হিন্দু ছেলেটি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে

ওমর ফারুকী শিপন
ওমর ফারুকী শিপন ওমর ফারুকী শিপন , সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৮:৩৭ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৯

কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সাথে আছে আমার রুমমেট। কর্মকর্তারা খাবার সামনে নিয়ে বসে আছেন। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময়টুকু তারা বরাদ্দ রেখেছেন সাধারণ কর্মীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য। এই সময় তারা কর্মীদের সমস্যা শোনেন আর সমাধানের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। একজন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বলো তোমাদের রুমে কী সমস্যা হয়েছে? সময় কম দ্রুত বলো।

আগের পর্ব পড়ুন

আমি বললাম, আমাদের রুমের হিন্দুদের অন্য রুমে সরিয়ে দেওয়া হোক। কেন? হিন্দুরা কী করছে? তাদের না করার পরও তারা রুমে শূকরের মাংস নিয়ে এসেছে। আর আপনি তো জানেন আমাদের মুসলমানদের জন্য শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ।

আমার কথা শুনে তিনজন কর্মকর্তা একসাথে আমার মুখের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধিত করে তাকিয়ে আছেন। তাদের মুখে ভাষা নেই। আমরা যখন প্রথম সিঙ্গাপুরে আসি, তখন হিন্দু, মুসলিম হিসেবে দেখা হয় না। সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে এক রুমে থাকতে দেওয়া হয়। তারা চিন্তা করে আমরা যেহেতু একই ভাষাভাষী ও একই সংস্কৃতির তাই আমরা একে অপরের সাথে আন্তরিকতার সহিত বসবাস করব।

প্রথম প্রথম ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। যে যার মতো সুখেই ছিলাম। আমাদের সবার এখানে একটাই পরিচয় আমরা প্রবাসী বাংলাদেশি। আমরা একে অপরের ভাই। সবাই সবার সাথে হাসিঠাট্টায় মেতে থাকতাম। একই সাথে খেতে বসতাম। একসাথে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম ভাত খাচ্ছি দৃশ্যটা দেখতে কত ভালো লাগত। ছুটির দিনে সবাই একসাথে পার্কে বেড়াতে যেতাম।

ধর্ম নিয়ে প্রশ্নটা উঠল তখনই, যখন একজন হিন্দু রুমমেট তাদের দেবতার ছবি তার বিছানা সংলগ্ন দেয়ালে ঝুলিয়ে প্রার্থনা করতে লাগল। এক বড় ভাই রুমমেটের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিলেন, এই মিয়া ঘরে দেবতার ছবি ঝুলিয়েছ কেন? জানো না মুসলমানদের ঘরে দেবতা বা অন্য কোনো প্রাণীর ছবি ঝুলানো নিষেধ। যে ঘরে কোনো প্রাণীর ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।

হিন্দু রুমমেট হাসি দিয়ে বলল, দাদা আপনি হয়তো ভুলে গেছেন এই রুমে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম তিন ধর্মের লোক আছে। আমি মনে করি সবার সমান অধিকার। আপনারা নামাজ পড়তে পারলে আমরা প্রার্থনা করতে পারব না কেন? আমি ছবিটি ঝুলিয়েছি প্রার্থনা করার জন্য।

একপর্যায়ে দু’জন বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লে রুমের সবাই এসে হাজির হই। সবাই মিলে সভা করলাম, সভায় সিদ্ধান্ত হলো, যেহেতু এখানে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি সেহেতু ছবিটি একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হবে। শুধু প্রার্থনা করার সময় ছবির ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে প্রার্থনা করবে। হিন্দু রুমমেটরা তাতে রাজি হলো।

এরপর আমাদের মাঝে হিন্দু মুসলিমদের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গেল। এই অদৃশ্য দেয়ালটা আমাদের মধুর সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে দিল। এখন মুসলিমরা একসাথে খেতে বসি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীর রুমমেট তিনজন একসাথে খেতে বসে। পারতপক্ষে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলি না।

এটা ধর্মীয় ইস্যু এই নিয়ে আমি বেশি কিছু বলতে পারব না। একজনের কথায় কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসি। তারা তিনজন খেতে শুরু করলেন। আমরা দু’জন রুমমেট চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কারো মুখে কথা নেই।

ঘটনাটা ঘটেছিল তিনদিন আগে। সেদিন প্রতাপ রুমে শুকরের মাংস এনে বলেছিল, আজকে রুমে শুকরের মাংস রান্না হবে। সে এমনভাবে বলছিল যাতে আমরা সবাই শুনতে পাই। আমরা যারা রুমে উপস্থিত ছিলাম সবাই উত্তেজিত হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আমি সহ্য করতে পারলাম না। উত্তেজিতভাবে বলেছিলাম, এই মিয়া কি বলছেন। আপনার মাথা ঠিক আছে তো? আমাদের রুমে শুকরের মাংস খাওয়া নিষেধ। আপনি কি জানেন না, মুসলিমদের জন্য শুকরের মাংস হারাম।

সেও উত্তেজিতভাবে বলল, আপনারা গরুর মাংস খেতে পারলে আমি শুকরের মাংস খেতে পারব না কেন? রুমে আপনারা যত টাকা ভাড়া দেন, আমিও ঠিক তত টাকাই ভাড়া দিই।

তার কথা শুনে মাথায় রক্ত উঠে গেল। নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। আমরা গরুর মাংস খাই, তাই সে শুকরের মাংস খাবে। কত বড় সাহস। আমরা রুমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম তাই আমরা যা খুশি তাই খেতে পারব। এক রুমমেট রান্নাঘর থেকে ছুরি এনে উত্তেজিতভাবে তার দিকে ছুরি তাক করে বলল, তোর কত বড় সাহস, তুই শুকরের মাংস খাবি? তোকে আজ আমি জবাই করব। তোকে জবাই করে আমি ফাঁসিতে ঝুলব।

রুমমেটের অবস্থা বেগতিক দেখে মনে হলো, সে সত্যি খুন করবে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সে সত্যি যদি গলায় ছুরি চালিয়ে দেয় তাহলে রুমে যারা উপস্থিত আছি সবার ফাঁসি হবে। আমি এই অল্প বয়সে মরতে রাজি না। ছুটে গিয়ে রুমমেটকে দুই বাহুতে জড়িয়ে বললাম, ভাই ঠান্ডা হন। এভাবে উত্তেজিত হওয়া ঠিক না। আমার দেখা দেখি অন্যরাও এসে রুমমেটকে জড়িয়ে ধরে ঠান্ডা করতে চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রতাপ উত্তেজিত হয়ে বলল, আমি শুকরের মাংস খাবই, দেখি তুই কি করতে পারিস।

এবার সবাই প্রতাপকে উদ্দ্যেশ্য করে গালাগালি করতে লাগলাম। সে সহ্য করতে না পেরে রুম থেকে বের হয়ে গেল। রাগে ক্ষোভে সবাই ঘামছি। ওর এত বড় সাহস রুমে শুকরের মাংস খাবে। কেউই ব্যাপারটা সহজভাবে নিতে পারছি না।

একটু পর সিকিউরিটি অফিসারকে সাথে নিয়ে প্রতাপ রুমে প্রবেশ করল। সিকিউরিটি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের মাঝে যা হয়েছে আমি সব শুনেছি। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। ধর্মীয় ব্যাপারগুলো সব সিনসেটিভ, তাই আমি তোমাদের সবাইকে অনুরোধ করব প্রতাপকে কিছু বলবে না। আর প্রতাপ তুমিও শুকরের মাংস খেও না। আমি তোমাদের কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাপারটা হস্তান্তর করব। দেখি তারা কি সিদ্ধান্ত দেয়। সিকিউরিটির অভিযোগের কারণেই আজ আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডেকেছেন।

তিনজন খাওয়া শেষ করে বসে আছে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। একজন আমাদের উদ্দেশ্যে বলল, শোন এই ইস্যুটা খুব সিনসেটিভ আমি কিছু বলতে পারব না। এই যে দেখছ আমরা তিনজন একসাথে বসে খেলাম। আমরা তিনজন তিন ধর্মের। আমি গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছি, একজন শুকরের মাংস দিয়ে এবং অন্যজন শুধু সবজি দিয়ে খেল। আমাদের কিন্তু কোনো সমস্যা হয়নি।

সিঙ্গাপুরে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয় না। যে যার যার ধর্ম তার মতো করে পালন করে। এই প্রথম কোনো ধর্মীয় ইস্যু আমাদের সামনে এল। এখন তোমরা বলো এর কি সমাধান?

প্রতাপ বলল, ম্যাডাম আমার কি রুমে শুকরের মাংস খাওয়ার অধিকার আছে? সে জবাব দিল। অবশ্যই তোমার শুকরের মাংস খাওয়ার অধিকার আছে। তবে আমি মনে করি তোমরা যেহেতু একে অপরকে সহ্য করতে পারছ না তাই রুমে গরু আর শুকরের মাংস উভয়ই খাওয়া বন্ধ করে দেও। প্রতাপ বলল, ম্যাডাম আমাদের জন্য গরু খাওয়া নিষেধ। আমরা গরুকে সম্মান করি, তবুও ওরা রুমে আমাদের সামনে গরুর মাংস খায় কিন্তু আমরা হিন্দুরা কিছু বলি না। কিন্তু শুকরের মাংস খাওয়ার কথা শুনে ওরা উত্তেজিত হয়ে উঠে।

তারা তিনজন অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, তুমি কি চাও তোমাদের সব হিন্দুদের এক রুমে দেই। আর মুসলিমরা এক রুমে। তোমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের জানাও। আর শোন সিঙ্গাপুরে যে যার মত ধর্ম পালন করে। কেউ কাউকে বাধা দেয় না। আশাকরি তোমরাও তোমাদের মতো ধর্ম পালন করবে।

আমরা আর কথা না বাড়িয়ে অফিস থেকে বের হয়ে গেলাম। অফিস থেকে বের হয়ে আসতেই প্রতাপ আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, সরি ভাই সেদিনের ব্যবহারের জন্য। আসলে আমি শুকরের মাংস আনিনি। আমিও শুকরের মাংস খাই না। আমি জানি আপনাদের জন্য শুকরের মাংস হারাম। আমি জেনেশুনে কিভাবে রুমে শুকরের মাংস আনি।

আপনারা সবসময় গরুর মাংস খুব আয়েশ করে খান, তাই আমি আপনাদের ক্ষ্যাপানোর জন্য শুকরের মাংসের কথা বলেছিলাম। আমাকে আপনারা ক্ষমা করে দিয়েন। আর রুমে আমার শুকরের মাংস খাওয়ার অধিকার আছে সেটা প্রমাণ করার জন্যই এখানে আসা। আমার অধিকার থাকলেও আমি শুকরের মাংস খাব না। আমি আপনাদের সাথে একই রুমে মিলেমিশে থাকতে চাই।

আমি প্রতাপের দিকে তাকিয়ে আছি। সে আর কথা না বাড়িয়ে করমর্দন করে হাসিমুখে চলে যাচ্ছে। আমি তার দিকে শ্রদ্ধা ভরে তাকিয়ে রইলাম। সে আজ শিক্ষা দিয়ে গেলো, মানব ধর্মই আসল ধর্ম। এরপর আমি ধর্মভিত্তিক কাউকে না দেখি সবাইকে মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করলাম। সে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে।

এআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com