হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালাম যে কারণে মানবজাতির জন্য নিদর্শন

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৭ এএম, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮

কুরআনুল কারিম মহান আল্লাহর প্রেরিত মহাগ্রন্থ। এ পবিত্র কিতাবকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া মানুষের জন্য হিকমত তথা বিজ্ঞানময় নির্দশন হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এর প্রতিটি পাতায় মানুষের জন্য রয়েছে বিধান ও নিদর্শন।

বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবার জন্য এমনই এক মহানিদর্শনের কথা ওঠে এসেছে সুরা বাকারার ২৫৯ নং আয়াতে। হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালাম জেরুজালেমের ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর দেখে অনুতাপে বলেছিলেন এ শহর কি আর আগের মতো ঝাঁকঝমক হয়ে ওঠবে।

তাঁর এ কথার ফলে আল্লাহ তাআলা হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালামকে তার যানবাহনসহ মৃত্যু দান করেন। আর সে ঘটনার বিবরণ প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নিদর্শন স্বরূপ উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন-
Quran-Topআয়াতের অনুবাদ
Quran-Top
আয়াত পরিচিতি ও নাজিলের কারণ

সুরা বাকারার ২৫৯নং আয়াত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্ব মানবতার জন্য এক মহা নিদর্শন। এখানে মহান আল্লাহর বিজ্ঞানময় প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এ আয়াতে রয়েছে বিশ্ব মানবতার জন্য মহান শিক্ষা।

হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনার পর হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালামের একটি ঘটনা এ আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এ আয়াতে আরমিয়া বিন খালকিয়ার ঘটনা। আর তিনি ছিলেন হজরত খিজির আলাইহিস সালাম।

আর যে এ নগরী ধ্বংসে পরিণত করেছিল সে ছিল জালেম বাদশাহ বখতে নসর। সে তার তরবারি নিচে সব জনগণ ও এ নগরীকে ধ্বংস্তুপে পরিণত করেছিল। কেউ কেউ বলেন সে আক্রমণকারী ছিল হজরত হিজকিল বিন বাওয়া অথবা বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি। আর এ নগরী ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস।

তবে অধিকাংশ তাফসিরকারক এ ঘটনাকে হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালামের ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। আর তাহলো-

আল্লাহর মনোনীত এক বান্দা (হজরত ওজায়ের) স্বীয় গাধার ওপর সাওয়ার হয়ে এক জনপদ (বায়তুল মুকাদ্দাস) অতিক্রম করছিলেন। জনপদটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং জনমানবহীন বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সেখানে কোনো ঘর-বাড়ি এবং কোনো বসবাসকারী ছিল না।

আল্লাহর বান্দা (হজরত ওজায়ের) এ অবস্থা দেখে অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত ও বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘এমন জনমানবহীন বিরান ভূমি কিরূপে নতুনভাবে সজীব হবে। মানুষের পদভারে সরব হবে।

আল্লাহর বান্দা (হজরত ওজায়ের) এ চিন্তা-ভাবনায় নিমগ্ন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা ঐ স্থানে তাঁর রূহ কবজ করেন। ১০০ বছর যাবত তিনি মৃত্যু অবস্থায় সেখানে পতিত থাকেন। তার সঙ্গে খাবার হিসেবে ছিল আঙ্গুর, ডুমুর ও ফলের নির্যাস।

এদিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর মৃত্যুর ৭০ বছর পর বাইতুল মুকাদ্দাস আবার জনবসতিপূর্ণ হয়। পলাতক বনি ইসরাইলরা আবার ফিরে আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যে শহর ভরপুর হয়ে যায়। আগের মতো ঝাঁকজমক ও শোভা বৃদ্ধি পায়।

এ দীর্ঘ ১০০ বছর অতিক্রম হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁকে জীবিত করলেন। চোখের মধ্যে সর্ব প্রথম তার রূহ প্রবেশ করান; যাতে তিনি নিজের পুনঃর্জীবন স্বচক্ষে দেখতে পারেন। অতঃপর ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো- তুমি কত দিন এভাবে মৃত অবস্থায় কাটিয়েছ? তিনি যখন মৃত্যু বরণ করেন তখন ছিল সকাল; আর যখন জীবিত করা হলো তখন ছিল বিকাল। এ কারণে তিনি বললেন, একদিন বা তার কিছু কম সময়।

আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘এমন নয় বরং তুমি ১০০ বছর মৃত ছিলে। এবার তুমি আমার ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য করে দেখ, তোমার সঙ্গে পাথেয় হিসেবে যে খাদ্য ছিল তা একশত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও ঐ রূপই রয়েছে। পচেনি এবং সামান্য বিকৃতও হয়নি। আঙ্গুর খারাপ হয়নি; ডুমুর টক হয়নি এবং ফলের নির্যাস নষ্ট হয়নি।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে তার বাহন গাধার দিকে দৃষ্টি দেয়ার কথা বললেন। সে গাধা মরে পচে-গলে পানিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আল্লাহ বললেন, তোমার গাধার যে হাড়গুলো তোমার সামনে রয়েছে সেগুলোর দিকে দৃষ্টি দাও। তোমার চোখের সামনেই তোমার গলিত গাধাকে জীবিত করছি।

আমি স্বয়ং তোমাকে মানব জাতীর জন্য নির্দশন করতে চাই। যেন তারা কেয়ামতের দিন পুনরুত্থান সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস গ্রহণ করে।

অতঃপর তিনি দেখতে দেখতেই ডানে-বামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাড়গুলো একত্র হয়ে প্রতিটি জোড়ায় সংযুক্ত হয়ে যায়। পূর্ণ কাঠামো রূপে হাড়গুলো দাঁড়িয়ে যায়। যাতে বিন্দু পরিমাণ গোশত ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে হাড়ের ওপর মাংসের আবরণ এবং শিরা তৈরি হয়।

অতঃপর আল্লাহ ফেরেশতা পাঠান। তিনি তাঁর গাধার নাসারন্দ্রে ফুঁ দিয়ে দেন। আল্লাহর হুকুম গাঁধাটি জীবিত হয়ে ওঠে। আর হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালাম আল্লাহর এ সব কুদরত ও মহা ক্ষমতা স্বচক্ষে দেখতে থাকেন। এ সব কিছু দেখার পর তিনি বললেন, ‘আমার তো এটা বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তাআলা সব কিছুর ওপর মহাক্ষমতাবান।’

হজরত ওজায়ের আলাইহিস সালামের মন্তব্য, তাঁর মৃত্যু, পুনর্জীবন লাভ, তাঁর পাথেয় খাদ্য নষ্ট না হওয়া, ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী আবার মানুষ ও সৌন্দর্যে সুশোভিত হওয়া, তাঁর চোখের সামনে পচা-গলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাড় থেকে গাধার সৃষ্টি এবং এ সব স্বচক্ষে দেখাই ছিল মানব জাতীর জন্য মহান আল্লাহর মহা ক্ষমতা এবং পরকালের সব সৃষ্টিকে পুনরায় জীবিত করার মহা নিদর্শন।

পড়ুন- সুরা বাকারার ২৫৮ নং আয়াত

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের যাবতীয় বিধি-বিধানের পাশাপাশি আগের সব নবি-রাসুলদের ইতিহাস ঘটনা আমাদের জন্য নিদর্শন বা শিক্ষাস্বরূপ গ্রহণ করে আল্লাহ একত্ববাদ ও ক্ষমতার প্রতি ঈমান আনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :