ফুটপাতে ব্যবসা করা কি হারাম?

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৫৬ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০২০

মানুষের চলাচলের রাস্তা কিংবা রাস্তার দুই পাশে তথা (footpath) ফুটপাতে দোকান বসিয়ে বা ব্যবসা সামগ্রী নিয়ে অনেকেই কেনা-বেচা করে থাকেন। এভাবে ফুটপাতে বসে ব্যবসা করা বৈধ না কি হারাম?

মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য রাস্তা ব্যবহৃত হয়। এ রাস্তার দুই পাশে বসে অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। যাদের অনেকেরই ঘর ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করার অবস্থা থাকে না। তাদের জন্য ফুটপাত বা রাস্তার দুই ধারে বসে ব্যবসা করা যাবে কিনা। করলেও তা বৈধ হবে কিনা?

‘হ্যাঁ’ রাস্তার দুই পাশে বা ফুটপাতে বসে ব্যবসা বা বেচা-কেনা করা যাবে। এ জন্য ইসলামিক স্কলাররা দুটি শর্তের কথা তুলে ধরেছেন। তাহলো-

>> প্রথমত : পথচারীর চলাচলে বিঘ্ন না ঘটানো
রাস্তার দুই পাশের ফুটপাতে বেচা-কেনা করা জায়েজ। এজন্য প্রথম শর্ত হলো- ফুটপাতের এ ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে পথচারী বা যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে। যদি মানুষের চলাচল ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে, তবে ফুটপাতে বসে ব্যবসা-বাণিজ্য করা বৈধ।

এমনটি করা যাবে না যে, ব্যবসার সামগ্রী বা মালামাল দিয়ে চলাচলের রাস্তা দখল হয়ে যায়। ফলে পথচারীর চলাচলের অসুবিধা হয় কিংবা পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ফুটপাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে মাল-সামগ্রী দিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়।

আবার দেখা যায়, রাস্তার পাশে দোকানঘর। দোকানের মালামাল দিয়ে সামনে থাকা রাস্তা প্রায় পুরোটাই দখল করে ফেলা হয়। মনে হয়, এটি দোকানের মালিকের নিজস্ব সম্পত্তি! এসব ক্ষেত্রে ফুটপাতে বা রাস্তার পাশে বসে ব্যবসা-বাণিজ্য করা বৈধ নয়।

অনেকে চিন্তা-চেতনাহীনভাবে রাস্তায় জায়গা দখল করে ফলমূল, চটপটি, হালিম, চানাচুর, শাক-সবজি, জামা-জুতা ও তৈজসপত্রসহ বিভিন্ন পণ্য-সামগ্রী কেনা-বেচা করেন। এতে মানুষের চলাচলে যেমন বিঘ্ন ঘটে আবার রাস্তায় গাড়ি চলাচলেও লেগে যায় যানজট। এতে মানুষের ভোগান্তি ও কষ্ট বেড়ে যায়। এমনটি হলে ফুটপাতে কিংবা রাস্তা দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য করা বৈধ নয়।

রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার মানেই হলো সর্বসাধারণের চলাচলের রাস্তা অবৈধভাবে কুক্ষিগত করে তাদের হক নষ্ট করার শামিল। এটি মানুষকে কষ্ট দেয়া ও ভূমি আত্মসাৎ করার শামিল। হাদিসে এ ব্যাপারে নিষেধজ্ঞা জারি করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে-
হজরত সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও ভূমির সামান্যতম অংশও আত্মসাৎ করবে, কেয়ামতের দিন সাত তবক জমিনের নিচে তাকে ধসিয়ে দেয়া হবে।’ (বুখারি)

রাস্তার অন্যতম হক হলো, চলাচলের ক্ষেত্রে মানুষকে কোনোভাবেই কষ্ট না দেয়া। এমনকি কেউ যদি প্রয়োজনে রাস্তায় বসে, তাতেও রাস্তার হক আদায় করা জরুরি। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমরা রাস্তার হক আদায় কর। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করেন, রাস্তার হক কী? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
- চোখ নিচু রাখা।
- (কাউকে) কষ্ট না দেয়া।
- সালামের উত্তর দেয়া।
- ভালো কাজের আদেশ দেয়া এবং
- মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। (বুখারি, মুসলিম)

চলাচলের ক্ষেত্রে মানুষকে কষ্ট দেয়া তো দূরের কথা বরং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্বনবি। এটিকে ঈমানের শাখা বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‌আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে। সর্বোত্তম শাখা হলো- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই’ বলা। সবচেয়ে ছোট শাখা হলো- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া। আর লজ্জা ঈমানের অন্যতম শাখা।’ (বুখারি ও মুসলিম)

সুতরাং রাস্তার দুই পাশে ফুটপাতে বসে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা বেচা-কেনা করা তখনই বৈধ হবে; যখন মানুষের চলাচলে কোনো ধরনের অসুবিধা হবে না। চলাচলের রাস্তা হবে প্রশস্ত। মানুষ অনায়াশে চলাচল করতে পারবে। যদি অসুবিধা হয় তবে, ফুটপাতে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা বেচা-কেনা জায়েজ নেই বরং তা হারাম।

মনে রাখতে হবে
ইসলামিক স্কলারদের বক্তব্য হলো- যদি বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের আর্থিক সঙ্কট বা দরিদ্রতা হ্রাসের বিবেচনায় ফুটপাতে ছোট ছোট ব্যবসায়ীকে ব্যবসা করার সরকারি অনুমোদন দেয়া হয় এবং রাস্তা চলাচলে কিছু কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে সাধারণ জনগণও বিষয়টিকে সহজভাবেই গ্রহণ করে নেয়; তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তাতে কোনো সমস্যা নেই।

এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যথাসম্ভব মানুষের চলাচলের পথকে নির্বিঘ্ন রাখার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মনীতি অনুসরণ করে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা করতে হবে। আইন লঙ্ঘন করে ইচ্ছামতো যত্রতত্র দোকান খুলে রাস্তা আটকে মানুষকে কষ্ট দেয়া যাবে না।

>> দ্বিতীয়ত : ব্যবসা করার অনুমোদন গ্রহণ করা
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে কোনো ব্যবসা করতে হলে রাষ্ট্র ঘোষিত ট্রেড লাইসেন্স তথা ব্যবসার অনুমোদন নেয়া। কেননা ট্রেড লাইসেন্স তথা ব্যবসার অনুমোদন নেয়া ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য করা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ ও অপরাধ।

কেননা সব ব্যবসা ও স্বাধীন পেশার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসার অনুমোদন নিতে হয়। এমনকি ফুটপাতে বসে যদি ফল কিংবা টঙ দোকানে চা বিক্রি করা হয়; তার জন্যও লাইসেন্স জরুরি। ফুটপাত বা রাস্তার পাশে যে ব্যবসাই করা হোক না কেন, ট্রেড লাইসেন্স তথা ব্যবসার অনুমোদন অবশ্যই নিতে হবে। কেননা রাষ্ট্রের ঘোষণা হলো এমন-
‘১৯৮৬ সালের মিউনিসিপাল কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন বিধিমালার ৪৪(১) বিধি অনুসারে সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে অবশ্যই ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে।’

সুতরাং উল্লেখিত দুটি শর্ত মেনে নেয়া সাপেক্ষে রাস্তার দুই পাশে তথা ফুটপাতে ব্যবসা করায় ইসলামি শরিয়তের ব্যবসায়িক নীতিমালা মেনে ব্যবসা করায় কোনো বাধা নেই। আর তা না জায়েজও নয় বরং বৈধ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে বৈধ পন্থায় ইসলামি নিয়মনীতি মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করার তাওফিক দান করুন। হাদিসের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। দেশের বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]