সরিষায় ‘আশার আলো’

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০৯ এএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২১

চাষের সময় আর খরচ দুটোই কম হওয়ায় কৃষকের কাছে বেশ জনপ্রিয় সরিষা চাষ। গত কয়েক বছরে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে শস্যটির ফলনও আগের চেয়ে বেড়েছে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে দিন দিন বাড়ছে সরিষার চাষ। বাজারে দাম ভালো থাকায় সরিষায় আশার আলো দেখছেন কৃষকরা।

অন্যদিকে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরিষাকে বিকল্প হিসেবে দেখছে সরকার। এজন্য ফসলটির উৎপাদন বাড়াতে নেয়া হয়েছে বড় প্রকল্প। ফসলের শ্রেণিবিন্যাসে পরিবর্তন এনে গতিশীল করা হচ্ছে সরিষার চাষ। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরিষার উৎপাদন বাড়িয়ে দেশে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, প্রচলিত দেশি সরিষার চেয়ে বারি ও বিনার উদ্ভাবিত সরিষার জাতগুলোর ফলন বেশি। এ কারণে এতে চাষিরাও আগ্রহী হচ্ছেন। অনেকেই আমন ধান সংগ্রহের পর জমি ফেলে না রেখে সরিষা চাষ করছেন। এরপর আবার বোরো ধান রোপণ করতে পারছেন। এতে একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) কয়েক বছরে বেশকিছু নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, বিনার সরিষা হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১ দশমিক ৮ টন। জীবনকাল মাত্র ৮৭ দিন। বাড়তি ফলন ও কম সময়ের কারণে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।

jagonews24

সারাদেশে সরিষা চাষ বাড়ার আরেকটি কারণ সরিষা ক্ষেতে মৌচাষ । জমির পাশেই বাক্স বসিয়ে মৌচাষ হচ্ছে দেশের কয়েকটি এলাকায়। মৌমাছির মাধ্যমে সরিষা ফুলের পরাগায়নে সহায়তা হচ্ছে। এতে মধু চাষের পাশাপাশি সরিষার উৎপাদনও বাড়ছে। সরিষা ও মৌচাষি উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে চলতি অর্থবছর (২০২০-২১) সাত লাখ ৯৯ হাজার ৮৪১ টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছর অর্জিত উৎপাদনের চেয়ে ৪৯ হাজার টন বেশি। গত বছর দেশে সাত লাখ ৫০ হাজার ৭৭০ টন সরিষা উৎপাদন হয়েছিল।

চলতি বছর মাগুরা জেলায় সরিষার বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। ওই এলাকার বিভিন্ন গ্রামের সরিষা চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার বিঘাপ্রতি ৬-৭ মণ সরিষা উৎপাদনের আশা করছেন তারা। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব মতে, চলতি বছর সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ছয় হাজার হেক্টর। সেখানে চাষ হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে।

একই অবস্থা ময়মনসিংহ অঞ্চলেও। ওই অঞ্চলের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায় আগের বছরের চেয়ে এ বছর এক হাজার হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা উৎপাদন হচ্ছে। এ বছর ওই চার জেলায় ৫২ হাজার ৯০৫ টন সরিষা হবে বলে আশা করছে কৃষি অধিদফতর।

জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার বয়ড়া গ্রামের চাষি আব্দুল জলিল জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরো আবাদি জমিতে সরিষা আবাদ করেছি। এখন পর্যন্ত খুব ভালো অবস্থা। এমন পরিস্থিতি থাকলে বাম্পার ফলন হবে। যদি ঠিকঠাক দাম পাই তাহলে বন্যার লোকসান কেটে যাবে।’

ওই এলাকার আরেক কৃষক মনির মিয়া জানান, গত বছর তিনি চার বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছিলেন। ১৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে পেয়েছিলেন ২২ মণ সরিষা। খরচ বাদ দিয়ে মুনাফা ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ধানের উৎপাদন না কমিয়ে বাড়তি ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করলে দেশের কৃষিখাত বিরাট উপকৃত হবে। আমরা বছরে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানি করি। এজন্য অনেক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। সরিষা চাষ বাড়ালে দাম নিয়ে সমস্যা হবে না। কৃষকরাও লাভবান হবেন। দেশের টাকা দেশেই থাকবে।’

jagonews24

এজন্য সরিষা চাষ বাড়াতে কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেন কৃষিমন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে বার্ষিক ভোজ্যতেলের চাহিদা ১৬ লাখ টন। কিন্তু উৎপাদন মাত্র দুই লাখ টন। বাকি ১৪ লাখ টন তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে খরচ হয় ২৭ হাজার কোটি টাকা।

খরচ কমাতে দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়ানোর জোর চেষ্টা করছে সরকার। এজন্য সরিষা, তিসি, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য তেলজাতীয় শস্য আবাদের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে উন্নয়ন প্রকল্প চলছে। এ নিয়ে কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে বিনা।

জানতে চাইলে বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভালো জাত সম্প্রসারণ করে কৃষকের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রকল্পটি কাজ করে যাচ্ছে। তিন-চার স্তরের শস্য বিন্যাসের মধ্যে সরিষাকে রেখে কৃষি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ প্রকল্প পাঁচ বছরের। আশা করছি এর মধ্যেই সরিষার উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা যাবে।’

এনএইচ/এমএইচআর/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]