্য, পরিকল্পনা এবং দায়বদ্ধতা প্রকাশ না করা হয়, তাহলে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার হাতবদল দেখবে, চরিত্রের পরিবর্তন নয়।

আর যদি এই সংস্কৃতিটি চালু করা যায়, তাহলে হয়তো একদিন আমরা বলতে পারবো, এই দেশ শুধু মুখ বদলায়নি, রাষ্ট্রচিন্তাও বদলাতে শুরু করেছে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]