জাতির পরিবর্তনে দরকার সুশিক্ষা

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:২৫ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২১

মানুষের যে নৈতিকতা গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে, সেই শিক্ষা এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, পড়েছে নড়বড়ে হয়ে। দেশে শিক্ষাপদ্ধতি আর শিক্ষানীতি নিয়ে বিতর্ক বেশ জমজমাট। আমি বেশ কিছুদিন থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও তার উন্নয়ন নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে চলেছি।

প্রবাসী হলেও বাংলাদেশের শিক্ষার মান ও সার্বিক নড়বড়ে অবস্থা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ আমার মতে সুশিক্ষা অর্জিত না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনই আসতে পারে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ছাড়াও নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে সব পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রসঙ্গ এক কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই ব্যাধি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশে। এখন এই ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা শুরু হয়েছে। কিন্তু উপায় যে আর মেলে না।

আমি গোটা শিক্ষাপদ্ধতির গলদ খুঁজে বের করে এর স্থায়ী প্রতিকারের জন্য সরকার ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম বেশ আগেই। এটা বাস্তবায়নের জন্য দেশে একটি বা একাধিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষকদের মধ্যে বুনিয়াদী, কার্যকর ও আধুনিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার এক নতুন চিন্তা সরকার ও দেশবাসীর কাছে উপস্থাপনও করেছিলাম।

এই লক্ষ্যে একত্রে কাজ করার জন্য সরকার ও জনগণকে অনুরোধ করছি আবারও। সেখানে যেন আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এক অগ্রণী চিন্তায় আমার পৃথিবী উদ্ভাসিত হয় আমার জ্ঞানের আলোকে। এই শিক্ষা হবে আমাদের উপার্জনের হাতিয়ার। শিক্ষা গ্রহণের পরেই কিন্তু প্রতিটি মানুষের সব ব্যস্ততা আবর্তিত হয় প্রত্যাশিত একটি চাকরিকে ঘিরে।

এক্ষেত্রে দেশে এমন অবস্থা বিরাজ করছে যেখানে উচ্চ শিক্ষিত হতে যত বছর সময় লাগছে, চাকরি পেতে সেই ছাত্র/ছাত্রীকে এর চেয়েও বেশি সময় অপচয় করতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি একাধিক আধুনিক ধারণা দিয়েছি।

আমি মনে করি বর্তমান বিশ্বে চলছে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং গোটা বিশ্বের শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে এখন আজীবন চাকরি বলে কিছু নেই, চাকরি আছে ততদিন যতদিন কাজ আছে এবং কাজ আছে ততদিন যতদিন চাহিদা আছে।

শিক্ষা ও শিক্ষার মান নির্ভর করছে গ্লোবাল চাহিদার উপর এবং তাও হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট লেভেলে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত করে বলা কঠিন কী পড়লে সারা জীবন চাকরির গ্যারান্টি মিলবে। তবে অর্জিত শিক্ষা যদি সুশিক্ষা হয় তাহলে সারা জীবন চাকরির গ্যারান্টি মিলবে, হলফ করে বলা যায় একথা।

কারণ সুশিক্ষা এমন এক শিক্ষা যা সবসময়ই সময়োপযোগী এবং সেই কারণে তা দেশে দেশে যুগে যুগে মানবজাতির যেকোনো চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে ঊর্ধ্বমুখী এক দেশ। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও সময়ের স্রোতে এ দেশের সব সেক্টরেই লেগেছে আজ ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। কিন্তু আমাদের ধ্যানে-জ্ঞানে এ ছোঁয়া আজও লাগেনি! চাহিদা বলছে কী পড়তে হবে এবং কেন পড়তে হবে।

এ সময়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এবং প্রত্যেকটি শিক্ষককে জানতে হবে চাহিদাগুলো কী এবং তার জন্য কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সকল শ্রেণির শিক্ষকদের সুশিক্ষা গ্রহণ ও প্রদানের আওতায় আনতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী শিক্ষা অনুসন্ধান করা হবে এবং সেটি চর্চা করার জন্য একটি অনুকূল শিক্ষাব্যবস্থাও প্রণয়ন করা হবে।

শিশুদের ১-১৫ বছর বয়সের মধ্যের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে মানবতার ফর্মে আনতে হলে তাদেরকে মানসম্পন্ন পরিবেশের মধ্যে শিক্ষা দান করে গড়ে তুলতে হবে এবং একই সাথে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরে পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে সুশিক্ষার সার্বিক অবকাঠামো যেখানে থাকতে হবে ‘জানা থেকে শেখা।’

কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অনিয়ম যেন কলুষিত করতে না পারে শিক্ষা প্রশাসনকে, শিক্ষাঙ্গনকে। একই সাথে গণতন্ত্রমনা ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে নিরাপদে ও গর্বের সাথে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করবে সবাই এবং মতামতের ভিন্নতা সত্ত্বেও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে তারা সামাজিক ঐক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

শিশু বিদ্যালয় শিশুদের জন্য অনুকরণ এবং অনুসরণের জায়গা, সেজন্য এই সব শিক্ষাঙ্গনে থাকা চাই শিশু মনোবৈজ্ঞানিক, সমাজকর্মী। এই মনোবৈজ্ঞানিক ও সমাজকর্মীগণও হবেন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

সেখানে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামাদির সাহায্যে বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভগ্নির আলোকে শিক্ষা দান ও প্রশিক্ষণ প্রদান চলবে, যেখানে মননশীলতা চর্চা ও বৈশ্বিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে শিশুদের প্রারম্ভিক জীবন।

আছে কি বাংলাদেশের শিশু বিদ্যালয়ে এমন কোন শিক্ষক বা শিক্ষা পদ্ধতি চালু, যেখানে চর্চা হচ্ছে এমন মানসম্মত শিক্ষা? বা সেইভাবে তৈরি হচ্ছে কি তেমন শিক্ষক যিনি পারবেন মোকাবিলা করতে ভবিষ্যতের এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে?

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধারার একমাত্র বাহক শিক্ষক সমাজই যদি মজবুত না হয়, শিক্ষার্থী নামক নতুন দিনের অভিযাত্রীরা কি নির্বিঘ্নে শিক্ষা নামক বৈতরণী পাড়ি দিতে পারবেন?

বর্তমান শিক্ষা গতানুগতিক, অসম্পূর্ণ, সনদপত্রসর্বস্ব, তত্ত্বীয় বিদ্যাপ্রধান, অপর্যাপ্ত ব্যবহারিক শিক্ষা, মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল এবং পুরনো পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারী, তাই আশানুরূপ ফল লাভ হচ্ছে না।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার শিশু বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের শিক্ষকদের জন্যও প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নেই। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন রয়েছে, রয়েছে নানা মাধ্যম।

রয়েছে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, স্কুল থেকে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় এর ঊর্ধমান সিঁড়িপথ। প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সমন্বয়হীনতার অভাব, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যেমনটি কলেজ শিক্ষকের যোগাযোগ নেই, তেমনি কলেজ শিক্ষকেরও সংযোগ নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে!

আর যোগাযোগবিহীন এ অবস্থার কারণে শিক্ষার বিস্তার হলেও নিশ্চিত হচ্ছেনা শিক্ষার মান। আর এ কারণেই প্রশ্ন জেগেছে, জাতি হিসাবে আমরা শিক্ষিত হয়ে চলেছি কিন্তু সুশিক্ষিত হয়েছি কি? বরং রুগ্ন হয়ে চলেছে আমাদের দেশের শিক্ষাখাত। তাই দেশের জনশক্তিকে দ্রুত জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

দুঃখের বিষয় নামসর্বস্ব ও দায়সারাগোছের শিক্ষা ম্যানেজমেন্টের কারণেই আজ শিক্ষার এই অধঃপতন হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার সনাতনপ্রথার সমাধানে আমি মনে করি একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকই পারেন ছাত্রের অভ্যন্তরে লুকায়িত প্রতিভাকে বের করে আনতে আর সেরকম শিক্ষক তৈরি করতে দরকার বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়।

এটি হবে সত্যিকার অর্থে বিশ্বের একটি বিদ্যালয়, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষকের মতামত শুনবেন মাধ্যমিকের শিক্ষক, মাধ্যমিকের শিক্ষকের পাশে বসে শুনবেন কলেজ শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। সেখানে থাকবেন বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত স্বনামধন্য শিক্ষকরা।

অর্থাৎ সকল মাধ্যমের শিক্ষকতার পরাগায়ন ঘটবে যার ফলে শিক্ষক যেমনি আধুনিক মানসম্মত শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়ে পাঠদানে বৈচিত্র্য আনবেন তেমনি ছাত্রছাত্রীরা মুখস্থবিদ্যার বলি না হয়ে জানতে ও শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

বিশ্বায়নের এই যুগে শিক্ষা কোনো গ্রামীণ শিল্প কিংবা শহুরে শিল্পকারখানা হতে পারে না। শিক্ষা সর্বজনীন। অর্থাৎ শিক্ষা সকলের জন্য। শিক্ষকদের পাঠদানের উৎকর্ষতা সাধনে এই দেশেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়।

‍বর্তমান যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা জানে না কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া দরকার একজন শিশু বিদ্যালয়ের শিক্ষককে। পুরো শিক্ষাঙ্গন খুঁজলে পাওয়া যাবে খুব কম সংখ্যক উপযোগী গুণসম্পন্ন শিক্ষক, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রদবদল করতে হবে প্রথমে এবং জনগণের মনোনীত প্রার্থী ও স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে এ কাজ শুরু করতে হবে।

দেশে লাখ লাখ বেকার তৈরির এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কি কোনো জবাবদিহিতা আছে? সরকারের কী বক্তব্য এই ব্যাপারে? সচেতন জাতি খুঁজে বের করে সমাধান, অজুহাত নয়। সাবধানতাই একমাত্র সুশিক্ষার পথ।

সুশিক্ষার মানসম্পন্ন কারিগর পেতে হলে এবং মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে হলে দরকার এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্ট হলো জানতে হবে, জানতে হলে শিখতে হবে, শিখতে হলে পড়তে হবে, আর পড়তে হলে চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে শিক্ষকদের।

তবেই হবে শিক্ষার স্বার্থকতা আর শিক্ষক হবে সুশিক্ষার কারিগর। মনে রাখতে হবে শিক্ষকের দায়িত্ব শেখানো নয়, শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সামনে সুশিক্ষা তুলে ধরা এবং সেটি গ্রহণের জন্য তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেকার তৈরির কারখানা হবে না। বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে তার সমাধান। তাই শিক্ষাঙ্গনে এক বিরাট পরিবর্তনের জন্য চাই সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ। রত্ন নির্ণয়ে যেমনটি পাঁকা জহুরী প্রয়োজন ঠিক তেমনি আগামীর প্রজন্মকে এগিয়ে দিতে দরকার এক প্রশিক্ষিত কারিগর।

শিক্ষার জন্য গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। তার আগে এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা সুস্পষ্টভাবে দাঁড় করাতে হবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে, এর পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করতে হবে, তৈরি করতে হবে উপযুক্ত ম্যানেজমেন্ট।

কিন্তু নীতিনির্ধারকরাই বা এগুলো কিভাবে করবেন? এগুলোওতো সুশিক্ষার ব্যাপার। এ কারণে সর্বাগ্রে এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হতে হবে, সেখানেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। সুশিক্ষার জন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু হোক শুরু থেকেই, মাঝখান থেকে নয়।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]