সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সফল সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষাগার

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:১৪ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৯

>> প্রতিদিন ১৯৬টি আলামত পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিল
>> ২০১৮ সালে ৭১ হাজার ৬৩৫ মামলার আলামত পরীক্ষা
>> সফলতা বাড়লেও চাপ কমেনি, আছে জনবলের সীমাবদ্ধতাও
>> প্রশিক্ষণ, দ্রুত পদোন্নতি ও যানবাহনের বন্দোবস্ত প্রয়োজন
>> প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এ সরকারের আমলেই নতুন ল্যাব

মাদক, কেমিক্যাল কিংবা দাহ্য পদার্থ, খুনের মতো অপরাধের আলামত পরীক্ষা করে আসছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) রাসায়নিক পরীক্ষাগার। নিমতলীর ভয়াবহ কেমিক্যাল কারখানার আগুন, চুরিহাট্টার আগুন কিংবা নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর সব ঘটনার আলামত পরীক্ষার পর বিশেষায়িত মতামতও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত ৮ বছরে মামলার সংখ্যা ১৩ গুণ বাড়লেও গতিশীল সিআইডি’র রাসায়নিক পরীক্ষাগার। প্রতিদিন গড়ে ১৯৬টি মামলার আলামত পরীক্ষার পর প্রতিবেদন দাখিল করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আরও পড়ুন >> ২১ জঙ্গি ঠাণ্ডা মাথার খুনি : মাদক গ্রহণের প্রমাণ মেলেনি

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে চাঞ্চল্যকর মামলার আলামত পরীক্ষার প্রতিবেদন দেয়ার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স অনুসরণ করছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মামলার কোনো পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিল বাকি রাখেনি সিআইডি’র রাসায়নিক পরীক্ষাগার।

১৯৪৭ সালের পর রাসায়নিক পরীক্ষাগারটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধীনে এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি সিআইডি’র অধীনে আসে।

ড্রাগ বা মাদক, মৃত মানুষ বা গবাদি পশু-পাখির ভিসারা, বিষ মিশ্রিত পানি, চেতনানাশক, কবর থেকে উত্তোলিত মরদেহের টিস্যু ও ট্রাঙ্কুলাইজার (স্ট্রিট পয়জনিং), দাহ্য পদার্থ (কেরোসিন, ডিজেল, পেট্রল, অক্টেন), এসিড দগ্ধ আলামত, রক্তমিশ্রিত আলামত, বিস্ফোরক, গান শট রেসিডিউ, ধাতব পদার্থ, পেট্রলিয়াম জাতীয় পদার্থের বিশুদ্ধতা নির্ণয়, জাল টাকা তৈরির কেমিক্যাল, ফল পাকানোর কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ এবং পচনশীলদ্রব্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত ফরমালিনের আলামত পরীক্ষা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

এসব পরীক্ষার জন্য ব্যবহার হচ্ছে গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি (জিসি), গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-ম্যাচ স্পেক্ট্রসকপি (জিসিএমএস), হাই পারফরমেন্স লিক্যুইড ক্রোমাটোগ্রাফি (এইচপিএলসি), হাই পারফরমেন্স থিন লেয়ার ক্রোমাটোগ্রাফি (এইচপিটিএলসি), অটোমেটিক অবসর্পশন স্পেক্ট্রফটোমিটার (এএএস), ফিউরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফারেড স্পেক্ট্রফটোমিটার (এফটিআইআর), আল্ট্রা ভায়োলেট-ভিজেবল স্পেক্ট্রফটোমিটার (ইউভি-ভিআইএস), মাইক্রো এক্সআরএফ, ফরমালডেহাইড ডিটেক্টর, রামান স্পেক্ট্রফটোমিটার, এলসিএমএস-এমএস, পেট্রল ডিসটিলেশন প্লান্ট, সিওডি/বিওডি/ডিও, মাল্টিপ্যারামিটার (পিএইচ/ইসি/টিডিএস) এর মতো অত্যাধুনিক মেশিন ও যন্ত্র।

আরও পড়ুন >> সিআইডি ল্যাবের নমুনার শতকরা ৮৫ ভাগই মাদকদ্রব্য

সমগ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞ আদালত, সিভিল সার্জনের অফিস, ফরেনসিক মেডিকেল কলেজ, উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়, সামরিক হাসপাতাল ও চিড়িয়াখান থেকে আসা আলামত দ্রুতই পরীক্ষা করে গুণগতমানের প্রতিবেদন দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিআইডি সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, সিআইডি’র রাসায়নিক পরীক্ষাগার তিনটি। এর মধ্যে দুটি পুরোপুরি গতিশীল। আরেকটি রাজশাহীতে উদ্বোধনের অপেক্ষায়। রাজশাহীর পরীক্ষাগার চালু হলে আরও গতিশীল হবে আলামত পরীক্ষার কার্যক্রম।

cid-01.jpg

সিআইডি রাসায়নিক পরীক্ষাগার সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১০ সালে পাঁচ হাজার ৪০৬ মামলার আলামত পরীক্ষা করা হয়। সেসময় ঝুলে (পেন্ডিং) ছিল ৯৯৫টি। ২০১১ সালে পরীক্ষা করা হয় আট হাজার ২৪৫ মামলার আলামত, ঝুলে ছিল ৮৭টি, ২০১২ সালে ১০ হাজার ২০৫ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করলেও বাকি ছিল ১০৫টি, ২০১৩ সালে ১০ হাজার ৪৯১ মামলার রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন দেয়া হয়, সম্ভব হয়নি ছয়টি, ২০১৪ সালে ১৩ হাজার ১৫২ মামলার সবকটির আলামত পরীক্ষা করা হয়, ২০১৫ সালে ১৫ হাজার ১টি সম্পন্ন হলেও বাকি ছিল ২৮টি।

তবে সর্বশেষ গত তিন বছরে সব মামলার আলামত পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিলের সফলতা দেখায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালে ২০ হাজার ১৯০টি, ২০১৭ সালে ৪৩ হাজার ৩৬৩টি এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে মোট ৭১ হাজার ৬৩৫ মামলার আলামত পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ফেন্সিডিলের ২৪৯২টি, হেরোইনের ৯৯৩৭টি, চোলাই ৫২১৭টি, এসিড ৮১টি, ভিসেরা ৫৬১৬টি, গাঁজা ১৩১৪৪টি, ইয়াবা ৩৪৯৩৩টি এবং বিবিধ ২১৫টি।

ঢাকার মহাখালীর সিআইডি রাসায়নিক পরীক্ষাগারের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সফলতা বাড়লেও চাপ কমেনি। বরং মামলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঞ্চল্যকর মামলার আলামত দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করে এর ফলাফল সরবরাহ করতে হচ্ছে। আমাদের পরীক্ষাগারেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সব যন্ত্রের ওপর সবার সমান দক্ষতা নেই। এজন্য যথাযথ প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।

আরও পড়ুন >> এখনও কাপড়ে তনুর গন্ধ খুঁজে ফেরেন মা

তিনি বলেন, মাদক পরীক্ষার জন্য স্ট্যান্ডার্ড রেফারেন্স দরকার, যন্ত্রপাতি সুরক্ষার জন্য ভেন্ডরদের সঙ্গে বার্ষিক চুক্তি জরুরি। ল্যাবের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক প্রহরী প্রয়োজন। এছাড়া কর্মকর্তাদের দক্ষতার মূল্যায়নের পাশাপাশি দ্রুত পদোন্নতি ও যানবাহনের বন্দোবস্ত প্রয়োজন।

cid-01.jpg

‘দীর্ঘদিনের দাবি ঝুঁকিভাতা। বিষমিশ্রিত ভিসারা ও এসিড মামলার আলামত পরীক্ষা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। জনবলের সংকটও প্রকট। এছাড়া এখানে জায়গার সংকুলানও হচ্ছে না। এসব যদি সমন্বয় করে দ্রুত সমাধান করা যায় তাহলে অন্যান্য দেশের উন্নতমানের পরীক্ষাগারের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবে আমাদের সিআইডি’র রাসায়নিক পরীক্ষাগার’- যোগ করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে মোট জনবল রয়েছেন ৪৬ জন। এর মধ্যে পরীক্ষক মাত্র ১০ জন। চলতি পদের মধ্যে নয়টি খালি। রাসায়নিক পরীক্ষক চারটি, উপ-প্রধান পরীক্ষক তিনটি, সহকারী পরীক্ষকের দুটি পদ খালি রয়েছে। উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা রাজশাহীসহ ঢাকা ও চট্টগ্রামে মিলে মোট ৩০০ জনবল প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিআইডি রাসায়নিক পরীক্ষাগারের প্রধান পরীক্ষক ড. দিলীপ কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, সিআইডি’র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দিক-নির্দেশনায় মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে স্থাপিত আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে নমুনাসমূহের প্রাপ্ত রাসায়নিক প্রতিবেদন দেয়া হচ্ছে। রাসায়নিক এ ল্যাবকে বিশ্বমানের রূপ দিতে আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। গুণগতমানের সঙ্গে সঙ্গে নমুনার পরিমাণগত মতামত প্রদানের ক্ষেত্রেও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রয়োজন।

বর্তমান সরকার মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলার আলামত পরীক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সম্মিলিত প্রয়াসে এ ল্যাব উত্তরোত্তর বিশ্বমানের ল্যাবে পরিণত হবে- এমন প্রত্যাশা করি।

আরও পড়ুন >> নুসরাত হত্যাকাণ্ডে কেরোসিন ব্যবহারের আলামত মিলেছে

যোগাযোগ করা হলে সিআইডি’র প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এটা অবশ্যই প্রশংসার যে, সিআইডি’র কেমিক্যাল ল্যাব কোনো মামলার রাসায়নিক প্রতিবেদন পেন্ডিং রাখেনি। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে সিআইডি’র রাসায়নিক ল্যাবকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি ও মেশিন ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আরও জনবল নেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে এ সরকারের আমলে নতুন ল্যাব স্থাপন করা হবে- বলেও জানান তিনি।

জেইউ/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :


আরও পড়ুন