আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষায় নবিজী (সা.) যেমন ছিলেন

ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৫৫ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২১

আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা অনেক বড় গুনাহের কাজ। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষায় নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন ছিলেন? আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় প্রিয় নবি হতে পারে বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। এ সম্পর্ক রক্ষায় যেমন ছিলেন বিশ্বনবি-

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আত্মীয়-স্বজনদের অধিকার ও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে কি পরিমাণ পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তা বলে কিংবা লিখে শেষ করার মতো নয়। যে কারণে মক্কার কাফের কুরাইশরাও তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতো। যার ফলে নবুয়তের আগে অবিশ্বাসী কাফের-মুশরিক সম্প্রদায় তাঁকে মহা সত্যবাদী ও আল-আমিন উপাধি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।

তাঁর প্রতি প্রথম ওহি নাজিল হওয়ার পর যখন তিনি ভয় পেয়ে ঘরে ফিরে এলেন তখন তাঁর স্ত্রী হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁকে যে কথার দ্বারা সান্ত্বনা দিয়েছিলেন; সেখানেও তাঁর আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা কথা ফুটে ওঠেছে। হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা এ বলে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন যে-

إنك لتصل الرحم وتصدق

‘নিশ্চয়ই আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন ও সর্বদায় সত্য কথা বলেন...।’

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো সেই ব্যক্তি; যিনি শ্রেষ্ঠ অধিকার ও সবচেয়ে বড় দায়িত্বসমূহ পালন করেছেন। আত্মীয়তার বন্ধনের প্রতি কতবেশি মমত্ববোধ ছিল তাঁর; ৭ বছর বয়সে মারা যাওয়া মায়ের কবরও জিয়ারত করেছিলেন তিনি। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে-

হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করার সময় কাঁদেন। তাঁর কান্নায় উপস্থিত সবাই কেঁদেছিলেন। এরপর তিনি বলেন-

‘আমি আমার প্রভুর কাছে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম কিন্তু তিনি অনুমতি দেননি, পরে আমি তাঁর সমীপে তার কবর জিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব হে আমার উম্মত! তোমরা কবর জিয়ারত করো, কেননা তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (মুসলিম)

পরম আত্মীয়-স্বজনের ভালোবাসায় দীর্ঘদিন আগে মারা যাওয়া মায়ের কবর জিয়ারত করে আত্মীয়তার হক আদায় করেছেন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য অতি উত্তম শিক্ষা।

আত্মীয়-স্বজনের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে ভালবাসা ও সৎ পথের দাওয়াত দেওয়ার আগ্রহ এবং তাদের হেদায়েত প্রাপ্তি ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কতবেশি প্রবল ছিল তাও এ হাদিস থেকে অনুমেয়। আর সত্যের পথে তিনি কত দুঃখ-কষ্টই না সহ্য করেছেন।

আত্মীয়দের মুক্তির জন্য প্রিয় নবির পেরেশানি

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো-

 وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ

অর্থাৎ আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে ভয় প্রদর্শন করুন।’ (সূরা শুআরা : আয়াত ২১৪)

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের সব স্তরের লোকদেরকে আহ্বান করে একত্রিত করে বলেছিলেন-

‘হে বনি আবদে শামস, হে বনি কাব বিন লুয়াঈ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।

হে বনি আবদে মানাফ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।

হে বনি আব্দুল মুত্তালিব! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।

হে ফাতেমা! তুমি নিজেকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।’ (মুসলিম)

জাহান্নামের আগুন থেকে নিকটাত্মীয়দের রক্ষায় কত পেরেশান ছিলেন প্রিয় নবি। এ হাদিসই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আত্মীয়তার অধিকার রক্ষায় সব গোত্রের লোকদের কাছে আল্লাহর দেওয়া এ সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেছেন, ‘কেননা কেয়ামতের দিন আমি আল্লাহর কাছে (ঈমান না আনার কারণে) তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। তবে আমি এ ধরাতে তোমাদের সঙ্গে আত্মীয়তা সম্পর্ক ঠিক রাখবো।

আত্মীয়তার সম্পর্ক যথাযথভাবে রক্ষাকারী তিনিই তো সেই প্রিয় নবি; যিনি তাঁর প্রিয় চাচা আবু তালেবকে দাওয়াত দিতে কোনো বিরক্ত হননি। কোনো প্রকার ত্রুটি করেননি। জীবনভর বিভিন্ন পন্থায় তাকে একের পর এক কল্যাণের পথ ইসলামের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর সময় তার কাছে এসেছিলেন। হাদিসে পাকে এসেছে-

‘যখন আবু তালেব মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে উপনীত; তখন তার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে উপস্থিত হন। সে মুহূর্তে তার কাছে উপস্থিত ছিল আবু জেহেল, আবুল্লাহ বিন আবি ওমাইয়া।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘হে আমার চাচা! আপনি (শুধু) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; এ কালেমাটি পড়ুন। যাতে করে কেয়ামতের দিন আমি আল্লাহর কাছে প্রমাণ পেশ করে সুপারিশ করতে পারি।

এ সময় আবু জেহেল ও আব্দুল্লাহ বিন আবি ওমাইয়া বললো, ওহে আবু তালেব! শেষ পর্যন্ত কি তুমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মকে বিসর্জন দিতে যাচ্ছ?

তারা বার বার এ কথাটি আবৃত্তি করতে লাগল, অবশেষে আবু তালেব সর্বশেষ যে কথাটি বলছিল; তাহলো-‘আমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরেই (আছি)।’

এরপরও প্রিয় নবি পরম আত্মীয় চাচার ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘আমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধ করা হবে না; ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকব। তারপর এ আয়াত নাজিল হয়-

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَن يَسۡتَغۡفِرُواْ لِلۡمُشۡرِكِينَ وَلَوۡ كَانُوٓاْ أُوْلِي قُرۡبَىٰ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمۡ أَنَّهُمۡ أَصۡحَٰبُ ٱلۡجَحِيمِ

‘নবি ও অন্যান্য মুমিনদের জন্য বৈধ নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যদিও তারা আত্মীয় হয়, একথা প্রকাশ হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী।’ (সুরা তাওবা : আয়াত ১১৩)

অন্য আয়াতে এসেছে-

 إِنَّكَ لَا تَهۡدِي مَنۡ أَحۡبَبۡتَ

(হে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!) নিশ্চয়ই আপনি যাকে চাইবেন তাকেই হেদায়েত করতে পারবেন না।’ (সুরা কাসাস : আয়াত ৫৬, মুসনাদে আহমাদ, বুখারি, মুসলিম)

এ ছিল আত্মীয়-স্বজনের প্রতি প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা। তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি সময়েও তাঁর কোনো আত্মীয়ের খারাপ পরিণতি কিংবা ধ্বংস কামনা করতেন না। এ আদর্শ মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুপ্রেরণা।

উল্লেখ্য, শুধু মৃত্যুর সময়ই নয়, বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু তালিবের জীবদ্দশায় তাকে অনেক বার ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। এমনকি তার জীবনের শেষ মূহুর্ত গুলিতেও। এমনকি তার মৃত্যুর পরও তার প্রতি সদ্ব্যবহার ও দয়া-ভালোবাসা থেকে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আয়াত নাজিল করে নিষেধ করা না হয়।

পরবর্তীতে তিনি আল্লাহর নির্দেশের অনুসরণ করে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যারা মুশরিক ছিল তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বিরত থাকেন।

সর্বোপরি

উম্মতে মুহাম্মাদির সবাই ছিলেন প্রিয় নবির আত্মার আত্মীয়। সে কারণেই তিনি উম্মতের মায়ায় আজীবন কেঁদেছেন। দেখিয়েছেন অকৃত্রিম ভালোবাসা। দিয়েছেন মুক্তির উপায়।

আসুন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসরণ ও অনুকরণ করে নিজেদের কাছের আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলি। সুন্নাতের উপর আমল করি। দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ সফলতায় নিজেদের নাম সুনিশ্চিত করি।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার মাধ্যমে সবাইকে তার রহমতের চাদরে আশ্রয় নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]